• হোম > অর্থনীতি | জাতীয় | দেশজুড়ে > জিডিপির তুলনায় বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের অংশ মাত্র ৬ শতাংশ

জিডিপির তুলনায় বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের অংশ মাত্র ৬ শতাংশ

  • বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:০০
  • ১৩

---

ইবি রিপোর্ট

বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বাড়লেও তার পূর্ণ প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না পুঁজিবাজারে। বাজার মূলধন ও জিডিপির অনুপাতে দেশের পুঁজিবাজারের অবস্থান প্রায় ৬ শতাংশ। অথচ ২০২৫ সালে ভারতে এ হার ছিল প্রায় ১২৫ শতাংশ। ভিয়েতনামের সাম্প্রতিক হিসাবেও তা ৫০ শতাংশের বেশি এবং তুরস্কের অবস্থান বাংলাদেশের তুলনায় অনেক এগিয়ে।

শুধু বাজার মূলধন নয়, গত এক দশকে প্রধান শেয়ার সূচকের গতিতেও বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার চিত্র পাওয়া যায়। এ সময়ে দেশের প্রধান শেয়ার সূচক আনুমানিক ৩০ শতাংশ বেড়েছে। বিপরীতে ভিয়েতনামে বেড়েছে প্রায় ১৩৪ শতাংশ, ভারতে প্রায় ৩০০ শতাংশ এবং তুরস্কে প্রায় ১ হাজার ৩০০ শতাংশ।

বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনীতির আকার বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুঁজিবাজারের পরিধি ও গভীরতা বাড়েনি। ফলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের বাজার এখনো বড় বিনিয়োগ ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে ওঠেনি। বিদেশি পুঁজি আকর্ষণে ভালো কোম্পানিকে বাজারে আনা, সুশাসন নিশ্চিত করা, তথ্যের স্বচ্ছতা বাড়ানো, তারল্য তৈরি এবং নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখাকে তারা প্রয়োজনীয় বলে মনে করছেন।

তাদের মতে, শুধু শেয়ার সূচক বাড়ানো কিংবা বিদেশে রোড শো আয়োজন করলেই বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে না। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা বাজারে বিনিয়োগযোগ্য কোম্পানির সংখ্যা, কোম্পানির আর্থিক তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা, বিনিয়োগের অর্থ দেশে আনা ও ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়া এবং বাজারের নীতিমালা কতটা স্থিতিশীল—এসব বিষয় বিবেচনা করেন।

দেশের পুঁজিবাজারে সাম্প্রতিক সময়ে লেনদেন বাড়লেও বিদেশি বিনিয়োগের পরিস্থিতি এখনো দুর্বল। ২০২৫ সালে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রায় ২ হাজার ৯৫ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেন। বিপরীতে তারা কিনেছেন প্রায় ১ হাজার ৮২৫ কোটি টাকার শেয়ার। ফলে বছর শেষে বিদেশিদের নিট বিক্রির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২৭০ কোটি টাকা।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশিদের মোট লেনদেন আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়ে চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। তবে এর বড় অংশ ছিল শেয়ার কেনাবেচার লেনদেন। অর্থাৎ, লেনদেনের পরিমাণ বাড়লেও তা নতুন বিদেশি পুঁজি প্রবেশের সমান নয়। নির্বাচনের পর ফেব্রুয়ারিতে বিদেশি লেনদেনে কিছুটা বৃদ্ধি দেখা গেলেও পরবর্তী সময়ে তা আবার কমে যায়। এপ্রিলে বিদেশিরা প্রায় ১২৪ কোটি টাকা তুলে নেন।

অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীও পুঁজিবাজারের সাম্প্রতিক উত্থানকে শুধু সূচকের মাধ্যমে মূল্যায়ন করতে চান না। তিনি বলেছেন, সূচকের উত্থান মূলত আস্থার ওপর ভিত্তি করে হয়েছে। কসমেটিক পরিবর্তনের মাধ্যমে পুঁজিবাজারের মৌলিক পরিবর্তন সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।

অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, সরকার পুঁজিবাজারের আইন ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোয় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনবে। বিএসইসিকে আরও কার্যকর করা, স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে যাওয়ার কথাও বলেছেন তিনি। পাশাপাশি মৌলভিত্তি শক্তিশালী ও লাভজনক কোম্পানিকে বাজারে আনার ওপর জোর দিয়েছেন। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ তহবিল আকর্ষণের মাধ্যমে তারল্য বাড়ানো এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর বিষয়টিও অগ্রাধিকার পাচ্ছে।

বাংলাদেশ সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, দেশে অনেক বড় দেশি ও বহুজাতিক কোম্পানি রয়েছে। এসব ভালো কোম্পানিকে দ্রুত পুঁজিবাজারে না আনলে বাজার প্রত্যাশিতভাবে বিকশিত হবে না। বিএসইসি আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে কয়েকটি বড় ও গুরুত্বপূর্ণ কোম্পানিকে বাজারে আনার লক্ষ্য নিয়েছে।

তিনি জানান, প্রথমে বড় কোম্পানিগুলোকে স্বেচ্ছায় তালিকাভুক্ত হতে উৎসাহ দেওয়া হবে। তারা না এলে জনস্বার্থে আইন প্রয়োগের সুযোগও রয়েছে। বড় কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করতে সরাসরি তালিকাভুক্তি ও হাইব্রিড লিস্টিং চালুর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

দেশের বড় শিল্পগোষ্ঠী, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, টেলিযোগাযোগ ও ভোগ্যপণ্য খাতের অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো পুঁজিবাজারের বাইরে রয়েছে। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে এলেও দেশের অর্থনীতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র বাজারে পান না।

মাসুদ খানের মতে, তালিকাভুক্তি শুধু কোম্পানির অর্থ সংগ্রহের পথ নয়। এর মাধ্যমে কোম্পানির বাজারমূল্য তৈরি হয়, অধিগ্রহণ ও একীভূতকরণ সহজ হয় এবং পুরোনো মালিকদের শেয়ার বিক্রির সুযোগ তৈরি হয়। পারিবারিক ব্যবসায় প্রজন্ম পরিবর্তনের সময় মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব ও বিভাজন ঠেকাতেও তালিকাভুক্তি কার্যকর হতে পারে।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক এন্ড ইকনমিক রিসার্চের চেয়ারম্যান ও ল্যাবএইড হসপিটাল গ্রুপের ম্যানেজিং ডিরেক্টর সাকিফ শামীম বলেন, গত দুই দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে হারে প্রবৃদ্ধি হয়েছে, পুঁজিবাজার তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। ফলে অর্থনীতির বড় অংশ এখনো শেয়ারবাজারের বাইরে।

তিনি বলেন, অনেক বড় ও লাভজনক প্রতিষ্ঠান পারিবারিক মালিকানায় পরিচালিত হচ্ছে। ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে তুলনামূলক সহজে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ থাকায় এসব প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তির সঙ্গে যুক্ত স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিয়ন্ত্রক বাধ্যবাধকতার মধ্যে আসতে আগ্রহী নয়। এতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য মানসম্পন্ন কোম্পানির বিকল্প কমে যায়।

সাকিফ শামীমের মতে, বিদেশি বিনিয়োগ না বাড়ার পেছনে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার পাশাপাশি ভালো কোম্পানির ঘাটতি, দুর্বল করপোরেট গভর্নান্স, নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাব, সীমিত তারল্য এবং নীতির ধারাবাহিকতার অভাবও দায়ী। তার প্রস্তাব, ভিয়েতনামের মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, বড় দেশি শিল্পগোষ্ঠী ও বহুজাতিক কোম্পানিকে বাজারে আনতে হবে। পাশাপাশি পেনশন, বীমা ও মিউচুয়াল ফান্ডের মতো প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী বাড়াতে হবে। শেয়ারের পাশাপাশি বন্ড, সুকুক ও ডেরিভেটিভের বাজারও সম্প্রসারণের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক নূজহাত আনোয়ার বলেন, পুঁজিবাজারে তারল্য ও অবকাঠামোতে পরিবর্তন প্রয়োজন। চলতি বছরের মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠকে ডিএসই যেসব সংস্কার প্রস্তাব দেয়, তার মধ্যে ছিল লেনদেন নিষ্পত্তির সময় টি+২ থেকে টি+১-এ নামিয়ে আনা, রিয়েল-টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট ব্যবস্থার সময় বাড়ানো এবং অনিবাসী বিনিয়োগকারীদের অর্থ আনা-নেয়ার হিসাব সহজ করা।

ডিএসই জানিয়েছে, এসব পদক্ষেপ বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বাজারের তারল্য উন্নত করতে সহায়ক হবে। পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ পণ্য ও প্রযুক্তিনির্ভর লেনদেন কাঠামো বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। ওপেন-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডের জন্য আলাদা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে খুচরা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সহজে ফান্ডের ইউনিট কেনাবেচা করতে পারেন।

একই সঙ্গে বন্ড, সুকুক ও বিকল্প আর্থিক পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিচ্ছে ডিএসই। এর লক্ষ্য শুধু লেনদেন বাড়ানো নয়, বরং পুঁজিবাজারকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থায় পরিণত করা।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/17031 ,   Print Date & Time: Thursday, 10 September 2026, 01:43:43 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh