
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
বিদেশি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক গ্যারান্টি (BG) ও স্ট্যান্ডবাই লেটার অব ক্রেডিটের (SBLC) বিপরীতে এখন থেকে বাংলাদেশে থাকা কোম্পানিকে টাকায় ঋণ দিতে পারবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এ ধরনের ঋণ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে আলাদা করে পূর্বানুমোদন নেওয়ার প্রয়োজন হবে না। তবে এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত মানতে হবে।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ-১ থেকে ‘Loans, Overdrafts, Guarantees and External Borrowings’ বিষয়ে নতুন সমন্বিত সার্কুলার জারি করে এ সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, বিদেশি BG বা SBLC-এর বিপরীতে দেশে কার্যরত যেকোনো মালিকানার কোম্পানিকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান টাকায় অর্থায়ন করতে পারবে। ফলে কোম্পানিটি দেশীয় মালিকানাধীন কিংবা বিদেশি মালিকানাধীন—উভয় ক্ষেত্রেই নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলে এ সুবিধা পাওয়া যাবে।
বিদেশি গ্যারান্টিতে থাকতে হবে নির্দিষ্ট শর্ত
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নীতিতে বলা হয়েছে, বিদেশি BG বা SBLC অবশ্যই ‘unconditional, irrevocable and payable on first demand’ হতে হবে। অর্থাৎ গ্যারান্টিটি কোনো শর্তসাপেক্ষ হতে পারবে না, এটি প্রত্যাহারযোগ্য হবে না এবং প্রথম দাবিতেই অর্থ পরিশোধযোগ্য হতে হবে।
গ্যারান্টি প্রদানকারী বিদেশি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানকেও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো ক্রেডিট রেটিং এজেন্সির কাছ থেকে সন্তোষজনক রেটিং থাকতে হবে। তাদের ক্রেডিট রেটিং কমপক্ষে ‘BB’ অথবা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত Rating Grade 1–2-এর সমমান হতে হবে।
এ ধরনের গ্যারান্টির বিপরীতে ঋণ দেওয়ার সময় ঋণদাতা ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের ঋণনীতি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট দেশের ঝুঁকি বিবেচনায় নিতে হবে।
ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে ফি নেওয়ায় নিষেধাজ্ঞা
বিদেশি BG বা SBLC সংগ্রহের জন্য ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কোনো ফি, কমিশন, চার্জ কিংবা অন্য কোনো অর্থনৈতিক সুবিধা নেওয়া যাবে না।
এ ছাড়া ঋণ দেওয়ার আগে বিদেশি গ্যারান্টিটির আইনগত কার্যকারিতা যাচাই করতে হবে। কোন দেশের আইন প্রযোজ্য হবে, কোনো বিরোধ দেখা দিলে কীভাবে তা নিষ্পত্তি হবে এবং বাংলাদেশে গ্যারান্টিটি কার্যকর করা সম্ভব কি না—এসব বিষয় আইনগতভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
পাশাপাশি ঋণগ্রহীতার আর্থিক সক্ষমতা, ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য ও সামগ্রিক ঋণযোগ্যতাও যাচাই করতে হবে। এ ক্ষেত্রে নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী, নগদ প্রবাহ এবং অন্যান্য আর্থিক সূচক বিবেচনায় নিতে হবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে।
ঋণ খেলাপি হলে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাতে হবে
বিদেশি BG বা SBLC-এর বিপরীতে দেওয়া ঋণের মেয়াদ শেষে সেটি নবায়ন করা হলে সংশ্লিষ্ট গ্যারান্টি ব্যাংকের কাছে লিয়েনে রাখা যেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতার ব্যবসার টার্নওভার, মুনাফা, নগদ প্রবাহ এবং হিসাব পরিচালনার অবস্থার উন্নতি হয়েছে কি না, তা মূল্যায়ন করতে হবে।
কোনো ঋণগ্রহীতা অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে এবং সেই কারণে বিদেশি BG বা SBLC ‘invoke’ করা হলে বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাতে হবে।
বিদেশি গ্যারান্টির অর্থ পরিশোধের পর সেটি কীভাবে হিসাবভুক্ত হবে, সে বিষয়েও নতুন সার্কুলারে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ব্যবস্থার ধরন অনুযায়ী ওই অর্থ ইক্যুইটি বিনিয়োগ অথবা ঋণ হিসেবে রিপোর্ট করতে হবে।
ঋণের অর্থ হিসেবে রিপোর্ট করা হলে পরবর্তী সময়ে ওই অর্থ বিদেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ-২-এর পূর্বানুমোদন নিতে হবে।
বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানিও পাবে দেশীয় ঋণের সুযোগ
নতুন সমন্বিত সার্কুলারে বাংলাদেশে কার্যরত বিদেশি মালিকানাধীন বা বিদেশি নিয়ন্ত্রিত কোম্পানির দেশীয় ঋণ নেওয়ার সুযোগও স্পষ্ট করা হয়েছে।
বাংলাদেশে তিন বছর বা তার বেশি সময় ধরে উৎপাদন অথবা সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করা বিদেশি মালিকানাধীন বা নিয়ন্ত্রিত কোম্পানি উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্যবসার আধুনিকায়নের (BMRE) জন্য দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে টাকায় মেয়াদি ঋণ নিতে পারবে।
এ ক্ষেত্রে স্থানীয় মালিকানার অংশ কত শতাংশ, সেটি বাধা হিসেবে বিবেচিত হবে না। তবে মোট ঋণ ও ইক্যুইটির অনুপাত ৬০:৪০-এর সীমার মধ্যে রাখতে হবে এবং অন্যান্য প্রুডেনশিয়াল শর্ত পূরণ করতে হবে।
বিদেশ থেকে ঋণ নেওয়ার নিয়মও সহজ
বাংলাদেশের বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে ঋণ নিতে চাইলে সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবে আগে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ অথরিটি’র অনুমোদন নিতে হবে। সরবরাহকারী ঋণ, বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির কাছ থেকে নেওয়া ঋণ এবং বিদেশি পুঁজিবাজারে ঋণপত্র ইস্যুর মতো বিষয়ও এর আওতায় থাকবে।
তবে বিদেশি সরবরাহকারী বা ক্রেতার কাছ থেকে এক বছর পর্যন্ত স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক ঋণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের বাণিজ্যিক লেনদেনসংক্রান্ত বিদ্যমান নির্দেশনা প্রযোজ্য হবে।
অনুমোদিত বিদেশি ঋণের আসল, সুদ ও অনুমোদিত চার্জ পরিশোধের ক্ষেত্রেও প্রতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের আলাদা অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন হবে না। নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে যে ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণের অর্থ দেশে এসেছিল, সেই ব্যাংকের মাধ্যমেই ঋণ পরিশোধ করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, গত এক বছরে জারি করা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নির্দেশনা একত্র করে নতুন এই সমন্বিত সার্কুলার জারি করা হয়েছে। নতুন সার্কুলার কার্যকর হওয়ার পর আগের সংশ্লিষ্ট নির্দেশনাগুলো বাতিল হবে। সার্কুলারটি জারির তারিখ থেকে এক বছর কার্যকর থাকবে।