
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
নতুন আমদানি নীতি আদেশে নিটওয়্যার রপ্তানিকারকদের ব্যবহৃত নিট ফেব্রিক আমদানির সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। এ সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের নিট পোশাক রপ্তানিকারকরা। তাদের আশঙ্কা, আমদানি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহে জটিলতা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি দেশের নিট পোশাক রপ্তানিও ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
আমদানি নীতি আদেশের এ বিধান বাতিলের দাবি জানিয়েছে দেশের পোশাক রপ্তানিকারকদের দুই শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)।
গত ১ সেপ্টেম্বর বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছে দেওয়া এক চিঠিতে সংগঠন দুটি আমদানি নীতি আদেশ থেকে নিট ফেব্রিক আমদানি বন্ধের বিধান প্রত্যাহারের দাবি জানায়। বিষয়টি নিয়ে রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি জরুরি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
কেন আমদানি বন্ধ করা হলো, স্পষ্ট নয়
নিট ফেব্রিক আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্ত ঠিক কী কারণে নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, নিটওয়্যার খাতের কাঁচামালের চাহিদা স্থানীয় শিল্পগুলো প্রায় পুরোপুরি পূরণ করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। তবে কিছু বিশেষায়িত ফেব্রিকের ক্ষেত্রে আমদানির প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি বলেন, বৈঠক হলে বিষয়টি আরও পরিষ্কারভাবে বোঝা যাবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে নিট পোশাকের কাঁচামাল উৎপাদনে স্থানীয় টেক্সটাইল মিলগুলোর সক্ষমতা বর্তমানে অনেক বেড়েছে। এ অবস্থায় বড় অঙ্কের বিনিয়োগে গড়ে ওঠা দেশীয় টেক্সটাইল শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যেই সরকার নিট ফেব্রিক আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আমদানি নীতি আদেশে বলা হয়েছে, সাধারণভাবে নিট ফেব্রিক আমদানি করা যাবে না।
তবে ক্রেতার সুনির্দিষ্ট চাহিদার ভিত্তিতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয় না—এমন বিশেষায়িত নিট ফেব্রিক আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ম্যান-মেড ফাইবার, স্পোর্টসওয়্যার ফেব্রিক এবং ফাংশনাল বা টেকনিক্যাল টেক্সটাইল।
এসব বিশেষায়িত ফেব্রিক আমদানির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারক সংগঠনের সুপারিশ এবং লিয়েন ব্যাংকের প্রত্যয়ন প্রয়োজন হবে।
ক্রয়াদেশ অন্য দেশে চলে যাওয়ার আশঙ্কা
পোশাক রপ্তানিকারকদের প্রধান উদ্বেগ হলো, ক্রেতাদের নির্দিষ্ট চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহ করতে না পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমতে পারে।
তাদের আশঙ্কা, ক্রেতারা যদি পছন্দ অনুযায়ী ফেব্রিক ব্যবহারের সুযোগ না পান, তাহলে তারা বাংলাদেশের পরিবর্তে অন্য কোনো দেশে ক্রয়াদেশ সরিয়ে নিতে পারেন।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, দেশে সব ধরনের নিট ফেব্রিক উৎপাদিত হয় না। কিছু উচ্চ মূল্য সংযোজিত নিট ফেব্রিক এখনো আমদানি করতে হয়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্রেতারা ফ্রি অব কস্ট (এফওসি) ভিত্তিতে কাঁচামাল সরবরাহ করেন। সেসব ক্ষেত্রেও আমদানি করা ফেব্রিকের প্রয়োজন হয়।
তিনি আরও বলেন, দেশের তুলনায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমদানি করা ফেব্রিকের দাম কম থাকে। ফলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে রপ্তানিকারকদের সেই কাঁচামাল আমদানি করতে হয়।
তার যুক্তি, একই কাঁচামাল বিদেশে কম দামে পাওয়া গেলেও যদি তা আমদানি করা না যায়, তাহলে ক্রেতারা বাংলাদেশে কেন ক্রয়াদেশ দেবেন—এ প্রশ্ন তৈরি হবে।
সিদ্ধান্ত নিয়ে রপ্তানিকারকদের ক্ষোভ
নিট ফেব্রিক আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্তের পেছনে কারা ভূমিকা রেখেছেন, তা খুঁজে বের করার দাবি জানিয়েছেন মোহাম্মদ হাতেম। তিনি সিদ্ধান্তটিকে দেশের রপ্তানিমুখী পোশাক খাতকে বিপাকে ফেলার ‘গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টি এর আগেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আলোচনায় এসেছিল। তখন পোশাক রপ্তানিকারকরা এর বিরোধিতা করে আমদানি কেন প্রয়োজন, সে বিষয়ে নিজেদের যুক্তি তুলে ধরেছিলেন।
মোহাম্মদ হাতেম জানান, সে সময় মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সচিব তাদের আশ্বস্ত করেছিলেন যে বিষয়টি আমদানি নীতি আদেশে অন্তর্ভুক্ত করা হবে না। পরে কীভাবে এটি চূড়ান্ত আদেশে যুক্ত হলো, সেটি জানাও জরুরি বলে মনে করছেন তিনি।
নিট পোশাকের ৮০ শতাংশ কাঁচামাল স্থানীয়
খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দেশের নিটওয়্যার শিল্পের প্রয়োজনীয় সুতা ও ফেব্রিকের প্রায় ৮০ শতাংশ স্থানীয় মিলগুলো থেকে সংগ্রহ করা হয়। বাকি অংশ আমদানি করা হয়।
অন্যদিকে, ওভেন পোশাকের প্রয়োজনীয় কাঁচামালের প্রায় অর্ধেক সরবরাহ করার সক্ষমতা রয়েছে দেশের স্থানীয় টেক্সটাইল মিলগুলোর।
এ কারণে পোশাক রপ্তানিকারকদের একাংশ মনে করছেন, স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতা বাড়লেও সব ধরনের কাঁচামালের ক্ষেত্রে এখনো পুরোপুরি স্বনির্ভরতা অর্জন সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে উচ্চ মূল্য সংযোজিত ও ক্রেতার নির্দিষ্ট চাহিদাভিত্তিক ফেব্রিকের ক্ষেত্রে আমদানির প্রয়োজন রয়েছে।
স্থানীয় সক্ষমতা যথেষ্ট: টেক্সটাইল মিল মালিকরা
তবে টেক্সটাইল শিল্পের উদ্যোক্তারা আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের দাবি, দেশের নিটওয়্যার খাতের প্রয়োজনীয় কাঁচামালের চাহিদা পূরণ করার মতো সক্ষমতা স্থানীয় মিলগুলোর রয়েছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, নিট পোশাকের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তুলনায় দেশের স্থানীয় মিলগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বেশি।
তার মতে, বাংলাদেশ বর্তমানে নিট পোশাক উৎপাদনে অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তবে বিদেশি ক্রেতারা অনেক সময় নির্দিষ্ট কাঁচামাল ব্যবহারের শর্ত দিয়ে থাকেন।
শওকত আজিজ রাসেলের ভাষ্য, আমদানি করা কাঁচামালের ক্ষেত্রে এর সুবিধা অনেক সময় পোশাক রপ্তানিকারকদের পরিবর্তে বিদেশি ক্রেতারাই নিয়ে থাকেন। সরকারের নতুন সিদ্ধান্তের ফলে কাঁচামাল সংগ্রহের ক্ষেত্রে ক্রেতাদের আগের মতো শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ কমবে বলে মনে করছেন তিনি।
বড় রপ্তানি খাত নিটওয়্যার
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। প্রতিবছর দেশ প্রায় ৩৯ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করে। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি আসে নিটওয়্যার খাত থেকে।
ফলে নিট ফেব্রিক আমদানির সুযোগ সীমিত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে রপ্তানিকারকদের উদ্বেগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। একদিকে স্থানীয় টেক্সটাইল শিল্পকে শক্তিশালী করা এবং অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে পোশাক সরবরাহ—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা এখন নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কাঁচামাল ব্যবহারে তারা আগ্রহী। তবে যেসব বিশেষায়িত ফেব্রিক এখনো দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে উৎপাদিত হয় না কিংবা বিদেশি ক্রেতারা নির্দিষ্টভাবে যে কাঁচামাল চান, সেগুলো আমদানির সুযোগ থাকা প্রয়োজন।
অন্যদিকে টেক্সটাইল মিল মালিকদের দাবি, স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতা কাজে লাগালে দেশের ভেতরেই কাঁচামালের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে এবং এতে দেশীয় শিল্পে বিনিয়োগও সুরক্ষিত থাকবে।
এই দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যেই আমদানি নীতি নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আসন্ন বৈঠককে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আলোচনার মাধ্যমে এমন একটি সমাধান বের হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যাতে স্থানীয় টেক্সটাইল শিল্পের সক্ষমতা ও বিনিয়োগ সুরক্ষার পাশাপাশি দেশের নিট পোশাক রপ্তানি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানও অক্ষুণ্ন থাকে।