• হোম > এশিয়া | বিদেশ > নেপালের ভয়াবহ হড়পা বান: হিমবাহ ভাঙার স্রোতে এত কাদা এল কোথা থেকে?

নেপালের ভয়াবহ হড়পা বান: হিমবাহ ভাঙার স্রোতে এত কাদা এল কোথা থেকে?

  • সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬, ১৩:১৩
  • ৮

---

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধসের পর ভয়াবহ হড়পা বানে শুধু পানি নয়, বিপুল পরিমাণ কাদা, মাটি ও পাথর নেমে এসেছে পাহাড়ি জনপদে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই বিপর্যয়ের পেছনে ভূমিকা থাকতে পারে হিমবাহের নিচে জমে থাকা বরফাচ্ছাদিত মাটি বা ‘পার্মাফ্রস্ট’-এর।

নেপালের সাম্প্রতিক ভয়াবহ হড়পা বানে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলেছে, তা হলো প্রবল স্রোতের সঙ্গে নেমে আসা বিপুল পরিমাণ কাদা, মাটি, পলি ও পাথর।

নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে একটি বিশাল হিমবাহ ধসে পড়ার পর এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। পাহাড়ের ওপর থেকে বরফ, পানি ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল প্রবাহ নিচের দিকে নেমে এসে নদী ও উপত্যকার বিস্তীর্ণ এলাকা তছনছ করে দেয়।

৫ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতায় হিমবাহ ধস

বিপর্যয়ের উৎপত্তিস্থল নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছাকাছি লাংটাং হিমল পর্বতমালার লাংটাং লিরুং অঞ্চলের উত্তরে।

প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় থাকা হিমবাহের একটি বড় অংশ ভেঙে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচে আছড়ে পড়ে। এই বিশাল ধসের অভিঘাত এতটাই শক্তিশালী ছিল যে পাহাড়ি এলাকায় ভূকম্পনও অনুভূত হয়।

প্রথমদিকে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেছিলেন, ভূমিকম্পের কারণে পাহাড় ধসে নদীতে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। পরে উপগ্রহচিত্র ও ভূতাত্ত্বিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, হিমবাহ ধসই ছিল মূল ঘটনার সূত্রপাত।

শুধু পাহাড়ের মাটি নয়, হিমবাহের নিচেও ছিল কাদা

বিজ্ঞানীদের মতে, পাহাড়ি ঢাল বেয়ে নিচে নামার সময় প্রবল স্রোত উপত্যকা থেকে পলি, বালি, আলগা মাটি ও পাথর সংগ্রহ করে। কিন্তু ভোটেকোশী নদীতে যে বিপুল পরিমাণ কাদা দেখা গেছে, তা শুধু নদীপথ ও উপত্যকা থেকে আসা সম্ভব নয়।

গবেষকদের ধারণা, হিমবাহের গোড়াতেই বিপুল পরিমাণ মাটি ও কাদামাটি জমে ছিল।

হিমালয়ের কিছু উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে মাটি ও শিলার নিচে দীর্ঘ সময় ধরে জমাট বাঁধা বরফ থাকে। এই জমাটবদ্ধ বরফ ও মাটির স্তরকে ভূবিজ্ঞানের ভাষায় পার্মাফ্রস্ট বলা হয়।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, হিমবাহের নিচে থাকা এই বরফাচ্ছাদিত মাটি গলতে শুরু করায় পাহাড় ও হিমবাহের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে বিশাল বরফখণ্ড ধসে পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়।

হিমবাহ ধসের পর নদী আটকে তৈরি হয় অস্থায়ী হ্রদ

উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণে আরও জানা গেছে, হিমবাহ ধসের পর তিব্বতের গিরং কাউন্টি থেকে উৎপন্ন একটি নদীর গতিপথ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

এর ফলে পাহাড়ি এলাকায় অল্প সময়ের জন্য একটি অস্থায়ী হ্রদ তৈরি হয়। পরে বিপুল পানির চাপে সেই বাধ ভেঙে যায় এবং জমে থাকা পানি, কাদা ও পাথরের বিশাল প্রবাহ নিচের দিকে ধেয়ে আসে।

এই স্রোত পরবর্তীতে নেপালের ভোটেকোশী ও ত্রিশূলী নদীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।

কিছু এলাকায় মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যে নদীর পানির স্তর কয়েক মিটার পর্যন্ত বেড়ে যায় বলে স্থানীয় পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন

বিজ্ঞানীরা বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়সহ বিশ্বের বিভিন্ন পার্বত্য অঞ্চলের হিমবাহ ও বরফাচ্ছাদিত মাটির কাঠামো ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে।

পার্মাফ্রস্ট গলে গেলে পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে যেতে পারে এবং হিমবাহ, শিলা ও মাটির বিশাল অংশ ধসে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে।

তবে এই নির্দিষ্ট বিপর্যয়ের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্ক কতটা, তা নিশ্চিতভাবে জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ঝুঁকিতে পাহাড়ি জনপদ

বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমবাহ ও পাহাড়ি নদীর আশপাশের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো দ্রুত চিহ্নিত করা জরুরি।

একই সঙ্গে দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে হিমবাহের গতিবিধি, পার্মাফ্রস্টের পরিবর্তন এবং পাহাড়ি নদীর গতিপথ নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, হিমালয়ের পাশাপাশি দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ ও ইউরোপের আল্পস অঞ্চলেও ভবিষ্যতে এ ধরনের হিমবাহ ধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

এক নজরে

- নেপাল-তিব্বত সীমান্তে উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে হিমবাহ ধসের ঘটনা।

- প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতা থেকে বিশাল বরফখণ্ড নিচে নেমে আসে।

- প্রবল স্রোতের সঙ্গে বিপুল কাদা, মাটি, পলি ও পাথর ভেসে আসে।

- হিমবাহের নিচে থাকা জমাটবদ্ধ মাটি বা পার্মাফ্রস্ট গলনকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

- ধসের কারণে নদীর গতিপথ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে অস্থায়ী হ্রদ তৈরি হয়।

- পরে সেই বাধ ভেঙে ভয়াবহ হড়পা বানের সৃষ্টি হয়।

- বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/16151 ,   Print Date & Time: Monday, 31 August 2026, 09:04:42 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh