
এই মুহূর্তে দেশের অর্থনীতির বড় সংকট কী? এমন প্রশ্নের জবাবে নির্দ্বিধায় বলা যায়, জ্বালানিই প্রধান সমস্যা। জ্বালানি সংকট এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, থমকে গেছে অর্থনীতির চাকা। দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে শিল্পোদ্যোক্তাদের কপালে।
গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে কলকারখানা চালানো তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংকটের মূল কারণ গ্যাসের স্বল্পতা। এর অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটছে। ফলে সারা দেশে তীব্র লোডশেডিং হচ্ছে। লোডশেডিংয়ের কারণে কলকারখানা ও উৎপাদনক্ষেত্র থমকে আছে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে জনজীবনে, চরমভাবে ক্ষতি হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্যের।
পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর উৎপাদিত বিদ্যুতের ৬৪ শতাংশই গ্যাসনির্ভর। গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমে যায়। নিজস্ব গ্যাসের ঘাটতি থাকায় বিদেশ থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানি করতে হয়।
এই এলএনজি ক্রয় নিয়ে সরকার এবার বেশ বেকায়দায় রয়েছে। কেননা মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম ব্যাপক বেড়ে গেছে। অথচ বাংলাদেশকে এলএনজি (জ্বালানি) আমদানি করতে হয় মধ্যপ্রাচ্যের কুয়েত, কাতার ও সৌদি আরব থেকে। এদেশের দুই-তৃতীয়াংশ জ্বালানি তেল আসে হরমুজ প্রণালী দিয়ে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে এই প্রণালীর মাধ্যমে তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। সরকার তাই বিকল্প হিসেবে চড়া দামে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনছে এবং বাড়তি দামের কারণে আর্থিক চাপে পড়েছে।
কারণ এলএনজি ক্রয়ে মোটা অঙ্কের ভর্তুকি গুনতে হচ্ছে। এর ফলে অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে, যা সামাল দেওয়া সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির বদলে স্পট মার্কেটে গ্যাস কিনতে হয় তাৎক্ষণিক বাজারদর অনুযায়ী। স্বভাবতই এখানে দাম অনেক বেশি পড়ে। এ মার্কেটে বর্তমানে প্রতি ঘনমিটার (এমএমবিটিইউ) এলএনজির দাম ২৮ ডলার। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর আগে এটি ছিল ১০ থেকে ১২ ডলার।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন- জাহাজভাড়া, রিগ্যাসিফিকেশন, পরিবহন, টার্মিনাল খরচ ইত্যাদি যোগ হলে স্পট মার্কেট থেকে কেনা এলএনজির প্রকৃত মূল্য বাংলাদেশে আরও বেশি হবে। সম্প্রতি বাংলাদেশ একটি এলএনজি কার্গো কিনেছে, যেখানে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম পড়েছে ২৮ ডলারের বেশি। একটি এলএনজি চালানের দামই পড়ছে ১০ কোটি ডলারের বেশি। বেশি দামে এলএনজি কিনে দেশে তুলনামূলক কম দামে গ্যাস বিক্রি করায় সরকারকে মোটা অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানাচ্ছে, গত অর্থবছরে সরকার এলএনজিতে ভর্তুকির জন্য প্রথমে ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত খরচ হয় ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এলএনজির দাম ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকায় চলতি অর্থবছরে ভর্তুকি দিতে হবে ৪০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ গতবারের তুলনায় শুধু এলএনজি খাতেই ভর্তুকি বাড়বে তিনগুণ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “আন্তর্জাতিক বাজারের চলতি দামের ওপর ভিত্তি করে প্রাথমিক এ হিসাব করা হয়েছে। দাম আরও বাড়লে ভর্তুকিও বাড়বে।”।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়বহুল হওয়ায় বিদ্যুতের খরচও বেড়েছে। গত অর্থবছরে বিদ্যুতে ভর্তুকি ৩৬ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৪৩ হাজার কোটি টাকা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫০ হাজার কোটি টাকা। তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এ বছর এলএনজি এবং বিদ্যুৎÑ এই দুই খাতেই ভর্তুকি দরকার হবে ৯০ হাজার কোটি টাকা।
অর্থাৎ মোট ভর্তুকির ৮০ শতাংশ ব্যয় হবে গ্যাস-বিদ্যুতে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে এলএনজি ভর্তুকিতে সরকার প্রায় ৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা খরচ করেছে। স্পট মার্কেটে দাম আরও বাড়লে ভর্তুকি বছর শেষে ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই কঠিন সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি এত বড় আঘাত মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত নয় বলে জানাচ্ছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ওই কর্মকর্তারা।
তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানাচ্ছে, সরকারকে এই বাড়তি খরচ সামলাতে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থসহায়তা নিতে হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান এলপিজির উচ্চদাম যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে চলতি বছরে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি খরচ প্রায় ২৮০ কোটি ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, “গ্যাসের বাড়তি দামের ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়বে। বাড়বে মূল্যস্ফীতি ও সরকারি ঋণ। এতে করে অর্থনীতি বড় ধাক্কা খাবে”।
এ কারণে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় পরিহার ও রাজস্ব আদায় বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. এম শামসুল আলম বলেন, “বাংলাদেশ যদি এলএনজির ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে ভবিষ্যতে জ্বালানির দাম বাড়লে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে”।
তিনি বলেন, “এলএনজিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থায় ঝুঁকি বেশি। তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে, বিশেষ করে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার”।
সরকারের উদ্যোগ
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, জ্বালানি সংকট সামাল দিতে স্পট মার্কেটসহ বিভিন্ন উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহ করছে বাংলাদেশ। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের জন্য দুটি স্পট কার্গো অনুমোদনের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া ও ওমানের সরবরাহকারীদের কাছ থেকে আরও আটটি কার্গো সংগ্রহ করা হয়েছে। ভারত থেকে অতিরিক্ত ডিজেল চাওয়া হয়েছে। এর বাইরে ২০২৬ থেকে ২০৩৮ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১১৭টি এলএনজি কার্গো কেনার চুক্তি করেছে বাংলাদেশ।
বিনিয়োগে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র
বাংলাদেশে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা ভাসমান এলএনজি সংরক্ষণ ও গ্যাসে রূপান্তর ইউনিট (এফএসআরইউ) প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র। এজন্য প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন।
রাজধানীর এফবিসিসিআই কার্যালয়ে সোমবার বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ আগ্রহের কথা জানান তিনি। বৈঠকে শিল্প সচিব আব্দুন নাসের খান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. মুস্তাফিজুর রহমান ও মার্কিন দূতাবাসের ইকোনমিক চিফ এঞ্জেলো পালাজ্জেলো উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এফএসআরইউ প্রকল্পের প্রসঙ্গ তুলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, “বড় অবকাঠামো প্রকল্পে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ বজায় রাখা হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও বাড়বে”।
বাংলাদেশে কাজ করতে মার্কিন কোম্পানিগুলো অত্যন্ত আগ্রহী উল্লেখ করে তিনি এসব কোম্পানিকে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার সুযোগ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন।
জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, “এফএসআরইউ দ্রুত বাস্তবায়ন এবং সরবরাহের সক্ষমতা দেখাতে পারলে মার্কিন কোম্পানিগুলোর প্রস্তাব সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে। কম সময়ে কার্যকর সরবরাহ পরিকল্পনা দিতে পারলে প্রতিযোগিতায় তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে”।