
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
দেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগের স্থবিরতা ও ব্যবসা-বাণিজ্যে কাঙ্ক্ষিত গতি না ফেরায় অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। নতুন বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে দ্রুত চাঙা করা না গেলে দেশের বেকারত্ব সংকট নিরসন করা কঠিন হবে বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশের শ্রমবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি ও কর্মসংস্থানের সংকট নিয়ে নিজের মতামত তুলে ধরেন এই অর্থনীতিবিদ।
ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২১ থেকে ২২ লাখ নতুন মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু সেই অনুপাতে দেশে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। বরং শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়া এবং ব্যবসায়িক মন্দার কারণে অনেকে বিদ্যমান চাকরিও হারাচ্ছেন।
সরকারি তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি জানান, গত তিন বছরে দেশে প্রায় ৪০০টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্য দিয়ে দেশের শ্রমবাজার কতটা সংকুচিত হয়ে পড়েছে, তার একটি ধারণা পাওয়া যায়।
তবে একই সময়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের বিদেশে কর্মসংস্থানের কারণে অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারে কিছুটা স্বস্তি বজায় রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে গড়ে প্রায় ১০ লাখ মানুষ বিদেশে যাওয়ায় দেশের অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থানের ওপর চাপ কিছুটা কমেছে।
বিনিয়োগ বাড়াতে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জরুরি
শ্রমবাজারের সংকট মোকাবিলায় প্রথমেই সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ড. মোস্তাফিজুর রহমান।
তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি অব্যাহত থাকলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপরও চাপ তৈরি হয়। ফলে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান তৈরির গতি বাধাগ্রস্ত হয়।
একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে জরুরি সংস্কারের মাধ্যমে সুদের হার কমিয়ে আনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। সুদের হার কমলে বেসরকারি উদ্যোক্তারা তুলনামূলক সহজ শর্তে ঋণ নিয়ে নতুন বিনিয়োগ করতে পারবেন। এতে শিল্প ও ব্যবসা সম্প্রসারণের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়তে পারে।
ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমানোর ওপরও জোর দেন এই অর্থনীতিবিদ। তাঁর মতে, ব্যবসার ব্যয় কমানো গেলে উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে আগ্রহ বাড়বে এবং বেসরকারি খাতের কার্যক্রমে গতি ফিরতে পারে।
সরকারি চাকরিতে নিয়োগের আগে রাজস্ব বাড়ানোর পরামর্শ
দেশের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক শূন্যপদ থাকলেও রাজস্ব আয় না বাড়িয়ে হঠাৎ বড় আকারে নিয়োগ দেওয়া হলে অর্থনীতিতে ঋণের চাপ তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ড. মোস্তাফিজুর রহমান।
তাঁর মতে, সরকারি চাকরিতে নতুন নিয়োগের প্রয়োজন থাকলেও এর আগে সরকারের রাজস্ব আহরণ সক্ষমতা বাড়াতে হবে। রাজস্ব আয় শক্তিশালী না হলে অতিরিক্ত সরকারি ব্যয় সামাল দিতে গিয়ে ঋণের বোঝা বাড়তে পারে, যা সামষ্টিক অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করবে।
তরুণদের কর্মসংস্থানে বিদেশি বিনিয়োগের গুরুত্ব
শিক্ষিত তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন সিপিডির এই ফেলো।
তিনি মনে করেন, দেশে নতুন শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হলে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের জন্য বিভিন্ন ধরনের দক্ষতাভিত্তিক চাকরির সুযোগ তৈরি হবে। এ জন্য বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করার পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য কার্যকর সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
দক্ষ জনশক্তি পাঠাতে কূটনৈতিক উদ্যোগ বাড়ানোর আহ্বান
দেশের অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারকেও কর্মসংস্থানের বড় ক্ষেত্র হিসেবে দেখছেন ড. মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি দক্ষ জনশক্তি বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে আরও আগ্রাসী ও কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তাঁর মতে, প্রশিক্ষিত ও দক্ষ কর্মীদের বিদেশে পাঠানো গেলে একদিকে দেশের বেকারত্বের চাপ কমবে, অন্যদিকে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ার মাধ্যমে অর্থনীতিও উপকৃত হবে।
সামগ্রিকভাবে শ্রমবাজারের বর্তমান সংকট মোকাবিলায় নতুন বিনিয়োগ, বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণ, ব্যাংকিং খাতে সংস্কার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং দক্ষ জনশক্তির আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থান—এই বিষয়গুলোকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন এই অর্থনীতিবিদ।