
ইবি রিপোর্ট
অর্থনীতির আকারে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে। কিন্তু সেই অর্থনীতির প্রতিচ্ছবি এখনো দেখা যায় না শেয়ারবাজারে। বাজার মূলধন ও জিডিপির অনুপাতে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের অবস্থান মাত্র ৬ শতাংশের মতো। বিপরীতে ভারতে এ হার ২০২৫ সালে প্রায় ১২৫ শতাংশ, ভিয়েতনামে সাম্প্রতিক হিসাবগুলোতে ৫০ শতাংশের বেশি এবং তুরস্কেও বাংলাদেশের চেয়ে বহুগুণ বেশি।
সূচকের গতিও একই চিত্র দিচ্ছে। গত এক দশকে বাংলাদেশের প্রধান শেয়ারসূচক যেখানে আনুমানিক ৩০ শতাংশের মতো বেড়েছে, সেখানে ভিয়েতনাম প্রায় ১৩৪ শতাংশ, ভারত প্রায় ৩০০ শতাংশ এবং তুরস্ক প্রায় ১ হাজার ৩০০ শতাংশ এগিয়েছে। ফলে অর্থনীতির আকার বাড়লেও বাংলাদেশের পুঁজিবাজার আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য এখনো বড় ও গভীর বাজার হয়ে উঠতে পারেনি। এ বাস্তবতায় বিদেশি পুঁজি টানার প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে- ভালো কোম্পানি বাজারে আনা, সুশাসন নিশ্চিত করা, তথ্যের স্বচ্ছতা বাড়ানো, তারল্য তৈরি করা এবং নীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু সূচক বাড়ানো বা বিদেশে রোডশো করলেই বিদেশি বিনিয়োগ আসবে না। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী প্রথমে দেখবেন বাজারে বিনিয়োগযোগ্য ভালো কোম্পানি আছে কি না, কোম্পানির হিসাব কতটা নির্ভরযোগ্য, বিনিয়োগের অর্থ কত দ্রুত দেশে আনা ও ফেরত নেওয়া যায় এবং বাজারের নিয়ম আগামী কয়েক বছর স্থিতিশীল থাকবে কি না।
নির্বাচনের পর ফেব্রুয়ারিতে বিদেশি লেনদেনে কিছুটা উল্লম্ফন দেখা গেলেও পরবর্তী সময়ে তা আবার কমেছে। এপ্রিলেই বিদেশিরা প্রায় ১২৪ কোটি টাকা তুলে নেন। এই পরিস্থিতিই দেখিয়ে দেয়, বাংলাদেশের বাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি আস্থাও তৈরি হয়নি। এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও বাজারের সাম্প্রতিক উত্থানকে শুধু সূচকের চোখে দেখতে নারাজ।
তিনি বলেছেন, সূচকের যে উত্থান হয়েছে, তা মূলত আস্থাভিত্তিক। কসমেটিক এর মাধ্যমে পুঁজিবাজারের মৌলিক পরিবর্তন হবে না। দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, সরকার পুঁজিবাজারের আইন ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোয় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনবে। বিএসইসিকে আরও কার্যকর করা, স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে যাওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মৌলভিত্তি শক্তিশালী ও লাভজনক কোম্পানিকে বাজারে আনার ওপর জোর দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ তহবিল আকর্ষণ করে বাজারের তারল্য বাড়ানো ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, বাংলাদেশে অনেক বড় দেশি ও বহুজাতিক কোম্পানি রয়েছে। এসব ভালো কোম্পানিকে দ্রুত পুঁজিবাজারে না আনলে বাজার প্রত্যাশিতভাবে বিকশিত হবে না। বিএসইসি আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে কয়েকটি বড় ও গুরুত্বপূর্ণ কোম্পানিকে বাজারে আনার লক্ষ্য নিয়েছে। প্রথমে বড় কোম্পানিগুলোকে স্বেচ্ছায় তালিকাভুক্ত হতে উৎসাহ দেওয়া হবে।
তারা না এলে জনস্বার্থে আইন প্রয়োগের সুযোগও রয়েছে। বড় কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করতে সরাসরি তালিকাভুক্তি ও হাইব্রিড লিস্টিং চালুর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি। এখানেই বাংলাদেশের বাজারের অন্যতম মৌলিক দুর্বলতা ধরা পড়ে। দেশের বড় শিল্পগোষ্ঠী, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, টেলিযোগাযোগ, ভোগ্যপণ্যসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ খাতের প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজারের বাইরে। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে এলেও বাজারে দেশের অর্থনীতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পান না।
মাসুদ খানের মতে, তালিকাভুক্তি কেবল কোম্পানির জন্য অর্থ সংগ্রহের পথ নয়; এতে কোম্পানির বাজারমূল্য তৈরি হয়, অধিগ্রহণ ও একীভূতকরণ সহজ হয় এবং পুরোনো মালিকদের জন্য শেয়ার বিক্রির সুযোগ তৈরি হয়। পারিবারিক ব্যবসায় প্রজন্ম পরিবর্তনের সময় মালিকানার দ্বন্দ্ব ও বিভাজন ঠেকাতেও তালিকাভুক্তি কার্যকর হতে পারে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চের চেয়ারম্যান ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ম্যানেজিং ডিরেক্টর সাকিফ শামীম বলেন, গত দুই দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে গতিতে প্রবৃদ্ধি এসেছে, পুঁজিবাজার তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। ফলে অর্থনীতির বড় অংশ এখনো শেয়ারবাজারের বাইরে রয়েছে।
তিনি বলেন, অনেক বড় ও লাভজনক প্রতিষ্ঠান পারিবারিক মালিকানায় পরিচালিত। ব্যাংকঋণের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের তুলনামূলক সহজ সুযোগ থাকায় তারা তালিকাভুক্তির সঙ্গে যুক্ত স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিয়ন্ত্রক বাধ্যবাধকতার মধ্যে আসতে আগ্রহী নয়। এতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সামনে মানসম্পন্ন কোম্পানির বিকল্প কমে যায়।
সাকিফ শামীম বলেন, বাংলাদেশের বাজারে বিদেশি বিনিয়োগ না বাড়ার পেছনে শুধু রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা নয়; ভালো কোম্পানির ঘাটতি, দুর্বল করপোরেট গভর্ন্যান্স, নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাব, সীমিত তারল্য এবং নীতির ধারাবাহিকতার অভাব একসঙ্গে দায়ী।
তিনি বলেন, ভিয়েতনামের মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, বড় দেশি শিল্পগোষ্ঠী ও বহুজাতিক কোম্পানিকে বাজারে আনতে হবে। একই সঙ্গে পেনশন, বিমা ও মিউচুয়াল ফান্ডের মতো প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী বাড়াতে হবে। শেয়ারের পাশাপাশি বন্ড, সুকুক ও ডেরিভেটিভের বাজারও সম্প্রসারণ করতে হবে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নূজহাত আনোয়ার বলেন, তারল্য ও অবকাঠামোতে পরিবর্তন দরকার। তিনি জানান, চলতি বছরের মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠকে ডিএসই যেসব সংস্কার প্রস্তাব দেয়, তার মধ্যে ছিল লেনদেন নিষ্পত্তির সময় T+2 থেকে T+1-এ নামিয়ে আনা, রিয়েল-টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট ব্যবস্থার সময় বাড়ানো এবং অনিবাসী বিনিয়োগকারীদের টাকা আনা-নেওয়ার হিসাব সহজ করা।
এসব পদক্ষেপ বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো ও বাজারের তারল্য উন্নত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে ডিএসই জানিয়েছে। ডিএসই বাজারে নতুন বিনিয়োগ পণ্য ও প্রযুক্তিনির্ভর লেনদেন কাঠামোও বাড়াতে চাইছে।
এ প্রসঙ্গে নূজহাত আনোয়ার বলেন, খোলা প্রান্তের মিউচুয়াল ফান্ডের জন্য আলাদা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে খুচরা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সহজে ফান্ডের ইউনিট কেনাবেচা করতে পারবেন।