• হোম > অর্থনীতি | জাতীয় | দেশজুড়ে > মেট্রোরেলের চড়া ব্যয় বৃদ্ধির পর এবার জাপানি ঋণের সুদও বাড়ছে

মেট্রোরেলের চড়া ব্যয় বৃদ্ধির পর এবার জাপানি ঋণের সুদও বাড়ছে

  • বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪৭
  • ৪

---

ইবি রিপোর্ট 

ঢাকার মেট্রোরেল লাইন-১ এবং লাইন-৫ নর্দান প্রকল্পের সংশোধিত প্রস্তাবনায় দেখা গেছে, বাংলাদেশ কেবল প্রকল্পগুলোর ব্যাপক ব্যয় বৃদ্ধির বড় ধরনের ধাক্কাই খাচ্ছে না, এর পাশাপাশি এসব প্রকল্পে নেওয়া জাপানি ঋণের ওপরও উল্লেখযোগ্য হারে বেশি সুদ গুনতে হবে।

বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, মেগা প্রকল্প দুটিতে জাইকার (জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা) অর্থায়নের সুদের হার তাদের মূল নমনীয় বা রেয়াতি হারের ০.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩.৫ শতাংশ বা তারও বেশি হতে পারে।

গত ৩০ আগস্ট পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভার কার্যবিবরণী থেকে জানা যায়, ২০১৯ সালে বাংলাদেশ ০.৬ থেকে ০.৯ শতাংশ সুদে ১৩ হাজার ৬২৫.৭৭ কোটি টাকার একটি প্রাথমিক ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর করলেও—প্রকল্প দুটির অবশিষ্ট ঋণের জন্য কোনো সুদের হার বা শর্ত আগে থেকে নির্দিষ্ট করা হয়নি।

বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত নির্মাণাধীন এমআরটি লাইন-১ এর ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) জানায়, এতে জাপানি অর্থায়ন বা ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াবে ৮৫ হাজার ৫৩৫.৫৫ কোটি টাকা। তবে এই বাড়তি ঋণ বর্তমান বাজারের প্রচলিত সুদেই নিতে হবে। জাইকার ঋণের সুদের হার সম্প্রতি ৩.০৬ শতাংশে পৌঁছেছে। আগামী অক্টোবরে এটি ৩.৫০ শতাংশ ছুঁতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া যেহেতু জাপান প্রতি ছয় মাস অন্তর তার ঋণের সুদহার পর্যালোচনা করে, তাই আগামী বছরের এপ্রিলে এই সুদের হার নতুন করে পুনঃনির্ধারণের সময় তা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত এমআরটি লাইন-৫ নর্দান’ প্রকল্পটিও একই সংকটের মুখোমুখি। অনুমোদিত ২৯,১১৯ কোটি টাকার জাপানি অর্থায়নের মধ্যে মাত্র ১৩,৫০০ কোটি টাকার জন্য কম সুদে (০.৬ শতাংশ) আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। জাপান নীতিগতভাবে আরও ৩৯,৮১৪.১৮ কোটি টাকা অতিরিক্ত অর্থায়নে সম্মত হলেও—ঋণের এই অংশটিতে বাংলাদেশকে আগের চেয়ে অনেক বেশি সুদের বোঝা বইতে হবে।

ইআরডির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা না প্রকাশের শর্তে টিবিএসকে জানান, এমআরটি-১ এবং এমআরটি-৫ নর্দান প্রকল্পে অতিরিক্ত যে ঋণের প্রয়োজন হবে, সে বিষয়ে জাইকার সম্মতি পাওয়া গেছে। তবে ঋণের শর্ত নিয়ে এখনও আলোচনা চলছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এ বিষয়ে নিয়মিত চিঠিপত্র আদান-প্রদান হচ্ছে এবং আলোচনার পরেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে।

তিনি জানান, “তবে সুদের হার কমবে কি না—সে বিষয়ে এখনো কোনো নিশ্চয়তা নেই। সুদের হার কমার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে ফিক্সড, ফ্লোটিং এবং ভেরিয়েবল রেট—এসব নিয়ে টেকনিক্যাল পর্যায়ে আলোচনা হচ্ছে। এতে ফিক্সড সুদ হারের ঋণে ভবিষ্যতে সুদ হার বাড়ানোর কোনো সুযোগ থাকবে না। তবে এ বিষয়ে জাপানের কাছ থেকে সম্মতি আদায় করা কঠিন হতে পারে।”

ইআরডি কর্মকর্তারা জানান, ২০২২ সালেও জাইকার ঋণের সুদের হার ছিল ১ শতাংশের নিচে। ২০২৫ সালে তা বেড়ে প্রায় ২ শতাংশে দাঁড়ায় এবং ২০২৬ সালে তা ৩ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। চলতি বছরের জুনে ৩১৪ মিলিয়ন ডলারের একটি জাপানি ঋণের ওপর সুদের হার দাঁড়ায় ৩.০৫ শতাংশ।

এদিকে জাইকার ঢাকা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি কিস্তি চূড়ান্ত করার সময় বিশ্ববাজারের বর্তমান সুদহার, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ঋণদাতা সংস্থার নীতি এবং প্রকল্পের সার্বিক ঝুঁকি বিবেচনা করে ঋণ প্রদানের শর্তাদি মূল্যায়ন করা হয়। উল্লেখ্য, ২০২২ সালে জাইকার সুদের হার ১ শতাংশের নিচে থাকলেও—২০২৫ সালে তা প্রায় ২ শতাংশে ওঠে এবং চলতি বছরের শুরুতে তা ৩ শতাংশ অতিক্রম করে।

প্রকল্পের ব্যয়ও বেড়েছে বহুগুণ

ঋণের সুদ হারের পাশাপাশি প্রকল্প দুটির নির্মাণ ব্যয়ও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।

বাংলাদেশের প্রথম ভূগর্ভস্থ বা পাতাল মেট্রোরেল প্রকল্প এমআরটি লাইন-১ এর জন্য ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) প্রকল্প ব্যয় ১২৯.৮২ শতাংশ বাড়িয়ে ১ লাখ ২০ হাজার ৭৯৪.১৩ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করেছে। ২০১৯ সালের ১৫ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ৫২ হাজার ৫৬১.৪৩ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে এই প্রকল্পটি অনুমোদন দিয়েছিল।

অন্যদিকে, এমআরটি লাইন-৫ নর্দান প্রকল্পের ব্যয় ১২৫.৯৮ শতাংশ বাড়িয়ে ৪১ হাজার ২৩৮.৫৪ কোটি টাকা থেকে ৯৩ হাজার ১৯০.৯৬ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই প্রকল্পটিও ২০১৯ সালে অনুমোদন পেয়েছিল।

প্রকল্পের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নিয়ে নিয়ে প্রশ্ন

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ৩.০৫ থেকে ৩.৫ শতাংশ সুদের হার আগের রেয়াতি হারের তুলনায় বেশি মনে হলেও—আন্তর্জাতিক দীর্ঘমেয়াদি ঋণের বাজারের তুলনায় এখনো কম। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার প্রায় ৫ শতাংশের বেশি।

তবে বড় প্রশ্নটি থেকে যাচ্ছে প্রকল্পের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নিয়ে। ব্যয় যেহেতু প্রায় দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে, তাই বেনিফিট-কস্ট রেশিও স্বাভাবিকভাবেই কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে—যদি না প্রকল্পের প্রত্যাশিত উপকারিতাও একই অনুপাতে বৃদ্ধি পায়।

এই অর্থনীতিবিদ বলেন, “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি উঠে এসেছে, তা হলো সরকারের অর্থায়ন সক্ষমতা। এই প্রকল্পগুলোর জন্য সরকারকে নিজস্ব তহবিল থেকে বড় অংকের অর্থ জোগান দিতে হবে—যা কয়েক দশ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। কিন্তু বর্তমান রাজস্ব আদায়ের অবস্থা, বিদ্যমান ব্যয় প্রতিশ্রুতি এবং অভ্যন্তরীণ ঋণ গ্রহণের সীমাবদ্ধতার কারণে, এই অতিরিক্ত চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে।”


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/16478 ,   Print Date & Time: Thursday, 3 September 2026, 08:29:00 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh