
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল আবারও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। হামলার আশঙ্কায় জাহাজ কোম্পানিগুলো চলাচলে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করায় সপ্তাহান্তে প্রণালিটি দিয়ে দৃশ্যমান পণ্যবাহী জাহাজের সংখ্যা দিনে মাত্র পাঁচটিতে নেমে এসেছে।
সোমবার প্রকাশিত জাহাজ চলাচলের তথ্য থেকে এ চিত্র পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হরমুজ প্রণালিতে সাম্প্রতিক হামলা ও উত্তেজনা আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নতুন করে চাপ তৈরি করেছে।
তবে প্রণালিটি দিয়ে প্রকৃতপক্ষে চলাচল করা জাহাজের সংখ্যা প্রকাশিত হিসাবের চেয়ে বেশি হতে পারে। কারণ নিরাপত্তাঝুঁকি এড়াতে কিছু জাহাজ তাদের স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা (এআইএস) বন্ধ রাখছে। ফলে স্যাটেলাইটভিত্তিক ট্র্যাকিংয়ে সেসব জাহাজের অবস্থান সব সময় দৃশ্যমান হচ্ছে না।
ছোট জাহাজের চলাচল
পণ্য বাণিজ্যবিষয়ক প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, সপ্তাহান্তে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেসব জাহাজ চলাচল করেছে, সেগুলোর বেশির ভাগই ছোট আকারের। এর মধ্যে দুটি ছিল তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) পরিবহনকারী জাহাজ।
জাহাজ চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, একটি জাহাজ ইরানের দিকের পথ দিয়ে হরমুজ প্রণালি থেকে বের হয়ে গেছে। অন্যটি রাতের আঁধারে প্রণালি পার হয়ে ভারতের দিকে রওনা হয়েছে।
এর আগে শুক্রবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে মোট ১৪টি জাহাজ চলাচল করেছিল। এসব জাহাজের মধ্যে একটি ছিল কাতারি অপরিশোধিত তেলবোঝাই বিশাল ট্যাংকার। জাহাজটিতে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ছিল। সেটি অবস্থান শনাক্তকারী ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখেই প্রণালি অতিক্রম করে বেরিয়ে যায়।
ট্যাংকারে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ার পেছনে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনাও বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, গত শনিবার হরমুজ প্রণালির ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় একটি ট্যাংকার অজ্ঞাত কোনো ক্ষেপণাস্ত্র বা প্রজেক্টাইলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গত এক সপ্তাহে হরমুজ প্রণালিতে ইউকেএমটিওর জানানো এটি তৃতীয় হামলার ঘটনা। ধারাবাহিক এসব ঘটনার কারণে জাহাজ মালিক ও পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি এই পথ দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যায়। ফলে এখানে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
লারাক দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা
এরই মধ্যে রোববার হরমুজ প্রণালির কাছে ইরানের লারাক দ্বীপে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এক মাসেরও বেশি সময়ের মধ্যে এটি ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম এ ধরনের হামলা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
হামলায় সেনা ও বেসামরিক লোকজন হতাহত হয়েছে বলে জানায় ইরান। হামলার পর এর জবাব দেওয়ার ঘোষণা দেয় দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।
রোববার দিবাগত রাতে জর্ডানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবিও করে ইরান। এতে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়।
জর্ডানের আকাশে আট ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত
ইরানের হামলার দাবির পর সোমবার জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করা আটটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে।
জর্ডানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র এক বিবৃতিতে জানান, সোমবার ভোরে দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করা আটটি ক্ষেপণাস্ত্র আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিহত করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি সামরিক তৎপরতায় মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতেও। নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়তে থাকলে জাহাজ চলাচলে আরও বিধিনিষেধ আরোপ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন করে চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।