• হোম > জাতীয় | দেশজুড়ে | মতামত > আমদানিনির্ভরতার ভুল নীতিতে যেভাবে জ্বালানি সংকটের খাদে বাংলাদেশ

আমদানিনির্ভরতার ভুল নীতিতে যেভাবে জ্বালানি সংকটের খাদে বাংলাদেশ

  • শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩৮
  • ৪

---

বিশেষ প্রতিনিধি 

বাংলাদেশের বর্তমান তীব্র জ্বালানি সংকট কোনো হঠাৎ আসা দুর্যোগ নয়, বরং দুই দশকের দীর্ঘমেয়াদি ভুল নীতি ও অদূরদর্শিতার পরিণতি। ২০০২ সালেই স্পষ্ট পূর্বাভাস পাওয়া গিয়েছিল যে ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে দেশের প্রধান সাশ্রয়ী জ্বালানি—প্রাকৃতিক গ্যাসের গচ্ছিত মজুত পুরোপুরি ফুরিয়ে আসবে। কিন্তু এই বিপর্যয় মোকাবিলায় টেকসই পদক্ষেপ না নিয়ে, একের পর এক আসা সরকারগুলো দ্রুত সমাধানের খোঁজে কেবল জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভর করেছে।

এই আমদানিনির্ভরতা সাময়িক স্বস্তি জোগানো এবং বিশেষ কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে বিপুল মুনাফা করার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া ছাড়া দেশের জন্য স্থায়ী কোনো সুফল আনেনি। বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না থাকায় দেশ দ্রুত ২০৩০ সালের জ্বালানি বিপর্যয়ের দিকে হেঁটেছে। অল্প দিনের জন্য আনা রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালানো হয়েছে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে।

অথচ শুরু থেকেই বিশেষজ্ঞরা দেশীয় জ্বালানি খাতের শক্ত ভিত গড়তে তিনটি মৌলিক সুপারিশ করে আসছিলেন:

১. নিজস্ব কয়লার কার্যকর উত্তোলন ও ব্যবহার।

২. নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারে জোরালো অনুসন্ধান চালানো।

৩. বড় পরিসরে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের প্রসার ঘটানো।

দুর্ভাগ্যবশত, এই সমাধানগুলো উপেক্ষিত থেকে গেছে। বাংলাদেশে বর্তমানে ৭২৫ মিলিয়ন থেকে ৭.৮ বিলিয়ন টন উন্নত কয়লার মজুত রয়েছে, যার বাজারমূল্য আনুমানিক ১.২৬ ট্রিলিয়ন ডলার। তা সত্ত্বেও এই সম্পদ মাটির নিচে ফেলে রেখে প্রতি বছর দেশীয় খাতের প্রায় ১.১ বিলিয়ন ডলার নষ্ট করা হচ্ছে কেবল কয়লা আমদানিতে।

একই অবস্থা প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রেও। ভূগর্ভস্থ বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ১৯৯৮ সালের পর দেশে আর কোনো বড় গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া যায়নি। অনুসন্ধান খাতটি থমকে ছিল প্রশাসনিক স্থবিরতা ও অদক্ষতায়। এই ঘাটতি মেটাতে সরকার চড়া মূল্যের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির সহজ পথ বেছে নেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে। অপরদিকে, পরিবেশবান্ধব সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনাগুলো কাগজে-কলমেই আটকে ছিল; কোনো সরকারই এতে কার্যকর গতি আনতে পারেনি।

গ্যাস রপ্তানির অমূলক বয়ান ও তৎকালীন রাজনীতি

১৯৯৮ সালে সিলেটের বিবিয়ানায় মার্কিন কোম্পানি ‘ইউনোকল’ বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে। তখন দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ও গ্যাসের চাহিদা ছিল বর্তমানের তুলনায় অনেক কম। ইউনোকল এই সুযোগে দ্রুত মুনাফা পেতে ভারতে গ্যাস রপ্তানির চক্রান্ত শুরু করে। ‘বাংলাদেশ গ্যাসে ভাসছে’—এমন কাল্পনিক বয়ান তৈরি করে তারা তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারকে চাপ দেয়। তবে সরকার সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়।

পরবর্তীতে ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে ইউনোকল ভারতে ১,৩৬৩ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন নির্মাণের প্রস্তাব দেয়, যার মাধ্যমে প্রতিদিন ৫০০ এমএমসিএফডি গ্যাস রপ্তানির পরিকল্পনা ছিল। পরিস্থিতি মূল্যায়নে সরকার বুয়েটের তৎকালীন উপাচার্য ড. নূরউদ্দিন এবং সাবেক জ্বালানি সচিব আজিম উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে দুটি পৃথক জাতীয় কমিটি গঠন করে।

কমিটির পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তে দেখা যায়, গ্যাসে ভাসার দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আসন্ন সংকটের কথা মাথায় রেখে কমিটি দুটি সাফ জানিয়ে দেয়—বাংলাদেশে রপ্তানিযোগ্য উদ্বৃত্ত গ্যাস নেই। এর ফলে বাধ্য হয়ে ইউনোকল দেশের ভেতরেই গ্যাস বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়। পরবর্তীতে ২০০৫ সালে শেভরন এই ক্ষেত্রটি অধিগ্রহণ করে এবং দেশের মোট চাহিদার অর্ধেক (দৈনিক ১,০০০ এমএমসিএফডি পর্যন্ত) গ্যাস এখান থেকেই সরবরাহ করা শুরু হয়।

এই সময়েই দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলার উদ্যোগ নেয় ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান এশিয়া এনার্জি। তবে দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তি ও বিপুল রয়্যালটি কম দেওয়ার প্রতিবাদে ২০০৬ সালে সেখানে তীব্র গণআন্দোলন গড়ে ওঠে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে ৫ জন আন্দোলনকারী নিহত হলে প্রকল্পটি পুরোপুরি স্থগিত হয়ে যায়।

মহাপরিকল্পনার ব্যর্থতা ও সমুদ্রের সুযোগ হাতছাড়া

২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় এসে দ্রুত বিদ্যুৎ বাড়াতে তেলভিত্তিক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্ট এবং ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির ওপর জোর দেয়। তবে শিল্প খাত ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পুরোপুরি দেশীয় গ্যাসের ওপর নির্ভরশীলই থেকে যায়। সংকট সামাল দিতে কুতুবদিয়ায় ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়।

২০১২ সালের ‘কোল পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট মাস্টার প্ল্যান’-এ ২০৩০ সালের মধ্যে প্রয়োজনীয় জ্বালানির অর্ধেকই স্থানীয় কয়লা ও গ্যাস থেকে সংস্থানের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল। এমনকি একটি পাইলট উন্মুক্ত কয়লাখনির কথাও ভাবা হয়েছিল। কিন্তু পরিবেশ ও কৃষি ক্ষতির আশঙ্কায় তৎকালিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে নতুন করে কয়লা উত্তোলনের পথ বন্ধ করে দেন। ফলাফলস্বরূপ, পরবর্তীতে পায়রা, রামপাল, মাতারবাড়ী ও বাঁশখালীর মতো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে গিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশকে বছরে প্রায় ২০ মিলিয়ন টন কয়লা আমদানি করতে হচ্ছে, যার পেছনে খরচ হচ্ছে ১.২ থেকে ১.৩ বিলিয়ন ডলার।

অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরের ১০ ও ১১ নম্বর ব্লকে গ্যাস অনুসন্ধানের বড় সুযোগ এসেছিল মার্কিন কোম্পানি কনোকোফিলিপসের মাধ্যমে। ২০১১ সালে তারা জরিপ চালিয়ে বিবিয়ানার সমপরিমাণ (৫-৭ টিসিএফ) সম্ভাব্য গ্যাসের সন্ধান পেয়েছিল। তবে গভীর সমুদ্রে ৩-৫ বিলিয়ন ডলার ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের বিপরীতে তারা গ্যাসের বিক্রয়মূল্য প্রতি এমএমসিএফডি ৪.৪০ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৮.৫০ ডলারে উন্নীত করার দাবি জানায়। তৎকালীন সরকার এ প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করলে কনোকোফিলিপস বাংলাদেশ ত্যাগ করে। অথচ বর্তমানে যে চড়া দামে এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে, কনোকোফিলিপসের চাওয়া দাম তার চেয়ে অনেক কম ছিল।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বর্তমান বাস্তবতা

২০০৮ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিতে ২০২০ সালের মধ্যে ১০ শতাংশ সবুজ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য ছিল, কিন্তু অর্জিত হয়েছিল মাত্র ২.৫ শতাংশ। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে বিনা দরপত্রে ৩১টি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রস্তাব (এলওআই) অনুমোদন করা হয়। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগে প্রকল্পগুলো ঢালাওভাবে বাতিল করে দেয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পগুলো ঢালাও বাতিল না করে পুনর্মূল্যায়ন বা দরকষাকষি করা যেত। এর ফলে দেশ থেকে প্রায় ৮২০ মিলিয়ন ডলারের জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানির বিকল্প তৈরি হওয়ার সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়। পরবর্তীতে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসে প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করার কথা বললেও দৃশ্যমান অগ্রগতির হার খুবই ধীর।

ভবিষ্যতের করণীয়

•বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমদানিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার বিকল্প নেই। দেশকে জ্বালানি নিরাপত্তা দিতে হলে নিম্নের বিষয়গুলোতে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে:

•অনুসন্ধানে জোর: স্থলভাগ এবং গভীর সমুদ্রে আধুনিক প্রযুক্তিতে গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ দ্রুত শুরু করতে হবে।

গ্রিন এনার্জি: অফশোর উইন্ড পার্ক ও সৌরবিদ্যুৎ খাতের আধুনিক প্রকল্পগুলোতে আকর্ষণীয় প্রণোদনা দিয়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ টানতে হবে।

•সীমা নির্ধারণ: অবাধ এলএনজি আমদানিতে অর্থনৈতিক ও ব্যবহারিক সীমা (Cap) টেনে শিল্পক্ষেত্রকে বিকল্প দক্ষ প্রযুক্তিতে স্থানান্তরে বাধ্য করতে হবে।

কয়লা নীতি বাস্তবায়ন: জাতীয় স্বার্থ ও পরিবেশকে সঠিক ভারসাম্য এনে নিজস্ব সঞ্চিত কয়লা উত্তোলনের মতো কঠিন ও যুগান্তকারী নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সময়ের দাবি।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/16646 ,   Print Date & Time: Saturday, 5 September 2026, 07:25:32 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh