• হোম > অর্থনীতি > বৈদেশিক খাতে স্বস্তি, অভ্যন্তরীণ সূচক চাপে

বৈদেশিক খাতে স্বস্তি, অভ্যন্তরীণ সূচক চাপে

  • বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৪
  • ৯

---

ইবি রিপোর্ট 

দেশের অর্থনীতির বৈদেশিক খাতে স্বস্তি ফিরেছে। প্রবাসী আয় ও পণ্য রপ্তানি—দুই উৎস থেকেই বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বেড়েছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও ঊর্ধ্বমুখী। চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় মাস অর্থাৎ আগস্ট শেষে এ চিত্র দেখা যাচ্ছে।

অবশ্য বৈদেশিক খাতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোচ্ছে না দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও বাড়ছে না। ফলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা দুর্বল রয়েছে, ব্যবসা-বাণিজ্যেও গতি নেই। তার মধ্যে নতুন করে যুক্ত হয়েছে জ্বালানিসংকট। গত দেড় মাস তীব্র গ্যাস-বিদ্যুৎসংকটে অধিকাংশ শিল্পকারখানার উৎপাদন কমবেশি ব্যাহত হয়েছে। তাতে ব্যবসার খরচ আরেক দফা বেড়েছে।

বৈদেশিক মুদ্রা আসছে, রিজার্ভও বাড়ছে। তবে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে সেই স্বস্তির প্রতিফলন না হওয়ার পেছনে উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে দুষছেন অর্থনীতিবিদেরা। তাঁরা বলছেন, যতক্ষণ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না, ততক্ষণ পণ্যের চাহিদা বাড়বে না। আর পণ্যের চাহিদা না বাড়লে অর্থনীতিতে গতি আসবে না। এ ক্ষেত্রে শিল্পে জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখতে হবে। তবে পণ্য রপ্তানি ও প্রবাসী আয় ইতিবাচক থাকাকে মন্দের ভালো বলে মন্তব্য করেন তাঁরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, কয়েক মাস ধরে প্রবাসী আয়ে ভালো প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস অর্থাৎ জুলাই ও আগস্টে প্রবাসী আয় এসেছে যথাক্রমে ২৮৬ ও ২৯৭ কোটি মার্কিন ডলার। তাতে জুলাইয়ে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ শতাংশে। যদিও টানা ছয় মাস তিন বিলিয়ন ডলারের বেশি প্রবাসী আয় আসার পর গত জুন থেকে ৩ বিলিয়ন ডলারের কম প্রবাসী আয় আসছে।

এদিকে তীব্র জ্বালানিসংকটের মধ্যেও গত মাসে পণ্য রপ্তানি বেড়েছে। বাংলাদেশ থেকে গত মাসে ৪৪৩ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এই আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেশি। গত জুলাইয়ে পণ্য রপ্তানি কমেছিল দশমিক ৯০ শতাংশ। যদিও পাঁচ মাস ধরে এক মাসে রপ্তানি বাড়লে অন্য মাসে কমছে।

প্রবাসী আয় ও রপ্তানি থেকে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়ায় রিজার্ভে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আইএমএফের হিসাব পদ্ধতি অনুযায়ী, গত জুলাইয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩১ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলার। গত ২৭ আগস্ট শেষে রিজার্ভ বেড়ে ৩২ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। গত বছরের ২৭ আগস্ট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ২৬ বিলিয়ন ডলার। তার মানে এক বছরের ব্যবধানে রিজার্ভ বেড়েছে ৬ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার।

প্রবাসী আয়, পণ্য রপ্তানি ও রিজার্ভ—এই তিন অর্থনৈতিক সূচকের গত মাসের চিত্র পাওয়া গেলেও মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান এখনো প্রকাশ করা হয়নি। মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরেই ৯ শতাংশের ঘরে রয়েছে। তবে গত জুলাইয়ে তা সামান্য কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একইভাবে পণ্য আমদানি ও বেসরকারি ঋণপ্রবাহের সর্বশেষ চিত্রও এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

ব্যবসা-বাণিজ্য চাপে

দেড় মাস ধরে দেশের শিল্পকারখানা তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট ভুগছে। বিশেষ করে স্পিনিং, ডাইং, সিরামিকের মতো গ্যাসনির্ভর শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। কোথাও গ্যাসের চাপ কম, কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় কারখানার সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

একাধিক শিল্পমালিক বলছেন, গত মাসে পণ্য রপ্তানি বেড়েছে। এর পেছনের ঘটনা খুবই করুণ। তার কারণ ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত ডিজেলে কারখানা চালিয়ে কারখানার উৎপাদন সচল রাখতে হয়েছে। এতে সময়মতো রপ্তানি হলেও বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে অনেক কারখানামালিককে।

জানতে চাইলে দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক প্রথম আলোকে বলেন, প্রবাসী আয়, পণ্য রপ্তানি ও রিজার্ভ—এই তিন বৈদেশিক খাতে স্বস্তি থাকলেও আনন্দ নেই। তার কারণ ব্যবসার খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। সেই তুলনায় ব্যবসা বাড়েনি। সরকার অর্থনীতি চাঙা করতে বিভিন্ন প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছে। তবে মূল্যস্ফীতি কমাতে না কমলে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা হবে না। পাশাপাশি শিল্পে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

সরকারের খরচ বাড়ছে

মধ্যপ্রাচ্যের সংকট শুরুর পর জ্বালানি কিনতে সরকারের ব্যয় বেড়েছে। বর্তমানে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিনতে দ্বিগুণের বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছর ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়নের জ্বালানি আমদানি করেছে, যা তার আগের বছরের তুলনায় ৫ বিলিয়ন ডলার বেশি।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে অর্থনীতির গতি শ্লথ থাকায় সরকারের রাজস্ব আদায় কমেছে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রাজস্ব আদায় কম হয়েছে সাড়ে ৮৭ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরেও রাজস্ব আদায় পরিস্থিতির কোনো উন্নতি নেই। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি পাচ্ছে ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ। মূল বেতন, ভাতাসহ মোট চার ধাপে এই বেতনকাঠামো বাস্তবায়িত হলেও সরকারের আর্থিক চাপ বাড়বে।

জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রথম আলোকে বলেন, প্রবাসী আয়, পণ্য রপ্তানির মতো বহিঃস্থ খাতে গতি থাকলে অভ্যন্তরীণ খাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। যদিও তেমন কিছু দৃশ্যমান নয়। দেশের অর্থনীতি ভালো বলা যাবে না। শিল্প খাতের উৎপাদন শ্লথ। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে পণ্যের চাহিদা কম। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধিতে মূল্যস্ফীতি আরও উসকে যাওয়ার শঙ্কাও আছে। অভ্যন্তরীণ নাজুক পরিস্থিতির উন্নতি করা না গেলে বহিঃস্থ খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম আরও বলেন, এলএনজিনির্ভরতা কমাতে হবে। দেশি গ্যাস কূপ থেকে সক্ষমতার চেয়ে কম উৎপাদন হচ্ছে। সেটি বাড়াতে উদ্যোগ লাগবে। নতুন আবিষ্কৃত কূপ থেকে দ্রুত জাতীয় গ্রিডে গ্যাস নিতে হবে। বর্তমানে যে দামে এলএনজি কেনা হচ্ছে, সেটি চলমান থাকলে রিজার্ভে চাপ পড়বে।

সূত্র প্রথম আলো


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/16470 ,   Print Date & Time: Thursday, 3 September 2026, 08:35:27 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh