• হোম > অর্থনীতি | জাতীয় | দেশজুড়ে > জ্বালানি সংকটের মধ্যে সৌর সরঞ্জাম উৎপাদনে বড় উদ্যোগে যাচ্ছে ওয়ালটন, প্রাণ-আরএফএল

জ্বালানি সংকটের মধ্যে সৌর সরঞ্জাম উৎপাদনে বড় উদ্যোগে যাচ্ছে ওয়ালটন, প্রাণ-আরএফএল

  • মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩:৪৩
  • ৮

---

ইবি রিপোর্ট

সারাদেশে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ছোট ও মাঝারি থেকে বৃহৎ আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপনে ক্যাপেক্স মডেলে বিনিয়োগ, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ সেবা দেওয়ার পরিকল্পনাও করছে শিল্পগোষ্ঠী দুটি।

চলমান জ্বালানি সংকট ও নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহারে সরকারের জোরালো তাগিদের মধ্যে, সোলার ইনভার্টার ও লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির স্থানীয় উৎপাদন কারখানা স্থাপন করতে যাচ্ছে দেশের শীর্ষ দুই শিল্পগোষ্ঠী ওয়ালটন ও প্রাণ-আরএফএল। এর পাশাপাশি একটি সোলার প্যানেল উৎপাদন কারখানা স্থাপনেরও পরিকল্পনা রয়েছে ওয়ালটনের।

সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশে একটি পূর্ণাঙ্গ সরবরাহ শৃঙ্খল (এন্ড–টু–এন্ড সাপ্লাই চেইন) গড়ে তোলার অংশ হিসেবে এসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে টিবিএসকে জানিয়েছেন উভয় শিল্পগোষ্ঠীর কর্মকর্তারা।

একই সঙ্গে সারাদেশে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে—ছোট ও মাঝারি থেকে বৃহৎ আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপনে ক্যাপেক্স মডেলে বিনিয়োগ, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ সেবা দেওয়ার পরিকল্পনাও করছে শিল্পগোষ্ঠী দুটি।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং উভয় শিল্পগোষ্ঠীর কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, গত ১ আগস্ট বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আয়োজিত এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নবায়নযোগ্য শক্তিতে বড় ধরনের বিনিয়োগের আহ্বান জানানোর পরই এই প্রকল্পগুলো বিশেষ গতি পায়।

প্রাণ-আরএফএল-এর উৎপাদন ও সম্প্রসারণ

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামাল কামরুজ্জামান জানান, নরসিংদীর পলাশে ১০ লাখ মার্কিন ডলার ব্যয়ে একটি সোলার ইনভার্টার উৎপাদন কারখানার নির্মাণকাজ ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, “আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে এই কারখানায় বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এখান থেকে প্রতি মাসে ১ থেকে ৫ কিলোওয়াট সক্ষমতার প্রায় ১,০০০টি ইনভার্টার এবং স্টোরেজ ব্যাটারি তৈরি করা যাবে।” তিনি আরও জানান, হবিগঞ্জে প্রায় ৪০ লাখ ডলার বিনিয়োগে দ্বিতীয় আরেকটি ইনভার্টার কারখানা স্থাপনেরও পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

প্রাণ-আরএফএল এ পর্যন্ত সৌর শক্তি খাতে প্রায় ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ এই উৎপাদন সক্ষমতা ১০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে তাদের।

কামরুজ্জামান কামাল আরও বলেন, “আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চাহিদার শতভাগ সৌরবিদ্যুৎ থেকে উৎপাদনের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করে বিনিয়োগ পরিকল্পনা করা হয়েছে। ওই সময় আমাদের চাহিদা প্রায় ২৫০ মেগাওয়াটে উন্নীত হবে। আমাদের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতাও তখন চাহিদার সমান বা তার চেয়ে বেশি হবে”- যোগ করেন তিনি।

বর্তমানে সোলার প্যানেল ও ইনভার্টার আমদানি করে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। নিজস্ব কারখানায় উৎপাদন শুরু হলে প্রাণ-আরএফএল বাসাবাড়ি ও বাণিজ্যিক গ্রাহকদের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ সেবা দেওয়ার পাশাপাশি—সরকারি দরপত্রে অংশ নিয়ে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রতিযোগিতা করবে।

উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াচ্ছে ওয়ালটন

গাজীপুরের চন্দ্রায় একটি সোলার ইনভার্টার উৎপাদন কারখানা স্থাপনের কাজ শুরু করেছে ওয়ালটন। কোম্পানিটি ইতোমধ্যে লিথিয়াম ব্যাটারী ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্ট স্থাপন সম্পন্ন করেছে, যা এক মাসের মধ্যে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করবে বলে জানিয়েছেন ওয়ালটন গ্রুপের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জির নির্বাহী পরিচালক ও প্রধান প্রকৌশলী মো. নাজমুল ইসলাম।

বর্তমানে ওয়ালটন চীন থেকে ওরিজিনাল ইকুইপমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার (ওইএম) হিসেবে এআরসি ইনভার্টার আমদানি করে নিজস্ব ব্র্যান্ড নামে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে থাকে।

টিবিএসের প্রশ্নের প্রেক্ষিতে ওয়াল্টন গ্রুপ লিখিতভাবে জানিয়েছে, ”ওয়ালটন লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি উৎপাদন কারখানা স্থাপন করছে। খুব শিগগির সেখানে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হবে। একই সঙ্গে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশের স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলতে সোলার ইনভার্টার ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্ট এবং সোলার প্যানেল উৎপাদন প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে ওয়ালটন।”

ওয়ালটনের লক্ষ্য হচ্ছে, প্রযুক্তিনির্ভর ও পরিবেশবান্ধব পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ও স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে একটি টেকসই ও গ্রিন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা। এর মাধ্যমে দেশের জ্বালানি সাশ্রয়, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস, পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আরও কার্যকর অবদান রাখতে চায় ওয়ালটন।

বার্ষিক ১৫ মিলিয়ন ডলারের ইনভার্টার আমদানি

সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে সূর্যের আলো সোলার প্যানেলে পড়লে ফোটোভোল্টাইক কোষগুলো তা শোষণ করে এবং ডাইরেক্ট কারেন্ট বা ডিসি) বিদ্যুৎ তৈরি করে ইনভার্টারে পাঠায়। ইনভার্টার এই ডিসি বিদ্যুৎকে আমাদের অল্টারনেটিং কারেন্ট বা এসি বিদ্যুতে রূপান্তর করে; যা সহজেই ফ্রিজ, লাইট, ফ্যানসহ বাড়ির অন্যান্য ইলেকট্রনিক যন্ত্র চালাতে এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে পাঠাতে সাহায্য করে।

বাংলাদেশে এখন সোলার ইনভার্টার উৎপাদন হয় না। মূলত চীন, জাপান ও ভারত থেকে এগুলো আমদানি হয়। বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১৫ মিলিয়ন ডলারের ইনভার্টার আমদানি করে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত চার মাসে বাংলাদেশে প্রায় ৪২৯.৪০ টন সোলার ইনভার্টার আমদানি হয়।

অন্যদিকে, লিথিয়াম ব্যাটারি সৌরবিদ্যুৎ সংরক্ষণ করে থাকে। সূর্যের আলো যখন থাকে না, তখন এই ব্যাটারিতে সংরক্ষিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যায়। বাসা-বাড়ির ছাদভিত্তিক ছোট সৌর প্যানেল থেকে শুরু করে বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো রাতে বা পিক টাইমে ব্যবহারের জন্য দিনের বেলায় উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যাটারিতে সংরক্ষণ করে থাকে।

স্থানীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে সরকার ইনভার্টার, ব্যাটারি ও সোলার প্যানেল তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ককর কমিয়ে মাত্র ১ শতাংশ করেছে। তবে বাণিজ্যিকভাবে ইনভার্টার আমদানিতে প্রায় ২৮ শতাংশ, সোলার প্যানেল আমদানিতে ৬৩ শতাংশ ও লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি আমদানিতে ২৯ শতাংশ শুল্ককর রয়েছে।

সরকার চলতি বছরের মধ্যে সারাদেশে ৪,০০০ মেগাওয়াট এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ১০,০০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

সরকার সম্প্রতি সৌরবিদ্যুতের ক্ষেত্রে নেট মিটারিং ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা দিয়েছে, যার আওতায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদকরা তাঁদের উৎপাদিত উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে বাড়তি মুনাফাসহ ১০.৫০ টাকা প্রতি ইউনিট দরে বিক্রি করতে পারবে।

পূর্ণাঙ্গ সমাধান ও সেবা

চলমান বিদ্যুৎ সংকট সরকারি প্রণোদনা ও শুল্ক ছাড়ের কারণে দেশে সৌর প্যানেল, ইনভার্টার ও লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির চাহিদা দ্রুত  বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতদিন মানুষজন বাসা-বাড়িতে সৌর প্যানেল স্থাপন করলেও, সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও বিক্রয়োত্তর সেবার অভাবে এ খাতে কাঙ্ক্ষিত গতি আসছিল না।

ওয়ালটন ও প্রাণ-আরএফএল এখন থেকে সৌর সিস্টেম গ্রহণে আগ্রহী গ্রাহক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য পূর্ণাঙ্গ সমাধান (এন্ড-টু-এন্ড সাপোর্ট) দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এই মডেলে গ্রাহক নিজে মূল মূলধন বিনিয়োগ করবেন, আর কোম্পানিগুলো প্ল্যান্ট স্থাপন করবে এবং চুক্তি সাপেক্ষে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ সেবা প্রদান করবে। গ্রাহক চাইলে নিজেও তা রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারবে।

বেসরকারিভাবে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে প্ল্যান্ট স্থাপনে সহায়তার পাশাপাশি সরকারিভাবে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনেও কাজ পাবার আশা করছে ওয়ালটন ও প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। তবে সরকারিভাবে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে দরপত্রে অংশগ্রহণ করে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কাজ পেতে হবে দেশীয় কোম্পানি দু’টিকে।

সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/16864 ,   Print Date & Time: Tuesday, 8 September 2026, 09:17:50 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh