
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সামরিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলার জবাবে ইরাকের পাশাপাশি জর্ডান, কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে।
এর আগে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ এবং ওই অঞ্চলে মোতায়েন মার্কিন সেনাদের ওপর ইরানের সাম্প্রতিক হামলার চেষ্টার জবাবে মঙ্গলবার ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় নতুন করে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানায়, স্থানীয় সময় দুপুর ১২টার দিকে ইরানে আইআরজিসির বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা শুরু করে মার্কিন বাহিনী। পরে সন্ধ্যা ৬টা ৩৩ মিনিটে দেওয়া আরেক পোস্টে সেন্টকম জানায়, সর্বশেষ দফার অভিযান শেষ হয়েছে।
সেন্টকমের ভাষ্য অনুযায়ী, মার্কিন হামলায় আইআরজিসির বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার, সামুদ্রিক স্থাপনা ও সরঞ্জাম, নৌমাইন স্থাপনের সক্ষমতা এবং যোগাযোগব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
এক মাসেরও বেশি সময় বিরতির পর গত সোমবার রাত থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবারও পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে ইরানে হামলা চালানোর পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলার অভিযোগ
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানের সময় হামলা চালানোর অভিযোগ উঠেছে। ইরানের দাবি, দক্ষিণাঞ্চলীয় সিরিক কাউন্টিতে একটি বাড়িতে বোমা হামলায় এক শিশুসহ অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, বুধবার ভোরে কুহেস্তাক শহরের একটি বাড়িতে হামলাটি চালানো হয়। তিনি ঘটনাটিকে ‘বর্বর’ হামলা হিসেবে উল্লেখ করেন।
এ ছাড়া দক্ষিণ ইরানের কোনারাক, বান্দার আব্বাস ও কেশম দ্বীপেও বিস্ফোরণের খবর দিয়েছে দেশটির আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম।
মার্কিন স্থাপনায় ইরানের পাল্টা হামলা
মার্কিন হামলার জবাবে উত্তর ইরাকের এরবিল প্রদেশে মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে আইআরজিসি। ইরানি বাহিনী আরও জানিয়েছে, জর্ডান, কুয়েত ও বাহরাইনে থাকা মার্কিন সামরিক অবস্থানও তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিতে প্রচারিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি দাবি করেছে, ইরাকে চালানো হামলায় একটি মেরামতকেন্দ্র, কারিগরি সরঞ্জাম সংরক্ষণের কয়েকটি গুদাম এবং মার্কিন নজরদারি বেলুনের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে। এ ছাড়া একটি ঘাঁটির জ্বালানি ট্যাংকে আগুন লাগার কথাও জানিয়েছে তারা।
হামলায় কয়েকজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন বলেও দাবি করেছে আইআরজিসি। তবে ইরানের এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
জর্ডানের আকাশসীমায় ক্ষেপণাস্ত্র
জর্ডানের প্রিন্স হাসান বিমানঘাঁটিতে থাকা মার্কিন দীর্ঘপাল্লার আরকিউ-৪ ও এমকিউ-৯ ড্রোনের হ্যাঙ্গার লক্ষ্য করে একটি ‘ভারী’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে আইআরজিসি।
জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানি ভূখণ্ড থেকে উৎক্ষেপণ করা ১৩টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করে। এর মধ্যে ১০টি ক্ষেপণাস্ত্র জর্ডানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মাঝপথেই ধ্বংস করে দেয়।
এ ঘটনায় জর্ডানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সংঘাতের প্রভাব পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সামরিক স্থাপনায় পৌঁছে যাওয়ায় পুরো অঞ্চলে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
বাহরাইনে ড্রোন হামলার দাবি
বাহরাইনের শেখ ঈসা বিমানঘাঁটিতেও হামলার দাবি করেছে ইরান। তাসনিম ইরানের সেনাবাহিনীর একটি বিবৃতির বরাতে জানিয়েছে, বিমানঘাঁটিতে মার্কিন সেনাদের মোতায়েন থাকা এলাকা এবং রাডার স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে এক ঝাঁক ড্রোন ছোড়া হয়েছে।
ইরানের খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্সের মুখপাত্র কর্নেল ইব্রাহিম জোলফাঘারি বলেন, দক্ষিণ ইরানের সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার জবাব দিতেই অঞ্চলটির বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিতে দেওয়া বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, এসব হামলায় অবকাঠামো, স্থাপনা, অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মার্কিন কমান্ডার ও সেনা নিহত বা আহত হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি। এসব দাবিরও স্বাধীন কোনো যাচাই পাওয়া যায়নি।
জোলফাঘারি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের ‘অপরাধের’ জন্য অনুতপ্ত না হওয়া পর্যন্ত মার্কিনদের বিরুদ্ধে হামলা অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র যদি সামরিক অভিযান চালিয়ে যায়, তাহলে এর জবাব আরও ‘কঠোর, ব্যাপক ও ধ্বংসাত্মক’ হবে বলে সতর্ক করেন তিনি।
মার্কিন সামরিক বাহিনীকে সহযোগিতা করা যেকোনো দেশকেও এর ‘বিপজ্জনক পরিণতি’ মেনে নিতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন ইরানি এই কর্মকর্তা।
অর্থনৈতিক চাপের পরিকল্পনা, তারপর নতুন হামলা
ইরানে নতুন করে সামরিক হামলা চালানোর আগে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা সামরিক অভিযান কমিয়ে দেশটির ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশলের কথা জানিয়েছিলেন। মঙ্গলবার নর্থ ক্যারোলাইনায় জি২০-এর অর্থমন্ত্রীদের বৈঠকেও মার্কিন অর্থমন্ত্রী এই কৌশলের পক্ষে অবস্থান নেন।
তবে একই সময়ে ইরান পাল্টা সামরিক হামলা চালালে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
এখন ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে থাকা মার্কিন সামরিক অবস্থান সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের এই পাল্টাপাল্টি হামলা আরও বিস্তৃত সংঘাতে রূপ নেয় কি না, সেটিই এখন পুরো অঞ্চলের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।