
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর জ্বর কমে গেলেই বিপদ কেটে গেছে—এমনটা ভাবার সুযোগ নেই। বরং জ্বর কমে যাওয়ার পরবর্তী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা রোগীর জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময় হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন চট্টগ্রামের চিকিৎসকেরা। এ সময়ে রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি, শক ও রক্তক্ষরণসহ গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর গতকাল পর্যন্ত জেলায় ২ হাজার ২৪১ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। এ সময়ে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ছয়জন। সংক্রমণ বাড়তে থাকায় চিকিৎসকদের পাশাপাশি স্বাস্থ্য কর্মকর্তারাও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (চমেক) সূত্রে জানা গেছে, গতকাল পর্যন্ত হাসপাতালে ৭৮ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিলেন। চিকিৎসকদের হিসাবে, তাঁদের মধ্যে প্রায় ১০ থেকে ১৫ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। অনেক রোগী শক ও রক্তক্ষরণের মতো গুরুতর উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসছেন।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. অনিরুদ্ধ ঘোষ জয় বলেন, কোন ডেঙ্গু রোগীর শারীরিক অবস্থার কখন দ্রুত অবনতি হবে, তা আগে থেকে নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। তাই রোগীকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জ্বর কমলেই বিপদ কাটে না
ডেঙ্গুর সাধারণত তিনটি ধাপ রয়েছে—ফেব্রাইল বা জ্বরের ধাপ, ক্রিটিক্যাল বা সংকটাপন্ন ধাপ এবং রিকভারি বা সুস্থতার ধাপ। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে জ্বর কমে যাওয়ার পরই ক্রিটিক্যাল ফেজ শুরু হতে পারে। সাধারণত এই সময়টি ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা স্থায়ী হয়।
এই পর্যায়ে রক্তনালি থেকে তরল বেরিয়ে যাওয়ার কারণে রক্তচাপ কমে যেতে পারে। গুরুতর অবস্থায় রোগীর শক, রক্তক্ষরণ ও শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে লিভার, কিডনি কিংবা হৃদ্যন্ত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গেও জটিলতা তৈরি হতে পারে।
ডা. অনিরুদ্ধ ঘোষ জয় বলেন, জ্বর, শরীর ব্যথা কিংবা বমির মতো উপসর্গ কমে গেলেই রোগী সুস্থ হয়ে গেছেন—এমন ধারণা ঠিক নয়। জ্বর কমে যাওয়ার পরের সময়টিই অনেক ক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই রোগীকে অন্তত কয়েক দিন পর্যবেক্ষণে রাখা জরুরি।
চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, ডেঙ্গু রোগীর প্রচণ্ড পেটব্যথা, একটানা বমি, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্তপাত, বমি কিংবা মলের সঙ্গে রক্ত, দ্রুত শ্বাস নেওয়া, অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা অস্থিরতা, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া কিংবা রক্তচাপ কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
জ্বরের শেষের দিকে অনেক রোগীর প্লাটিলেটের মাত্রাও কমতে পারে। তবে শুধু প্লাটিলেটের সংখ্যা দেখেই রোগীর ঝুঁকি নির্ধারণ করা উচিত নয়। রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা, হেমাটোক্রিট, প্রস্রাবের পরিমাণ এবং অন্যান্য সতর্ক সংকেতও বিবেচনায় নিতে হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্টের জাতীয় নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্লাটিলেট কমে যাওয়ার পাশাপাশি প্লাজমা লিকেজ ও অন্যান্য ক্লিনিক্যাল লক্ষণ দেখা দিলে রোগীর সংকটাপন্ন অবস্থার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
সাধারণ উপসর্গেও থাকতে পারে ডেঙ্গু
চট্টগ্রামে এমন কিছু রোগীও পাওয়া যাচ্ছে, যাঁদের ক্ষেত্রে তীব্র জ্বর বা ডেঙ্গুর প্রচলিত সব উপসর্গ দেখা যাচ্ছে না। কারও মৃদু জ্বর, শরীর ব্যথা কিংবা দুর্বলতা রয়েছে; আবার কারও বমি, পেটব্যথা বা খাবারে অরুচিই প্রধান উপসর্গ।
চিকিৎসকেরা বলছেন, এসব উপসর্গকে অনেকে সাধারণ জ্বর, গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা বা শারীরিক দুর্বলতা মনে করেন। ফলে ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে দেরি হয় এবং অনেক সময় জটিলতা বেড়ে যাওয়ার পর হাসপাতালে আসেন রোগীরা।
বাড়ছে শক ও রক্তক্ষরণ
চমেক হাসপাতালের চিকিৎসকদের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে জটিল অবস্থায় রোগীদের হাসপাতালে আসার প্রবণতা।
হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের ডেঙ্গু ওয়ার্ডের ফোকাল পারসন ডা. নূর মোহাম্মদ জানান, অনেক রোগী শক সিন্ড্রোম ও রক্তক্ষরণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। কারও কারও রক্তচাপ এতটাই কমে যাচ্ছে যে স্বাভাবিকভাবে তা পরিমাপ করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
চমেক হাসপাতালের বিশেষায়িত ডেঙ্গু ওয়ার্ডে নির্ধারিত শয্যা রয়েছে ৪০টি। কিন্তু গতকাল পর্যন্ত সেখানে ৭৮ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকলে অতিরিক্ত শয্যা, নার্সিং সাপোর্ট ও চিকিৎসা সরঞ্জামের প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আগস্টে আক্রান্ত ১,২০২ জন
চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর সংক্রমণ জুলাই থেকে দ্রুত বাড়তে শুরু করে। বছরের প্রথম ছয় মাসে জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২৯৮ জন। জুলাইয়ে এই সংখ্যা বেড়ে ৫৩৬ জনে দাঁড়ায়। আগস্টে এক মাসেই আক্রান্ত হন ১ হাজার ২০২ জন।
অর্থাৎ জুলাই ও আগস্ট—এই দুই মাসে মোট ১ হাজার ৭৩৮ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন, যা বছরের প্রথম ছয় মাসের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ বেশি।
সেপ্টেম্বরের প্রথম তিন দিনেই আরও ২০৫ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫৫ জন।
চলতি বছর ডেঙ্গুতে জেলায় ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে একজন, জুলাইয়ে দুজন, আগস্টে দুজন এবং সেপ্টেম্বরে একজন মারা গেছেন।
সীতাকুণ্ডে রোগী বেশি
চট্টগ্রাম শহরের পাশাপাশি বিভিন্ন উপজেলাতেও ডেঙ্গুর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। উপজেলাগুলোর মধ্যে সীতাকুণ্ডে সবচেয়ে বেশি ২৭৯ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। অন্যদিকে সন্দ্বীপে আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে কম—১২ জন।
চট্টগ্রামের জেলা সিভিল সার্জন মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান জানান, সীতাকুণ্ডসহ যেসব এলাকায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেশি, সেসব এলাকায় বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসচেতনতামূলক কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে।
এডিসের প্রজননস্থল ধ্বংসে গুরুত্ব
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা এডিস মশার প্রজননের জন্য অনুকূল থাকলে সেপ্টেম্বরেও ডেঙ্গু সংক্রমণ বাড়তে পারে।
তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে বাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বাড়ির আঙিনা, ছাদ, ফুলের টব, বিভিন্ন পাত্র, পুরোনো টায়ার কিংবা পরিত্যক্ত সামগ্রীতে পানি জমতে দেওয়া যাবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু মশা নিধন নয়, এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল ধ্বংস করাই সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপগুলোর একটি। একই সঙ্গে ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে জ্বর কমে যাওয়ার পরও রোগীকে সতর্ক পর্যবেক্ষণে রাখা এবং বিপজ্জনক কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া জরুরি।