• হোম > দেশজুড়ে | মতামত > সঠিক নীতি ও বিনিয়োগে উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতির সম্ভাবনা বাংলাদেশের

সঠিক নীতি ও বিনিয়োগে উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতির সম্ভাবনা বাংলাদেশের

  • শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩:৩৫
  • ৮

---

ইবি রিপোর্ট

উদ্ভাবনকে বাণিজ্যিকীকরণে পথে নিয়ে যাওয়া দীর্ঘ যাত্রা। কিন্তু সঠিক নীতি, দক্ষ জনশক্তি, বাস্তবমুখী গবেষণা, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও ইন্ডাস্ট্রির সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকলে বাংলাদেশ খুব দ্রুত উদ্ভাবন পরিচালিত অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে। দেশের তরুণরা আজ স্বপ্নে বিভোর, অনেক কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। তারুণ্যের উদ্ভাবন সঠিক জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের সবার।

উদ্ভাবনই আগামী বাংলাদেশের শক্তি। আর সেই শক্তিকে বাস্তবে রূপ দেওয়া প্রধান দায়িত্ব– এসব বিষয়ে দিকনির্দেশনামূলক কথা বলেছেন সাবেক বেসিস সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর।

বাংলাদেশে উদ্ভাবনকে জোরালো করা ও ধারণা থেকে বাণিজ্যিকীকরণ পর্যন্ত সুসংগঠিত পথ তৈরি করা এখন সবচেয়ে জরুরি কাজের মধ্যে একটি। উদ্ভাবন শুধু প্রযুক্তি বা স্টার্টআপের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিল্প, পরিবেশ, সেবা খাত– এসব ক্ষেত্রেই নতুন সমাধান, নতুন চিন্তা ও নতুন মূল্য সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের তরুণ জনশক্তি, ডিজিটাল অবকাঠামো, উদ্যোক্তা হওয়ার প্রচেষ্টা ও সরকারি উদ্যোগ– সব মিলিয়ে সম্ভাবনাময় ভিত্তি তৈরি হয়েছে।

এখন দরকার এই ভিত্তিকে আরও জোরালো করা এবং উদ্ভাবনকে বাস্তব অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরে স্পষ্ট, কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ। উদ্ভাবনের প্রথম ধাপ হলো ধারণা সৃষ্টি। বাংলাদেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও তরুণ উদ্যোক্তারা প্রতিদিনই নিত্যনতুন ধারণা নিয়ে কাজ করছে। ধারণা থেকে বাস্তব পণ্য বা পরিষেবা তৈরি করতে হলে দরকার গবেষণা ও উন্নয়ন সুবিধা, আধুনিক ল্যাব, দক্ষ পরামর্শক ও ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ।

বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা তহবিল বাড়ানো, শিক্ষার্থীর হাতে-কলমে উদ্ভাবন প্রশিক্ষণ দেওয়া ও ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যৌথ গবেষণার উদ্যোগ নিতে হবে। এতে শিক্ষার্থীরা বাস্তব সমস্যার সমাধান খুঁজতে উৎসাহিত হবে এবং তাদের উদ্ভাবন সময়ের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। একই সঙ্গে গবেষণাকে শুধু একাডেমিক প্রকাশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব শিল্পে প্রয়োগযোগ্য করতে হবে। পরে ধাপ হলো প্রোটোটাইপ তৈরি ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা। বাংলাদেশের অনেক উদ্ভাবকই ধারণা তৈরি করতে পারে; প্রোটোটাইপ বানানোর জন্য যথার্থ সরঞ্জাম, ল্যাব বা অর্থায়ন পায় না।

অনেক উদ্যোক্তাকে সার্টিফিকেশন পেতে বাধ্য হয়ে বিদেশে যেতে হয়, যা সময় ও ব্যয় বাড়ায়। দেশে আন্তর্জাতিক মানের টেস্টিং সুবিধা তৈরি করা তাই সময়ের দাবি। উদ্ভাবনের সবচেয়ে জরুরি ধাপ হলো অর্থায়ন। বাংলাদেশে স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম বাড়ছে; কিন্তু উদ্ভাবনভিত্তিক প্রকল্পে বিনিয়োগ এখনও সীমিত। করপোরেট ফান্ড, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল, অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টর ও সরকারি ইনোভেশন গ্রান্ট বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ের উদ্ভাবকদের জন্য সিড ফান্ডিং করা প্রয়োজন।

সরকার যদি উদ্ভাবনভিত্তিক স্টার্টআপে কর ছাড়, সহজ ঋণ, বিনিয়োগ সুরক্ষা ও ঝুঁকি ভাগাভাগির ব্যবস্থা করে, তাহলে অনেক বেশি উদ্যোক্তা নতুন ধারণা নিয়ে কাজ করতে উৎসাহিত হবে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে নীতি স্থিতিশীলতা, ব্যবসা সহজীকরণ ও প্রযুক্তিবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। অন্যদিকে স্টার্টআপদের জন্য বিশেষ পুঁজিবাজার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে তারা সহজে বিনিয়োগ সংগ্রহ করতে পারবে। উদ্ভাবনকে বাজারে নেওয়ার ধাপটি বেশ চ্যালেঞ্জিং। বাংলাদেশের অনেক উদ্ভাবন প্রোটোটাইপ পর্যায়ে সফল হলেও বাজারে পৌঁছাতে পারে না। এর প্রধান কারণ হলো বাজার বিশ্লেষণ, ব্র্যান্ডিং, উৎপাদন সক্ষমতা ও বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতা। বহির্বিশ্বে প্রবেশের জন্য রপ্তানি সহায়তা, মান সার্টিফিকেশন ও বৈশ্বিক প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশে উদ্ভাবনকে বাস্তবমুখী করতে হলে নীতি সংস্কার অপরিহার্য। উদ্ভাবনবান্ধব নীতি, মেধাস্বত্ব সুরক্ষা, দ্রুত পেটেন্ট অনুমোদন ও গবেষণা কর ছাড় উদ্ভাবকদের উৎসাহিত করবে। পেটেন্ট অনুমোদন প্রক্রিয়া বর্তমানে দীর্ঘ ও জটিল; এটি সহজ করা দরকার। একই সঙ্গে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রযুক্তি ট্রান্সফার অফিস স্থাপন করা উচিত, যাতে গবেষণা সহজে ইন্ডাস্ট্রির কাছে পৌঁছাতে পারে। গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হলে কর ছাড়, গবেষণা ভাউচার ও সরকারি অনুদান বাড়ানো যেতে পারে।

শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে গবেষণায় বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে হলে তাদের জন্য বিশেষ কর সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে হলে গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। বাংলাদেশে গবেষণায় বিনিয়োগ এখনও জিডিপির তুলনায় খুব কম। সরকার যদি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ায়, সব বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণা তহবিল দেয় ও শিল্পকে গবেষণায় অংশগ্রহণে উৎসাহিত করে, তাহলে উদ্ভাবন দ্রুত এগোবে। কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশ, শিল্প– এসব ক্ষেত্রেই গবেষণার মাধ্যমে নতুন সমাধান তৈরি করা সম্ভব।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/16669 ,   Print Date & Time: Saturday, 5 September 2026, 09:29:48 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh