• হোম > আন্তর্জাতিক | পাকিস্তান | বিশ্ব সংবাদ > যে নীতির বোঝা বইছে পাকিস্তান

যে নীতির বোঝা বইছে পাকিস্তান

  • বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:৫৬
  • ৯

---

ইবি আন্তর্জাতিক ডেস্ক

পাকিস্তানে এখন নিরাপত্তাহীনতার ভাষাও ক্রমে রাজনৈতিক হয়ে উঠছে। সম্প্রতি পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ বলেছেন, বহিরাগত শত্রুর চেয়ে ‘প্রতিবেশী প্রদেশ’ থেকে আসা নিরাপত্তা হুমকি তাঁদের জন্য বড় উদ্বেগের। বক্তব্যটি দ্রুত বিতর্ক তৈরি করেছে। বিশেষ করে খাইবার পাখতুনখোয়ার মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। এই ক্ষোভ অস্বাভাবিক নয়।

কারণ, পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদের সবচেয়ে বড় মূল্য যেসব অঞ্চল দিয়েছে, খাইবার পাখতুনখোয়া তার অন্যতম। বছরের পর বছর সেখানে হামলা হয়েছে। নিহত হয়েছেন সাধারণ মানুষ, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও রাজনৈতিক কর্মীরা। স্কুল, বাজার, মসজিদ—কিছুই পুরোপুরি নিরাপদ ছিল না।

পরে পাঞ্জাব সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী কোনো নির্দিষ্ট প্রদেশকে দায়ী করেননি। তিনি এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে জঙ্গিদের চলাচলের বিষয়টি বোঝাতে চেয়েছেন। কিন্তু তাতেও মূল প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া যায় না। পাকিস্তানে এত সশস্ত্র চরমপন্থী গোষ্ঠীর জন্ম হলো কীভাবে? তারা এত শক্তিশালীই বা হলো কেন?

সমস্যার শিকড় কোথায়:

সন্ত্রাসবাদকে কেবল সীমান্ত নিরাপত্তার সমস্যা হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটি ধরা পড়ে না। জঙ্গি গোষ্ঠী কোনো শূন্য জায়গায় জন্ম নেয় না। তাদের বিকাশের জন্য দরকার রাজনৈতিক সুযোগ, অর্থ, সংগঠন, মতাদর্শ এবং কখনো কখনো রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা বা প্রশ্রয়। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ।

দীর্ঘ সময় ধরে দেশটির নিরাপত্তা নীতিতে কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠীকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে দেখার অভিযোগ রয়েছে। আবার অন্য গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালানো হয়েছে। এই দ্বৈত নীতি শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

লস্কর-ই-তাইয়েবা বা জইশ-ই-মোহাম্মদের মতো সংগঠন কোনো প্রদেশের সীমান্ত থেকে হঠাৎ জন্ম নেয়নি। তাদের উত্থানের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক ইতিহাস। রাষ্ট্র যখন কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে ‘উপকারী’ এবং অন্যটিকে ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে দেখতে শুরু করে, তখন একটি মৌলিক ঝুঁকি তৈরি হয়। অস্ত্র হাতে দেওয়া মানুষকে সব সময় নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। আজকের মিত্র আগামী দিনের হুমকিতে পরিণত হতে পারে। পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি সেই পুরোনো সত্যই আবার মনে করিয়ে দিচ্ছে।

প্রদেশকে দোষ দিয়ে সমাধান নয়:

খাইবার পাখতুনখোয়া কিংবা অন্য কোনো প্রদেশকে নিরাপত্তা সমস্যার উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা সহজ। কিন্তু সহজ ব্যাখ্যা সব সময় সঠিক ব্যাখ্যা নয়। সন্ত্রাসবাদের কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকেই যদি সন্দেহের চোখে দেখা হয়, তাহলে রাষ্ট্রের ভেতরে নতুন অবিশ্বাস তৈরি হয়। একটি বহুজাতিক ও বহুভাষিক রাষ্ট্রে এই অবিশ্বাস আরও বিপজ্জনক। নিরাপত্তা শুধু সেনা অভিযান দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা যায় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজনৈতিক আস্থা, ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং নাগরিক অধিকার।

যেখানে মানুষ রাষ্ট্রের ওপর আস্থা হারায়, সেখানে চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো নিজেদের জায়গা তৈরি করতে পারে। আবার যেখানে স্থানীয় জনগণকে কেবল নিরাপত্তা সমস্যার অংশ হিসেবে দেখা হয়, সেখানে সমাধানের পথ আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

১৯৭১-এর শিক্ষা:

পাকিস্তানের নিজের ইতিহাসে এর একটি বড় উদাহরণ রয়েছে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের রাজনৈতিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বৈষম্য বাড়তে থাকে। রাজনৈতিক সংকটের সমাধানে শেষ পর্যন্ত সামরিক শক্তির পথ নেওয়া হয়।

ফলাফল ইতিহাসের অংশ। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভেঙে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়।

এই ইতিহাসের শিক্ষা শুধু পাকিস্তানের জন্য নয়, সব রাষ্ট্রের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের রাজনৈতিক অধিকারকে উপেক্ষা করে, আঞ্চলিক বৈষম্য বজায় রেখে কিংবা অস্ত্রের শক্তিতে দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় ঐক্য ধরে রাখা যায় না।

রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার সামরিক সক্ষমতায় নয়। রাষ্ট্রের আসল শক্তি নাগরিকের আস্থায়।

আত্মসমালোচনার সময়:

পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদ সমস্যা তাই কোনো একটি প্রদেশের সমস্যা নয়। এটি দীর্ঘদিনের নীতি, ভুল হিসাব এবং জটিল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার ফল। প্রতিবেশী প্রদেশকে সন্দেহ করার আগে রাষ্ট্রকে নিজের নীতির দিকে তাকাতে হবে। কোন পরিস্থিতিতে চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো শক্তিশালী হলো? কারা তাদের সুযোগ করে দিল? কেন স্থানীয় মানুষ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর আস্থা হারাল? এই প্রশ্নগুলোর সৎ উত্তর খুঁজতে হবে।

পাকিস্তানের সামনে এখন পথ দুটি। পুরোনো ব্যাখ্যা দিয়ে নতুন সংকটকে ঢেকে রাখা অথবা অতীতের ভুল স্বীকার করে নতুন নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা। দ্বিতীয় পথটি কঠিন। কিন্তু টেকসই সমাধানের জন্য সেটিই জরুরি। কারণ, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু বন্দুকের নয়। এটি রাষ্ট্রের নিজের সঙ্গে নিজের লড়াইও।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/16951 ,   Print Date & Time: Wednesday, 9 September 2026, 02:35:07 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh