
ইবি রিপোর্ট
হংকংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে তৈরি পোশাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে তাজা ফল, পাট, চামড়াজাত পণ্যসহ উচ্চমূল্যের বিভিন্ন পণ্যের রফতানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। একই সঙ্গে হংকংয়ের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের সরাসরি প্রবেশ আরও সহজ ও বিস্তৃত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
হংকং কনভেনশন অ্যান্ড এক্সিবিশন সেন্টারে বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের শীর্ষ সম্মেলনের পার্শ্ববৈঠকে হংকং ট্রেড ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক সোফিয়া চংয়ের সঙ্গে বৈঠকে এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
বৈঠকে বাংলাদেশ ও হংকংয়ের মধ্যকার বিদ্যমান বাণিজ্য পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যতে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ও হংকংয়ের মধ্যে মোট দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৪১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ হংকং থেকে ৩০৭ মিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে হংকংয়ে রফতানি হয়েছে ১০৮ মিলিয়ন ডলারের পণ্য।
পরবর্তী অর্থবছরে বাংলাদেশের রফতানিতে সামান্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে হংকংয়ে বাংলাদেশের রফতানি বেড়ে ১০৯ দশমিক ৫১ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে আমদানি ও রফতানির এই ব্যবধান এখনো বাংলাদেশের জন্য বড় বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি করছে।
এ পরিস্থিতিতে হংকংয়ের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের সরাসরি প্রবেশ বাড়ানোকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। বিশেষ করে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি নতুন নতুন পণ্য রফতানির মাধ্যমে বাজার সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বৈঠকে।
বৈঠকে বাংলাদেশের আম, কাঁঠাল, লেবুসহ বিভিন্ন উচ্চমানের তাজা ফল হংকংয়ের সুপারমার্কেট ও বড় আমদানিকারকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। এ জন্য দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সরাসরি ব্যবসায়িক যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
শুধু তাজা ফল নয়, পরিবেশবান্ধব ও পচনশীল পাটপণ্যের জন্যও হংকংয়ের বাজারে সম্ভাবনা দেখছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে হংকংয়ের পরিবেশবান্ধব খুচরা বাজার ও নকশাশিল্পে বাংলাদেশের পাটজাত পণ্য আরও বড় পরিসরে প্রবেশ করতে পারে বলে বৈঠকে সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়।
এ ছাড়া চামড়াজাত পণ্য, বস্ত্র, তথ্যপ্রযুক্তি ও অন্যান্য উচ্চমূল্যের পণ্য রফতানি বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে পারলে হংকংয়ের বাজারে নতুন সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানোর প্রস্তাবও দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। এ ক্ষেত্রে ভর্তুকিযুক্ত অথবা বিনামূল্যে প্রদর্শনী স্টলের ব্যবস্থা করার বিষয়টি বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি। এতে বাংলাদেশের ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সরাসরি আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পাবেন এবং নতুন বাজার খুঁজে নেওয়া সহজ হবে।
বৈঠকে বাণিজ্য সহজীকরণের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। ইলেকট্রনিক পণ্য উৎস সনদ চালু, শুল্ক প্রক্রিয়া আধুনিকায়ন এবং পণ্য পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থা যৌথভাবে উন্নত করার প্রস্তাব দেন বাণিজ্যমন্ত্রী। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের মধ্যে পণ্য আমদানি-রফতানির সময় ও ব্যয় কমানোর পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের জন্য প্রক্রিয়াগত জটিলতাও কমতে পারে।
স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের সামনে যে নতুন বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে, তা মোকাবেলায় হংকংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগবিষয়ক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের আগ্রহও প্রকাশ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
তিনি বলেন, দক্ষিণ চীন ও বৃহত্তর উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে হংকংয়ের অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ নতুন বাণিজ্য ও বিনিয়োগ অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে চায়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য নতুন বাজার তৈরি এবং দেশীয় উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক ব্যবসার সুযোগ আরও সম্প্রসারিত করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের এসব প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছেন হংকং ট্রেড ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক সোফিয়া চং। দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ এবং অভিজ্ঞতা বিনিময় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সোফিয়া চং বলেন, তৈরি পোশাক ও বস্ত্রের পাশাপাশি চামড়াজাত পণ্য এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও বাংলাদেশ ও হংকংয়ের মধ্যে সহযোগিতা সম্প্রসারণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়লে এসব সম্ভাবনাকে বাস্তব বাণিজ্যিক উদ্যোগে রূপ দেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি জানান।
বৈঠক শেষে সোফিয়া চংয়ের নেতৃত্বে হংকং ট্রেড ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিলের একটি উচ্চপর্যায়ের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। এ সফরের মাধ্যমে দুই দেশের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ আরও জোরদার হবে এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।