
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা করা বড় দেশীয় ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ জোরদার করছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। কমিশনের চেয়ারম্যান মাসুদ খান জানিয়েছেন, প্রথমে এসব প্রতিষ্ঠানকে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে পুঁজিবাজারে আসতে উৎসাহিত করা হবে। তবে তারা এতে আগ্রহী না হলে জনস্বার্থে আইনগত ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগও রয়েছে।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) নারায়ণগঞ্জের সুবর্ণগ্রামে ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্ট ফোরামের (সিএমজেএফ) সদস্যদের জন্য আয়োজিত ‘ক্যাপিটাল মার্কেট প্রোডাক্ট অ্যান্ড রুলস’ শীর্ষক দুই দিনব্যাপী কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। বিএসইসি আয়োজিত কর্মশালাটি ৪ ও ৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
মাসুদ খান বলেন, বাংলাদেশে অনেক বড় দেশীয় ও বহুজাতিক কোম্পানি রয়েছে। এসব ভালো ও শক্তিশালী কোম্পানিকে দ্রুত পুঁজিবাজারে আনা না গেলে দেশের পুঁজিবাজারের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে কয়েকটি বড় ও ফ্ল্যাগশিপ কোম্পানিকে বাজারে আনার চেষ্টা করবে বিএসইসি।
বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর উদ্দেশে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলো স্বতঃপ্রণোদিতভাবে পুঁজিবাজারে এলে সেটিই সবচেয়ে ভালো। তবে তারা তা না করলে জনস্বার্থে সিকিউরিটিজ আইনের ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ কমিশনের রয়েছে।
তিনি জানান, জনস্বার্থে নির্দিষ্ট কোনো কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার নির্দেশ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে ‘পাবলিক ইন্টারেস্ট কোম্পানি (পিআইসি)’-এর সংজ্ঞা আইনের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।
তালিকাভুক্ত হলে বাড়বে কোম্পানির মূল্য
বড় কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আসার আহ্বান জানিয়ে মাসুদ খান বলেন, কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হলে তার করপোরেট ইমেজ শক্তিশালী হয় এবং প্রতিষ্ঠানের একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য বাজারমূল্য নির্ধারিত হয়।
এই বাজারমূল্যকে কাজে লাগিয়ে কোম্পানি ভবিষ্যতে অন্য প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ বা একীভূত করার মতো কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। পাশাপাশি কোনো অংশীদার ব্যবসা থেকে বের হয়ে যেতে চাইলে শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে তুলনামূলক সহজে নিজের বিনিয়োগ প্রত্যাহার করার সুযোগ পান।
পারিবারিক ব্যবসার উত্তরাধিকার প্রসঙ্গেও তিনি বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রজন্ম পরিবর্তনের সময় মালিকদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। এতে ব্যবসা খণ্ড-বিখণ্ড হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তবে কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলে যেসব অংশীদার ব্যবসায় থাকতে চান না, তারা শেয়ার বিক্রি করে সহজে বের হয়ে যেতে পারেন।
সরাসরি তালিকাভুক্তি ও হাইব্রিড পদ্ধতি
বড় ও ভালো কোম্পানিগুলোকে দ্রুত পুঁজিবাজারে আনতে সরাসরি তালিকাভুক্তি এবং হাইব্রিড পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন বিএসইসি চেয়ারম্যান।
তিনি বলেন, প্রচলিত আইপিও প্রক্রিয়ায় একটি কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আসতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। তাই ভালো কোম্পানিগুলোর জন্য সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া হাইব্রিড পদ্ধতিতে একটি কোম্পানি একই সঙ্গে নতুন মূলধন সংগ্রহ এবং বিদ্যমান শেয়ার সরাসরি তালিকাভুক্ত করার সুযোগ পাবে। এর মাধ্যমে কোম্পানিগুলো দ্রুত পুঁজিবাজারে প্রবেশ করতে পারবে বলে আশা করছে বিএসইসি।
আইপিও যাচাইয়ে ‘এক্সটেন্ডেড অডিট’
আইপিও প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও দ্রুত করতে ‘এক্সটেন্ডেড অডিট’ চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান মাসুদ খান।
তিনি বলেন, একটি কোম্পানির কেবল কাগজে-কলমে থাকা আর্থিক বিবরণী যাচাই করলেই হবে না। প্রতিষ্ঠানের জমি, যন্ত্রপাতি, মজুতপণ্য, পাওনা ও দেনাসহ বিভিন্ন সম্পদ ও আর্থিক তথ্য বাস্তবে সঠিক কি না, সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন।
এ জন্য আইপিও আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও আর্থিক তথ্যের বাস্তবতা যাচাই করে অডিটরদের প্রত্যয়ন দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। এতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) আইপিও যাচাইয়ের প্রক্রিয়াও আরও দ্রুত ও কার্যকর হবে বলে মনে করেন তিনি।
প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা
বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখনো মূলত খুচরা বিনিয়োগকারীদের ওপর নির্ভরশীল বলে উল্লেখ করেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। তাঁর মতে, একটি স্থিতিশীল ও টেকসই পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো জরুরি।
এ জন্য প্রভিডেন্ট ফান্ডসহ বিভিন্ন তহবিলের অর্থ শেয়ারবাজারের পাশাপাশি করপোরেট বন্ডে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
মাসুদ খান বলেন, উন্নত দেশগুলোর পুঁজিবাজারে পেনশন ফান্ড ও বিমা কোম্পানিগুলো বড় বিনিয়োগকারী হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশেও এসব প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীকে আরও বেশি করে পুঁজিবাজারে যুক্ত করার ব্যবস্থা নিতে হবে।
ফ্লোর প্রাইস তুলে দেওয়ার প্রভাব
দায়িত্ব নেওয়ার পর পুঁজিবাজার থেকে ফ্লোর প্রাইস তুলে দেওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। তাঁর দাবি, ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের ফলে আন্তর্জাতিক সূচক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এমএসসিআই বাংলাদেশের বাজার নিয়ে বিশেষ ব্যবস্থা প্রত্যাহারের পথে এগিয়েছে।
তিনি জানান, নভেম্বর ২০২৬ থেকে বাংলাদেশের সূচকের নিয়মিত পর্যালোচনা এবং করপোরেট ইভেন্ট বাস্তবায়ন আবার শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
একই সঙ্গে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে আরও ক্ষমতায়ন, পুঁজিবাজারের তদারকি ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) সার্ভেইল্যান্স ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
করপোরেট বন্ড বাজারেও গুরুত্ব
দেশের করপোরেট বন্ড বাজারকে আরও শক্তিশালী করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান।
তিনি বলেন, মূল বোর্ডে তালিকাভুক্তির ফি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মূল বোর্ডে তালিকাভুক্ত হতে উৎসাহিত হবে এবং দেশের করপোরেট বন্ড বাজারও ধীরে ধীরে বড় হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
বিএসইসির এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বড় দেশীয় ও বহুজাতিক কোম্পানির পুঁজিবাজারে অংশগ্রহণ বাড়ার পাশাপাশি বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগও শক্তিশালী হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।