
ইবি রিপোর্ট
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে স্বামী মো. জসিম উদ্দিনের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত সংস্থার কাছে জবানবন্দি দেওয়ার জেরে তার বড় মেয়ে লামিয়াকে ধর্ষণের শিকার হতে হয় বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন নিহত জসিমের স্ত্রী রুমা বেগম। তিনি জানান, বিষয়টি সামাজিকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে আত্মহননের পথ বেছে নেন লামিয়া।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে দেওয়া জবানবন্দিতে এসব কথা বলেন তিনি।
পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার বাসিন্দা রুমা বেগম একজন গৃহিণী। গত বছরের জুলাই আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান তার স্বামী জসিম উদ্দিন, যিনি পেশায় একটি প্রতিষ্ঠানের চালক ছিলেন।
জবানবন্দিতে রুমা জানান, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যোগ দেন জসিম। তখন তারা রাজধানীর আদাবর থানার শেখেরটেক এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। ওই দিন ধাওয়ার শিকার হয়ে আহত অবস্থায় বাসায় ফেরেন তিনি। পরদিন ১৯ জুলাই জুমার নামাজের কথা বলে বাসা থেকে বের হয়ে আর ফেরেননি জসিম।
রুমা বলেন, স্বামীর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়ার পর সন্ধ্যায় প্রতিবেশীর মাধ্যমে জানতে পারেন, আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে জসিম সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছেন। হাসপাতালে গিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় স্বামীকে দেখতে পান তিনি। জসিমের ভাষ্য অনুযায়ী, জুমার নামাজ শেষে মোহাম্মদপুরের আল্লাহ করিম মসজিদের সামনে আন্দোলনে যোগ দিলে পুলিশ ও ছাত্রলীগের গুলিতে তিনি আহত হন।
রুমার বর্ণনায়, ওইদিন হাসপাতালে প্রচুরসংখ্যক আহত আন্দোলনকারী আসায় জসিমের অস্ত্রোপচার সবার শেষে রাত আড়াইটার দিকে সম্পন্ন হয়। পরদিন তার হাতের দুটি আঙুলে পচন ধরায় তা কেটে ফেলতে হয়। অবস্থার আরও অবনতি হলে ২২ জুলাই তাকে মহাখালীর বক্ষব্যাধি হাসপাতালের আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়, যেখানে আরেকটি অস্ত্রোপচারের পর তিনি আর জ্ঞান ফিরে পাননি। পরে লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় ২৯ জুলাই রাতে মৃত্যু হয় জসিমের।
রুমা অভিযোগ করেন, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ছাড়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মরদেহ দিতে অস্বীকৃতি জানালে বনানী ও মোহাম্মদপুর থানার মধ্যে তাকে বারবার ছোটাছুটি করতে হয়। শেষ পর্যন্ত মামলা করার শর্তে ৩১ জুলাই স্বামীর মরদেহ পান তিনি এবং গ্রামের বাড়িতে নিয়ে দাফন সম্পন্ন করেন।
জবানবন্দিতে রুমা বলেন, ঢাকায় ফেরার পর বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় সূত্র থেকে স্বামীর মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে জানতে পারেন তিনি। তার অভিযোগ, শেখ হাসিনা, সাবেক মেয়র তাপস ও জাহাঙ্গীর কবির নানকের নির্দেশে পুলিশ কর্মকর্তাসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী ও স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিরা এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। জবানবন্দিতে তিনি একাধিক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেন, যাদের বিভিন্ন ভিডিওতে আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্র হাতে দেখার দাবি করেন তিনি।
রুমা জানান, তদন্তকারী কর্মকর্তাকে জবানবন্দি দিতে ২০২৫ সালের ১৭ মার্চ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঢাকায় আসেন তিনি। সে সময় বড় মেয়ে লামিয়া উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী হওয়ায় তাকে বাড়িতে রেখে আসা হয়। রুমার ভাষ্য অনুযায়ী, ১৮ মার্চ বাবার কবর জিয়ারত শেষে বাড়ি ফেরার পথে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের দ্বারা লামিয়া ধর্ষণের শিকার হন। রুমার দাবি, তার ঢাকায় গিয়ে সাক্ষ্য দেওয়ার কারণেই মেয়েকে লক্ষ্য করে এ ঘটনা ঘটানো হয়।
ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দেওয়ার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন রুমা বেগম। তিনি স্বামীর হত্যার বিচার দাবি করেন।