• হোম > অর্থনীতি | মতামত > খেলাপি ঋণের বোঝা কতটা টানতে পারবে অর্থনীতি

খেলাপি ঋণের বোঝা কতটা টানতে পারবে অর্থনীতি

  • শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১৬
  • ২১

---

আহমেদ তোফায়েল

একটি ব্যাংকের সমস্যা কখনোই শুধু একটি ব্যাংকের সমস্যা হয়ে থাকে না। ব্যাংকিং ব্যবস্থা মূলত মানুষের সঞ্চয়, ব্যবসার পুঁজি এবং অর্থনীতির ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি করে। সেই সেতুতে বড় ফাটল ধরলে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে অনেক দূর। বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের বর্তমান পরিস্থিতি তাই কেবল ব্যাংকার, আমানতকারী বা ঋণগ্রহীতার বিষয় নয়। এটি এখন সামগ্রিক অর্থনীতির বড় উদ্বেগের কারণ।

দেশের ব্যাংক খাতে তিন ভাগের এক ভাগ ঋণ খেলাপি হয়ে পড়েছে। এর পরিমাণ ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রকৃত অর্থে সমস্যাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ এর চেয়েও অনেক বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর শেষে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা। মোট ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান অর্থনীতির ভেতরের গভীর দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।

দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ কী :

ধরা যাক, একটি ব্যাংক ১০০ টাকা ঋণ দিয়েছে।

এর মধ্যে—

• ৫০ টাকা সরাসরি খেলাপি, 

• ২০ টাকা পুনঃতপশিল করা হলেও আদায় হচ্ছে না, 

• ১০ টাকা আগে অবলোপন করা হয়েছে। 

তাহলে ব্যাংকের দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ = ৮০ টাকা।

অর্থাৎ, দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ হলো ব্যাংকের এমন সব ঋণের সমষ্টি, যেগুলোর অর্থ ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

এখানে খেলাপি ঋণের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এর অর্থনৈতিক ক্ষতি ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে। একজন ঋণগ্রহীতা ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে তা ফেরত না দিলে ব্যাংকের অর্থপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। ব্যাংক নতুন করে ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা হারায়। একসময় তারল্যের ওপর চাপ তৈরি হয়। প্রয়োজনীয় অর্থ সংস্থান করতে ব্যাংককে আমানতের সুদ বাড়াতে হতে পারে। ঋণের সুদও বাড়ে। এর প্রভাব পড়ে ব্যবসার খরচে।

ব্যবসার খরচ বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। আমদানি ব্যয় বাড়ে। ঋণের খরচ বাড়ে। শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামও বাড়তে পারে। অর্থাৎ ব্যাংকের একটি দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনার খেসারত অনেক সময় সাধারণ ভোক্তাকেই দিতে হয়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় বৈদেশিক বাণিজ্যের আরেকটি চাপ। কোনো ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তার বিশ্বাসযোগ্যতা কমতে পারে। ফলে আমদানির ঋণপত্র বা এলসি খোলার ক্ষেত্রে বাড়তি খরচ তৈরি হতে পারে। ব্যবসায়ীদের জন্য এটি নতুন বোঝা। আর ব্যবসায়ীরা সেই ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের সঙ্গে সমন্বয় করার চেষ্টা করেন।

কমছে ঋণ, কমছে বিনিয়োগের গতি

বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক এখন বিশেষভাবে নজর দাবি করে। গত জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে। এটি ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ের একটি। সুদের প্রভাব বাদ দিলে প্রকৃত ঋণ প্রবৃদ্ধি এখন ঋণাত্মক। এখানে দুটি বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে।

একদিকে ব্যাংকের বিপুল অর্থ আটকে আছে খেলাপি ঋণে। অন্যদিকে নতুন করে ভালো ব্যবসা ও বিনিয়োগে অর্থ যাচ্ছে না। অর্থনীতির জন্য এই পরিস্থিতি মোটেই স্বস্তিদায়ক নয়।

ব্যাংকারদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভালো ব্যবসায়ীদের মধ্যেও ঋণ নেওয়ার আগ্রহ কমেছে। উচ্চ সুদ, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতার কারণে অনেক উদ্যোক্তা নতুন বিনিয়োগে সতর্ক হচ্ছেন। আবার অতীতে রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের ভিত্তিতে ঋণ বিতরণের যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, তার কারণেও ব্যাংকগুলো এখন অনেক ক্ষেত্রে নতুন ঋণ দিতে বেশি সতর্ক।

ফলে অর্থনীতিতে এক ধরনের আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। উদ্যোক্তা ব্যাংককে পুরোপুরি বিশ্বাস করছেন না। ব্যাংকও উদ্যোক্তাকে যথেষ্ট বিশ্বাস করতে পারছে না। এই পারস্পরিক অনাস্থা বিনিয়োগের জন্য ভালো নয়।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি আস্থায়

ব্যাংকিং ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ অর্থ নয়, আস্থা। মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখেন এই বিশ্বাসে যে প্রয়োজনের সময় তা ফেরত পাবেন। উদ্যোক্তা ব্যাংক থেকে ঋণ নেন এই প্রত্যাশায় যে অর্থনীতির নিয়ম মেনে তিনি ব্যবসা করতে পারবেন। এই আস্থায় আঘাত লাগলে সমস্যা আরও গভীর হয়।

অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের বক্তব্যটি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, খেলাপি ঋণের প্রভাব এক জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে না। ব্যাংকের অর্থপ্রবাহে সমস্যা তৈরি হলে আমানতকারীদের ওপরও চাপ পড়ে। আর নিয়ন্ত্রক, প্রতিষ্ঠান ও আইনকানুনের ওপর মানুষের আস্থা কমে গেলে ব্যাংকে অর্থ রাখার আগ্রহও কমতে পারে।

তখন মানুষ ব্যাংকের পরিবর্তে জমি, সোনা বা অন্য সম্পদে অর্থ রাখার কথা ভাবতে পারেন। এতে আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে অর্থের প্রবাহ বাড়তে পারে। অর্থনীতিতে আনুষ্ঠানিক আর্থিক অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যও বাধাগ্রস্ত হবে।

বিশেষ সুবিধা কি সমাধান হতে পারে?

খেলাপি ঋণ কমাতে বছরের পর বছর ঋণ পুনঃতপশিল, পুনর্গঠনসহ নানা সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য ছিল সাময়িক সমস্যায় থাকা ব্যবসায়ীকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দেওয়া। নীতিগতভাবে এ ধরনের সুবিধার প্রয়োজন আছে। কারণ সব খেলাপি ঋণ একই ধরনের নয়।

কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ ফেরত দেন না। আবার কেউ ব্যবসায়িক মন্দা, বাজারের পরিবর্তন, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা অন্য বাস্তব সমস্যার কারণে ঋণ পরিশোধ করতে পারেন না। দুজনকে একইভাবে দেখা হলে ন্যায়সংগত ফল পাওয়া কঠিন।

কিন্তু বিশেষ সুবিধা যদি নিয়মিত ঋণ পরিশোধের বিকল্প হয়ে যায়, তাহলে সমস্যা আরও বাড়বে। ঋণখেলাপির সংস্কৃতি উৎসাহিত হবে। সৎ ঋণগ্রহীতাও একসময় মনে করতে পারেন, সময়মতো টাকা ফেরত দেওয়ার চেয়ে সুবিধা পাওয়ার অপেক্ষায় থাকাই ভালো। সুতরাং পুনঃতপশিলের সুযোগ থাকতে পারে। তবে সেটি হতে হবে কঠোর যাচাই, বাস্তব ব্যবসায়িক সক্ষমতা এবং নির্দিষ্ট শর্তের ভিত্তিতে।

এখন দরকার কঠিন কিন্তু বাস্তবসম্মত সংস্কার

খেলাপি ঋণের সমস্যা রাতারাতি সমাধান হবে না। কিন্তু দীর্ঘদিন সমস্যাটিকে টেনে নেওয়ার সুযোগও নেই। প্রথম কাজ হওয়া উচিত প্রকৃত খেলাপি ঋণের স্বচ্ছ হিসাব করা। লুকানো বা পুনঃতপশিল করা সমস্যাগ্রস্ত ঋণকে বাস্তব চিত্রের বাইরে রাখলে নীতিনির্ধারণ ভুল হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি এবং ব্যবসায়িক কারণে সমস্যায় পড়া ঋণগ্রহীতার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করতে হবে। প্রকৃত সক্ষমতা থাকলেও যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ করেন না, তাঁদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, ব্যাংকের পরিচালনা ও ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ায় পেশাদারিত্ব বাড়াতে হবে। ঋণ দেওয়ার সময় রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত প্রভাব বা সম্পর্ক নয়; ব্যবসার সক্ষমতা, নগদ প্রবাহ এবং ঋণ ফেরতের সামর্থ্যই প্রধান বিবেচনা হওয়া উচিত।

সবশেষে, ব্যাংকিং খাতে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। ঋণগ্রহীতা যেমন দায়ী, ঋণ অনুমোদনকারী এবং তদারকির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদেরও দায়ের আওতায় আনতে হবে। কারণ ভুল ঋণ শুধু একজন গ্রাহকের ব্যর্থতা নয়; অনেক সময় এটি পুরো ব্যবস্থার ব্যর্থতার ফল।

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানো জরুরি। এই সময়ে ব্যাংকের বিপুল অর্থ যদি অনাদায়ী ঋণে আটকে থাকে, তাহলে অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হওয়াই স্বাভাবিক।

খেলাপি ঋণ তাই কেবল ব্যাংকের ব্যালান্সশিটের একটি সংখ্যা নয়। এটি বিনিয়োগের গতি, ব্যবসার খরচ, আমানতকারীর নিরাপত্তা এবং অর্থনীতির প্রতি মানুষের আস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এই সমস্যার সমাধানে দ্রুততা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন স্বচ্ছতা ও কঠোরতা।

ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আস্থা ফিরিয়ে আনা গেলে আটকে থাকা অর্থের একটি অংশ আবার উৎপাদনশীল খাতে ফিরতে পারে। উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী হতে পারেন। অর্থনীতিও পেতে পারে নতুন গতি।

সুতরাং এখন প্রশ্ন শুধু খেলাপি ঋণ কত কমানো যাবে, তা নয়। প্রশ্ন হলো—কীভাবে এমন একটি ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, যেখানে ঋণ হবে উৎপাদন ও বিনিয়োগের হাতিয়ার, সুবিধাভোগী হওয়ার পথ নয়। সেই সংস্কার যত দ্রুত শুরু হবে, অর্থনীতির জন্য ততই ভালো।

লেখক: বিজনেস এডিটর, দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ

সাবেক কর্মস্থল: দৈনিক যায়যায়দিন, বর্তমান, দেশ রূপান্তর ও ইত্তেফাক।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/16612 ,   Print Date & Time: Saturday, 5 September 2026, 05:29:40 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh