
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশ যোগ দিলে দেশের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সম্ভাব্য এই চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে তাড়াহুড়া না করে রাজনৈতিক ঐকমত্য, কৌশলগত বিশ্লেষণ এবং কার্যকর কূটনৈতিক প্রস্তুতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।
সোমবার (৩১ আগস্ট) সকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের বিডিবিএল ভবনে ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান: কৌশলগত জাতীয় নিরাপত্তার হিসাব-নিকাশ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘ভয়েস ফর রিফর্ম’ আয়োজিত এ সভায় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কূটনীতিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, কোনো প্রতিরক্ষা জোট বা চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার আগে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব গভীরভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে চুক্তিটির সুনির্দিষ্ট শর্ত, সদস্যদেশগুলোর দায়বদ্ধতা এবং সম্ভাব্য সুবিধা-ঝুঁকিও পর্যালোচনা করতে হবে।
প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ
সভায় ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (এফএসডিএস) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর বলেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশ যোগ দিলে দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা, সামরিক শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানো এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে আন্তকার্যক্ষমতা বা ‘ইন্টারঅপারেবিলিটি’ তৈরির সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
তাঁর মতে, যৌথ সামরিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ উপকৃত হতে পারে। এসব সহযোগিতা দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আধুনিকায়নে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এর পাশাপাশি সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়ার পরামর্শ দেন ফজলে এলাহী আকবর। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এ ধরনের চুক্তিতে যোগ দিলে ভারতকে তার সামরিক পরিকল্পনায় বাংলাদেশকে নতুন করে হিসাবের মধ্যে রাখতে হতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থান ভবিষ্যতেও একই থাকবে কি না, সেটিও নিশ্চিত নয়।
‘ঝাঁপিয়ে পড়ার কিছু নেই’
মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবরের মতে, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এখনই ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রয়োজন নেই। বরং সম্ভাব্য সুবিধা ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, দীর্ঘ ৫৫ বছর ধরে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ও যোগাযোগ বজায় রাখলেও বাংলাদেশের এমন কোনো নির্ভরযোগ্য বন্ধুরাষ্ট্র নেই, যে নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশের নিরাপত্তার প্রশ্নে দৃঢ়ভাবে পাশে দাঁড়াবে।
এ অবস্থায় একটি সমষ্টিগত নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় আসার বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য কৌশলগতভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
‘হুজুগে’ সিদ্ধান্ত নয়
সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী বলেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দিলেই বাংলাদেশের সব প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সমস্যার সমাধান হবে—এমনটা ভাবার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, দেশের মানুষের একটি অংশ বা বৃহত্তর জনমত চুক্তিটির পক্ষে থাকলেও ‘হুজুগে’ সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আগে এর সম্ভাব্য সুফল ও ঝুঁকি নিয়ে যথাযথ ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
সরকার এখনো এ বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য প্রকাশ করছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, জনগণের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার না করে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ
তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য এবং সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সাজ্জাদ সিদ্দিকী বলেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং এ বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিনন্দন বার্তাও আলোচনায় বিবেচনায় নেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।
অধ্যাপক সাজ্জাদ সিদ্দিকীর মতে, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের তাড়াহুড়া করা উচিত নয়। এ বিষয়ে জাতীয় সংসদ, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, কূটনীতিক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সিদ্ধান্তের আগে জাতীয় ঐকমত্য তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।
ন্যাটোর আর্টিকেল ৫ নিয়ে আলোচনা
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি আলোচনায় আসার পর এর বিরোধিতাকারীদের অনেকে ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫-এর উদাহরণ টানছেন। তাঁদের মতে, ন্যাটোর এ বিধান অনুযায়ী কোনো একটি সদস্যদেশের ওপর সশস্ত্র হামলাকে পুরো জোটের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং আক্রান্ত দেশকে সহায়তায় অন্য সদস্যদেশগুলোর প্রতিক্রিয়া জানানোর বিষয়টি সামনে আসে।
তবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শাহাব এনাম খান বলেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির ক্ষেত্রে আর্টিকেল ৫ সদস্যদেশ আক্রান্ত হলে সম্মিলিতভাবে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া জানানো হবে, সেই কাঠামো নির্ধারণ করে। তবে এর অর্থ কোনো দেশের ওপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হওয়া নয়।
অধ্যাপক শাহাব এনাম খান মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তবে তাঁর মতে, সিদ্ধান্ত নিতে হবে কার্যকর কূটনৈতিক প্রস্তুতি এবং রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে।
বাংলাদেশের জন্য ‘গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা’
ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের সাবেক উপপ্রধান জন এফ ড্যানিলোউইজ মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিকে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, বিএনপি সরকারের ঘোষিত ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির বাস্তব প্রয়োগ কী হবে, এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে তা স্পষ্ট হতে পারে। তাঁর মতে, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’কে কীভাবে একটি বৃহৎ নীতিগত অবস্থান থেকে বাস্তব ও সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে রূপ দেওয়া যায়, সেটিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
আলোচনায় আরও যারা
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন ভয়েস ফর রিফর্মের সহসমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর।
আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন এফএসডিএসের মুখ্য গবেষণা ফেলো ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাফায়াত আহমেদ, মানবাধিকারকর্মী রুবি আমাতুল্লাহ, নেক্সাফ ডিফেন্স অ্যান্ড জাস্টিসের সভাপতি ব্রিগেডিয়ার (অব.) হাসান নাসির, সাংবাদিক ফয়সাল মাহমুদ, এনসিপি নেত্রী মনিরা শারমিন এবং রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ হাসিবউদ্দিন হোসেনসহ অনেকে।
আলোচনায় সামগ্রিকভাবে উঠে আসে—মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান দেশের জন্য প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও কৌশলগত সক্ষমতা বৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে এর সঙ্গে আঞ্চলিক রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং জাতীয় নিরাপত্তার সম্ভাব্য ঝুঁকিও রয়েছে। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বিস্তৃত পর্যালোচনা, কূটনৈতিক প্রস্তুতি এবং রাজনৈতিক ঐকমত্য নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন বক্তারা।