
ইবি রিপোর্ট
হিমালয়ের দেশ ভুটান থেকে বাংলাদেশে আসছে ফল, মসলা ও পাথর। অন্যদিকে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের শহর সৈয়দপুরে তৈরি ট্রাউজার, শর্টস, টি-শার্ট ও জ্যাকেটসহ বিভিন্ন পোশাক যাচ্ছে ভুটানের বাজারে। দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ বড় না হলেও পণ্য আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে তৈরি হচ্ছে ভিন্নধর্মী একটি আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্পর্ক। একদিকে ভুটানের কৃষি ও খনিজ সম্পদ প্রবেশ করছে বাংলাদেশের বাজারে, অন্যদিকে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র পোশাক উৎপাদনকারীরা পৌঁছে যাচ্ছেন প্রতিবেশী দেশটির ভোক্তা বাজারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ভুটান থেকে আমদানির বিপরীতে বাংলাদেশের অর্থ পরিশোধ গত অর্থবছরে আরও বেড়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভুটান থেকে আমদানির জন্য বাংলাদেশ ৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার পরিশোধ করেছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই অর্থের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ৪ কোটি ৪১ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমদানি বাবদ অর্থ পরিশোধ বেড়েছে ৫১ লাখ ডলার বা প্রায় ১৩ দশমিক ১ শতাংশ।
তবে এ সময়ে আমদানির পণ্যের কাঠামোতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভুটান থেকে বাংলাদেশের আমদানিতে খনিজজাত পণ্যের আধিপত্য ছিল সবচেয়ে বেশি। ওই অর্থবছরে এ খাত থেকে আমদানি বাবদ পরিশোধ করা হয় ২ কোটি ২৪ লাখ ডলার, যা মোট আমদানির ৫৭ দশমিক ৪ শতাংশ। অন্যদিকে উদ্ভিজ্জ পণ্যের আমদানি ছিল ১ কোটি ৪৮ লাখ ডলার বা মোট আমদানির ৩৭ দশমিক ৯ শতাংশ।
পরবর্তী অর্থবছরে এ চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উদ্ভিজ্জ পণ্যের আমদানি বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৯১ লাখ ডলারে, যা ভুটান থেকে বাংলাদেশের মোট আমদানির ৪৩ দশমিক ৩ শতাংশ। একই সময়ে খনিজজাত পণ্যের আমদানিও ১ কোটি ৯১ লাখ ডলারে নেমে আসে। ফলে দুই খাতের ব্যবধান প্রায় দূর হয়ে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, খনিজজাত পণ্যের আমদানি আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। বিপরীতে উদ্ভিজ্জ পণ্যের আমদানি বেড়েছে ২৯ দশমিক ১ শতাংশ।
ভুটান থেকে ফল আমদানির প্রবৃদ্ধিও এই পরিবর্তনের একটি দিক তুলে ধরছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পণ্যভিত্তিক আমদানি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভুটান থেকে আপেল, নাশপাতি ও কুইন্সজাতীয় ফল আমদানি হয়েছে ৩ লাখ ২৯ হাজার ডলারের। আগের অর্থবছরে এ ধরনের ফল আমদানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১৬ হাজার ডলার।
ফলের পাশাপাশি ভুটান থেকে কফি, চা ও মসলাজাতীয় পণ্যও বাংলাদেশে আমদানি হচ্ছে। একই সঙ্গে গ্রানাইট, পোরফিরি, ব্যাসল্ট, স্যান্ডস্টোন, নুড়ি ও কংকরসহ বিভিন্ন খনিজ ও পাথরজাত পণ্যও আসছে দেশটি থেকে। ফলে ভুটান থেকে বাংলাদেশের আমদানির বড় দুটি ভিত্তি হয়ে উঠেছে কৃষি ও উদ্ভিজ্জ পণ্য এবং নির্মাণ ও শিল্পসংশ্লিষ্ট খনিজ পণ্য।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সামগ্রিক হিসাবেও দুই অর্থবছরের পরিবর্তনটি স্পষ্ট। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভুটান থেকে বাংলাদেশের আমদানি অর্থ পরিশোধ ছিল ৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ৪ কোটি ৪১ লাখ ডলার। একই সময়ে ভুটান থেকে আমদানিতে উদ্ভিজ্জ পণ্যের অংশ ৩৭ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৩ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিপরীতে খনিজ পণ্যের অংশ ৫৭ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ৪৩ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে।
ভুটান থেকে বাংলাদেশে পণ্য আসার পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকেও দেশটির বাজারে বিভিন্ন পণ্য যাচ্ছে। ভুটানের সরকারি বাণিজ্য নথিতে বাংলাদেশ থেকে টি-শার্ট, জ্যাকেট, ব্লেজার, ট্রাউজার, স্কার্ফসহ বিভিন্ন পোশাক ও পোশাকসামগ্রী আমদানির তথ্য পাওয়া যায়। অর্থাৎ দুই দেশের বাণিজ্য শুধু ভুটান থেকে বাংলাদেশে পণ্য আসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বাংলাদেশের তৈরি পণ্যও ছোট পরিসরে ভুটানের বাজারে জায়গা করে নিচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে উত্তরাঞ্চলের সৈয়দপুর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। দেশের বড় তৈরি পোশাক শিল্পকেন্দ্রগুলোর বাইরে শহরটির বাড়ি ও ছোট কারখানাভিত্তিক পোশাক উৎপাদন দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণ করে আসছে। এখন এর একটি অংশ সীমান্তের ওপারের বাজারেও যাচ্ছে।
বণিক বার্তাসহ স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে সৈয়দপুরে বাড়ি ও ছোট কারখানাভিত্তিক পোশাক উৎপাদন করে ভারত, ভুটান ও নেপালে রপ্তানির তথ্য উঠে এসেছে। এসব প্রতিবেদনে সৈয়দপুরের এক রপ্তানিকারকের ভুটানে ২ হাজার ৯৫০ ডলারের ট্রাউজার, শর্টস ও টি-শার্ট রপ্তানির উদাহরণও রয়েছে।
তবে সৈয়দপুর থেকে এই রপ্তানির পরিমাণ দেশের বড় পোশাক কারখানাগুলোর রপ্তানির তুলনায় খুবই ছোট। এর গুরুত্ব অন্য জায়গায়। প্রচলিত পোশাক শিল্পের বড় অঞ্চলগুলোর বাইরে একটি জেলা শহরের ক্ষুদ্র ও বাড়িভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থাও যে প্রতিবেশী দেশের বাজারের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, এ বাণিজ্য তারই উদাহরণ।
ভুটান বাংলাদেশের বড় কোনো বাণিজ্য অংশীদার নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের মোট আমদানির তুলনায় ভুটানের অংশ খুবই কম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভুটান থেকে আমদানি বাবদ বাংলাদেশের অর্থ পরিশোধ ছিল ৪ কোটি ৪১ লাখ ডলার। একই সময়ে সব সার্ক দেশ থেকে বাংলাদেশের আমদানি অর্থ পরিশোধের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৫২৭ কোটি ডলারের বেশি।
তারপরও ভুটান-বাংলাদেশের এই ছোট বাণিজ্য প্রবাহে আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে। ভুটান থেকে বাংলাদেশের বাজারে ফল, মসলা ও খনিজ পণ্য আসছে। বিপরীতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, এমনকি সৈয়দপুরের মতো ছোট উৎপাদনকেন্দ্রে তৈরি পোশাকও পৌঁছে যাচ্ছে ভুটানের বাজারে। বাণিজ্যের পরিমাণ সীমিত হলেও এর মাধ্যমে দুই দেশের স্থানীয় উৎপাদন ও ভোক্তা বাজারের মধ্যে সরাসরি একটি সংযোগ তৈরি হচ্ছে।