• হোম > জাতীয় | সারাদেশ > শিল্পে বাড়ছে সৌরবিদ্যুৎ, কমছে বিদ্যুৎ খরচ

শিল্পে বাড়ছে সৌরবিদ্যুৎ, কমছে বিদ্যুৎ খরচ

  • শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:২৩
  • ৯

---

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

দেশের শিল্পকারখানায় সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির বাড়তি খরচ, জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ এবং উৎপাদন ব্যয় কমানোর প্রয়োজন থেকেই বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো এখন কারখানার ছাদে সোলার রুফটপ স্থাপনে গুরুত্ব দিচ্ছে। এতে একদিকে যেমন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ ব্যয় কমছে, অন্যদিকে জাতীয় গ্রিডের ওপরও কিছুটা চাপ কমছে।

ইস্ট কোস্ট গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ওমেরা সোলার ইতোমধ্যে দেশের ১০০টির বেশি শিল্পকারখানার ছাদে মোট ১৩০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা করেছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী ছয় মাসের মধ্যে এই সক্ষমতা ১৮০ মেগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।

শিল্পকারখানায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের আর্থিক সুবিধার একটি উদাহরণ পাওয়া যায় ইস্ট কোস্ট গ্রুপের হিসাবেই। জাতীয় গ্রিড থেকে নেওয়া বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটে যেখানে খরচ হচ্ছে ১১ টাকা ৫৬ পয়সা, সেখানে সৌরবিদ্যুতে একই পরিমাণ বিদ্যুতের খরচ মাত্র ৫ টাকা।

এই হিসাবে দিনে গ্রিডের বিদ্যুৎ ব্যবহারে প্রতিষ্ঠানটির ব্যয় হয় প্রায় ৪৪ লাখ ৪১ হাজার ৬০৮ টাকা। বিপরীতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে সেই খরচ নেমে আসে প্রায় ১৯ লাখ ২১ হাজার ১১১ টাকায়। অর্থাৎ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের মাধ্যমে দিনে প্রায় ২৫ লাখ ২০ হাজার ৪৯৭ টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। মাসের হিসাবে এই সাশ্রয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৭ কোটি ৫৬ লাখ ১৪ হাজার ৯৩৩ টাকা।

কমছে উৎপাদন ব্যয়, চাপ কমছে গ্রিডে

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার শুধু শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ বিল কমাচ্ছে না, একই সঙ্গে জাতীয় গ্রিডের ওপর নির্ভরশীলতাও কমিয়ে আনছে। বিশেষ করে দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের সময়ে নিজস্ব উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ শিল্পকারখানার জন্য বিকল্প শক্তির উৎস হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর অনেকেই এখন নিজেদের বিদ্যুৎ চাহিদার একটি অংশ সোলার রুফটপ থেকে পূরণ করছে। পুরো চাহিদা সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে মেটানো সম্ভব না হলেও দিনের কয়েক ঘণ্টা সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম চালানো যাচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ সংকটের সময়ও উৎপাদন সচল রাখার সুযোগ তৈরি হচ্ছে এবং সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয় কমছে।

নেট মিটারিং ব্যবস্থা চালুর পর ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার আরও দ্রুত বেড়েছে। এর মাধ্যমে কোনো কারখানায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদিত হলে তা জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যায়। পরে সেই বিদ্যুতের বিপরীতে বিল সমন্বয়ের সুবিধাও পাওয়া যায়।

শিল্পে ৬৬৭ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ

গত দুই থেকে তিন বছরে দেশের শিল্পকারখানাগুলো বড় পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে এগিয়েছে। বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ইতোমধ্যে ৬০০ মেগাওয়াটের বেশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতার ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) গত ৪ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ২৩৯টি বড় শিল্পকারখানার ছাদে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার মোট সক্ষমতা ৬৬৭ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, এই প্রবৃদ্ধি শুধু বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কারণে নয়; আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের চাহিদাও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থার প্রতি বাড়তি গুরুত্বের কারণে বাংলাদেশের কারখানাগুলোও গ্রিন এনার্জির দিকে ঝুঁকছে।

প্রাণ-আরএফএল ও রাইজিং গ্রুপের উদ্যোগ

দেশের অন্যতম বড় শিল্পগোষ্ঠী প্রাণ-আরএফএল বর্তমানে দেশের ২০টি কারখানা থেকে প্রায় ৩৮ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। প্রতিষ্ঠানটি এ বছরের শেষ নাগাদ এই সক্ষমতা ৮০ মেগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনা করছে। আগামী দুই বছরে ১২০ মেগাওয়াট এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ২০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।

রাইজিং গ্রুপের চারটি গার্মেন্ট ও টেক্সটাইল কারখানায় বর্তমানে মোট ১৪ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এসব কারখানার প্রায় ৮০ শতাংশ ছাদে সোলার রুফটপ স্থাপন করা হয়েছে। বাকি ২০ শতাংশ এলাকাতেও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা বলছেন, আগে সৌরবিদ্যুৎকে মূলত পরিবেশগত কমপ্লায়েন্সের অংশ হিসেবে দেখা হলেও এখন এটি ব্যবসায়িকভাবে লাভজনক বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারখানার মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বিনিয়োগ উঠে আসছে কয়েক বছরের মধ্যেই

ওমেরা সোলারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুদুর রহমানের মতে, বর্তমানে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। ফলে কোনো কারখানা সোলার রুফটপে বিনিয়োগ করলে সাধারণত চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সেই বিনিয়োগ উঠে আসতে পারে।

তিনি আরও জানান, ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ ব্যবস্থা যুক্ত করা হলে পিক আওয়ারে বিদ্যুৎ সংকট ও লোডশেডিংয়ের কারণে শিল্পকারখানার ভোগান্তি আরও কমানো সম্ভব হবে।

অন্যদিকে, সুপারস্টার রিনিউয়েবল এনার্জি গত পাঁচ থেকে সাত বছরে প্রায় ১৫০টি কারখানায় ১০০ থেকে ১৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সোলার রুফটপ স্থাপন করেছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের মতে, শিল্পকারখানায় ডিজেল জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের তুলনায় রুফটপ সোলারের খরচ অনেক কম।

পাশাপাশি পোশাকশিল্পে গ্রিন এনার্জি ব্যবহারের আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্সের বিষয়টিও সৌরবিদ্যুতের চাহিদা বাড়াচ্ছে। শিল্পকারখানাগুলো এ খাতে বিনিয়োগের জন্য ব্যাংকঋণও পাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে ৭ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়ার সুযোগ থাকায় সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ আরও বাড়ছে।

বাড়ছে শিল্পে সবুজ জ্বালানির গুরুত্ব

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাংলাদেশের শিল্প খাতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার আগামী দিনে আরও দ্রুত বাড়বে। বিদ্যুতের দাম, জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা—সবকিছু মিলিয়ে সোলার রুফটপ এখন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য শুধু বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় সাশ্রয় ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ধরে রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হয়ে উঠছে।

একই সঙ্গে শিল্পকারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লে দিনের বেলায় জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানো সম্ভব হবে। ফলে শিল্প খাতের নিজস্ব বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/16544 ,   Print Date & Time: Friday, 4 September 2026, 07:46:39 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh