• হোম > জাতীয় | দেশজুড়ে > দেশে হামের প্রকোপ কমছে না, মৃত্যু বেড়ে ৯৯৪

দেশে হামের প্রকোপ কমছে না, মৃত্যু বেড়ে ৯৯৪

  • সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩৮
  • ৪

---

ইবি রিপোর্ট

দেশে প্রায় ছয় মাস ধরে হামের প্রাদুর্ভাব চললেও আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কমছে না। হাম ও হামসদৃশ উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ১ হাজারে পৌঁছেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম নিয়ন্ত্রণ এখন সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় পর্যাপ্ত গুরুত্ব পাচ্ছে না। পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে সংক্রমণ আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তাদের মতে, সংক্রমণ এখন প্রায় সব বয়সী শিশুর মধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে। তাই প্রমাণভিত্তিকভাবে টিকাদানের বয়সসীমা অন্তত ১৫ বছর পর্যন্ত বাড়ানো, মাঠপর্যায়ে মাইক্রোপ্ল্যানিং জোরদার এবং কমিউনিটি পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো জরুরি।

তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, হাম নিয়ন্ত্রণে টিকাদানের বয়সসীমা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামসদৃশ উপসর্গে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর ফলে দেশে নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন হাম-সংশ্লিষ্ট মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ৯৯৪ জনে দাঁড়িয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে হাম সন্দেহে মোট ১ লাখ ৪৪ হাজার ১৬৮ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ১ লাখ ৩৮ হাজার ৭৭২ জন।

সব বয়সী শিশুর মধ্যে সংক্রমণ

জাতীয় হাম ও রুবেলা নির্মূল যাচাই কমিটির চেয়ারম্যান ও মহামারি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে হাম সংক্রমণ কমার উল্লেখযোগ্য কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। কারণ প্রায় সব বয়সী শিশুর মধ্যেই সংক্রমণ রয়েছে।

তিনি বলেন, ছয় থেকে নয় মাস, নয় মাস থেকে এক বছর এবং এক থেকে পাঁচ বছর—সব বয়সী শিশুর মধ্যেই সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। কোথাও সংক্রমণ কিছুটা কমলেও তা উল্লেখযোগ্য নয়। এতে বোঝা যায়, ঘোষিত টিকাদান কভারেজ বাস্তবে পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।

অধ্যাপক মাহমুদুর রহমানের মতে, ১০৩ শতাংশ টিকাদান কভারেজের দাবি বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। লক্ষ্য নির্ধারণে অসঙ্গতি থাকলে কভারেজের হিসাবও বিভ্রান্তিকর হতে পারে।

তিনি বলেন, এখন প্রমাণভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। কোন এলাকায় এবং কোন বয়সের শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, তা বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করে সেসব এলাকায় অতিরিক্ত টিকাদান কার্যক্রম চালাতে হবে।

তার মতে, শুধু পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত নয়, অন্তত ১৫ বছর বয়সী শিশুদেরও টিকাদানের আওতায় আনা উচিত। পাশাপাশি শিশুদের টিকাকেন্দ্রে নিয়ে আসতে মায়েদের উৎসাহিত করতে ব্যাপক জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম প্রয়োজন।

বিশেষ করে ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের জ্বর হলে দ্রুত শনাক্ত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

অধ্যাপক মাহমুদুর রহমানের অভিযোগ, হাম এখন সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় আগের মতো গুরুত্ব পাচ্ছে না। অতীতে টিকাদান কর্মসূচির পর সংক্রমণ দ্রুত কমলেও এবার তেমনটি দেখা যাচ্ছে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

কমিউনিটি পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ মুশতাক হোসেন বলেন, হাম নিয়ন্ত্রণের কৌশল শুধু হাসপাতাল বা আইসিইউকেন্দ্রিক হলে চলবে না। কমিউনিটি পর্যায়েই রোগী শনাক্ত, প্রতিরোধ ও আইসোলেশনের ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে।

তিনি বলেন, জরুরি পরিস্থিতিতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে ইপিআইয়ের প্রচলিত মাইক্রোপ্ল্যানিং পদ্ধতিতে ফিরে যেতে হবে। অর্থাৎ প্রতিটি শিশুর তালিকা তৈরি করে কার টিকা প্রয়োজন এবং কোথায় টিকা দেওয়া হবে—এসব আগেই নির্ধারণ করতে হবে।

তার মতে, পাঁচ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদেরও টিকাদানের আওতায় আনা প্রয়োজন। কারণ এই বয়সী শিশুরাও বর্তমানে আক্রান্ত হচ্ছে।

অবহেলা চললে ভাবমূর্তি ক্ষতির শঙ্কা

ডা. মুশতাক হোসেন সতর্ক করে বলেন, হামকে যথাযথ গুরুত্ব না দিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হামের প্রাদুর্ভাব থাকলেও বাংলাদেশের মতো উচ্চ মৃত্যুহার দেখা যাচ্ছে না। তার মতে, এটি রোগী ব্যবস্থাপনা ও প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।

টিকাদানের বয়সসীমা বাড়ানোর পরিকল্পনা

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক ডা. হালিমুর রশিদ বলেন, টিকাদানের বয়সসীমা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, প্রাদুর্ভাব শুরুর চার সপ্তাহের মধ্যেই ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের দ্রুত টিকার আওতায় আনা হয়েছিল। পরে দেখা যায়, এ বয়সসীমার প্রায় ৪০ লাখ শিশু টিকার বাইরে ছিল।

বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনতে পরে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম নেওয়া হয়। জাতীয় টিকাদান কারিগরি উপদেষ্টা গ্রুপ (নাইট্যাগ) সুপারিশ করলে পাঁচ থেকে ১০ বা ১৫ বছর বয়সী শিশুদেরও টিকার আওতায় আনা হবে বলে জানান তিনি।

টিকাদান কর্মসূচির পরও বাড়ছে সংক্রমণ

চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি দেশে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর ৫ এপ্রিল জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে সরকার।

প্রথম দফার কর্মসূচির নির্ধারিত শেষ দিন ২০ মে পর্যন্ত ছয় থেকে ৫৯ মাস বয়সী ১ কোটি ৮৪ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়। নির্ধারিত ১ কোটি ৮০ লাখের লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও এ সংখ্যা বেশি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কর্মসূচির পর জুন ও জুলাইয়ে হামে আক্রান্ত, হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর সংখ্যা ধীরে ধীরে কমেছিল। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কমার হার প্রত্যাশিত মাত্রায় ছিল না।

২৮ জুন অনুষ্ঠিত জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনে একই বয়সসীমার ২ কোটি ২৩ লাখ শিশু ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল পায়। তখন দেখা যায়, প্রায় ৩৯ লাখ শিশু হামের টিকা থেকে বাদ পড়েছে।

পরে সরকার স্বীকার করে, হাম টিকাদান কর্মসূচিতে লক্ষ্যমাত্রা কম নির্ধারণ করা হয়েছিল। এরপর জুলাইয়ের শেষ দিকে বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করে টিকা দেওয়ার জন্য একটি মপ-আপ ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা হয়। রোববার পর্যন্ত এ কর্মসূচির আওতায় প্রায় ১ কোটি ৯৭ লাখ ২১ হাজার শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে।

তবে এরপরও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে হামে আক্রান্ত, হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর তিনটি সূচকই আবার বেড়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশে হামে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ৩২ হাজার ৯৩৪ জন হয়েছে। জুলাইয়ে এ সংখ্যা ছিল ৩১ হাজার ৩২৭। একই সময়ে দৈনিক গড় আক্রান্ত ১ হাজার ১০ জন থেকে বেড়ে ১ হাজার ৬২ জন হয়েছে।

আগস্টে মোট ২৭ হাজার ৪৫৮ জন হাম রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যেখানে জুলাইয়ে ভর্তি হয়েছিলেন ২৬ হাজার ৩৬০ জন। দৈনিক গড় ভর্তি রোগীর সংখ্যাও ৮৫০ থেকে বেড়ে ৮৮৬ জনে দাঁড়িয়েছে।

একইভাবে মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়েছে। আগস্টে হামে ১৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা জুলাইয়ের ১১৯ জনের তুলনায় ১৭ জন বেশি।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/16802 ,   Print Date & Time: Monday, 7 September 2026, 08:00:59 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh