
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা এবং উৎপাদনশীলতা বাড়াতে দেশের তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানিকারকেরা কারখানার উৎপাদন লাইনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) প্রযুক্তি ও ডিভাইসের ব্যবহার বাড়াচ্ছেন।
ইতোমধ্যে দেশের বেশ কয়েকটি পোশাক কারখানায় উৎপাদন লাইনের একাংশে এ ধরনের প্রযুক্তি চালু হয়েছে। কোনো কোনো কারখানা আবার প্রতিটি সেলাই মেশিনকে আইওটি-ভিত্তিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করেছে। শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, রপ্তানিমুখী আরও বেশ কিছু বড় পোশাক কারখানাও একই ধরনের ডিজিটাল উৎপাদন মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে।
কারখানা মালিক ও কর্মকর্তাদের মতে, উৎপাদন, মেশিনের কার্যক্ষমতা এবং ত্রুটি সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় এই প্রযুক্তি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহায়তা করছে। কিছু কারখানার দাবি, প্রচলিত ম্যানুয়াল মনিটরিং ব্যবস্থার তুলনায় আইওটি প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎপাদনশীলতা ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
বর্তমানে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে ধামরাইয়ের স্নোটেক্স গ্রুপ, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা অ্যাপারেলস, সাভারের টিম গ্রুপ, আদমজী ইপিজেডের ইউনেস্কো গ্রুপের একটি কারখানা এবং ময়মনসিংহের ভালুকার স্প্যারো গ্রুপ। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কয়েকটি কারখানায় আংশিকভাবে প্রযুক্তিটি চালু হয়েছে।
স্নোটেক্সে বড় পরিসরে প্রযুক্তির ব্যবহার
যোগাযোগ করা কারখানাগুলোর মধ্যে স্নোটেক্স গ্রুপ সবচেয়ে বড় পরিসরে আইওটি-ভিত্তিক উৎপাদন মনিটরিং ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করেছে বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি ধামরাইয়ে স্নোটেক্সের একটি কারখানা পরিদর্শনের সময় দেখা যায়, উৎপাদন ফ্লোরের প্রতিটি সেলাই মেশিনে আইওটি ডিভাইস সংযুক্ত রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানান, ২০২৩ সাল থেকে তাদের সব কারখানার প্রায় ১০ হাজার সেলাই মেশিনে এই ডিভাইস ব্যবহার করা হচ্ছে।
স্নোটেক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এসএম খালেদ জানান, প্রযুক্তিটি চালুর পর উৎপাদনশীলতা ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে দেখা গেছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের পর্যবেক্ষণ হলো, ম্যানুয়াল পদ্ধতির তুলনায় এই ব্যবস্থায় প্রোডাকটিভিটি ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।’
এই প্রযুক্তির মাধ্যমে কারখানা ব্যবস্থাপকেরা প্রতিটি মেশিন ও অপারেটরের উৎপাদন পরিস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। কোনো মেশিনের গতি কমে গেলে কিংবা কোনো ত্রুটি দেখা দিলে তা কেন্দ্রীয় মনিটরিং স্ক্রিনে দেখা যায়। ফলে লাইন চিফ বা প্রোডাকশন ম্যানেজাররা দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেন।
কর্মকর্তাদের মতে, কোনো সমস্যা নির্দিষ্ট মেশিনের কারণে হচ্ছে নাকি অপারেটরের ভুলের কারণে—সেটিও এই ব্যবস্থার মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব। এতে সমস্যা সমাধানে সময় কমে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ডাউনটাইম বা উৎপাদন বন্ধ থাকার সময়ও কমানো যায়।
স্প্যারো গ্রুপেও বাড়ছে ব্যবহার
প্রায় ছয় মাস আগে আইওটি-ভিত্তিক উৎপাদন মনিটরিং ব্যবস্থা ব্যবহার শুরু করে স্প্যারো গ্রুপ। বছরে প্রায় ৩৫ কোটি ডলার মূল্যের তৈরি পোশাক রপ্তানি করা প্রতিষ্ঠানটি তাদের মোট সেলাই মেশিনের প্রায় অর্ধেকে এই ডিভাইস স্থাপন করেছে বলে জানান গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম।
তিনি বলেন, ম্যানুয়াল পদ্ধতির তুলনায় প্রায় ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত উৎপাদনশীলতা বেড়েছে।
শোভন ইসলাম জানান, ২০২৭ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের সব সেলাই মেশিনে এই ডিভাইস স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। উৎপাদনশীলতার পাশাপাশি পণ্যের গুণগত মান পর্যবেক্ষণেও প্রযুক্তিটি ব্যবহার করা হচ্ছে।
শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হা-মীম গ্রুপ, ডিবিএল গ্রুপ, উর্মি গ্রুপ এবং ফকির ফ্যাশন্সের মতো বড় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানও ডিজিটাল উৎপাদন মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে।
যেভাবে কাজ করে এআই-আইওটি প্রযুক্তি
আইওটি-ভিত্তিক এই ব্যবস্থায় প্রতিটি সেলাই মেশিনের সঙ্গে একটি করে ডিভাইস যুক্ত থাকে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মেশিন অপারেটরের নাম ও পরিচয় নম্বরও সিস্টেমে সংযুক্ত করা হয়।
উৎপাদন ফ্লোরে থাকা ডিভাইসগুলো একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকে। সেখানে মেশিনের উৎপাদন, কার্যক্ষমতা ও বিভিন্ন ত্রুটির তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যায়।
স্নোটেক্সের ক্ষেত্রে সব কারখানার ডিভাইস একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজের সঙ্গে সংযুক্ত। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের উচ্চপর্যায়ের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন কারখানার উৎপাদন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।
কোনো সমস্যার সমাধান হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী নির্দিষ্ট মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সেটি সিস্টেমে নথিভুক্ত করেন। ফলে কে সমস্যাটি সমাধান করেছেন এবং সমাধানে কত সময় লেগেছে, তার বিস্তারিত তথ্যও ব্যবস্থাপকেরা দেখতে পারেন।
কারখানা কর্মকর্তা ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, কারখানার প্রয়োজন অনুযায়ী ডিভাইস ও সফটওয়্যারে কিছুটা পার্থক্য থাকলেও মূল কার্যপদ্ধতি প্রায় একই।
একটি কারখানার একজন আইটি বিশেষজ্ঞ নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, উৎপাদন ফ্লোরে সমস্যা শনাক্ত করা এবং তা সমাধানের সময় অনেকটাই কমিয়ে এনেছে এই প্রযুক্তি।
তিনি বলেন, আগে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে কোনো সমস্যা দেখা দিলে সেটি শনাক্ত করতে এবং পরে সমাধান করতে সময় লাগত। এখন সমস্যার বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায় এবং কর্মীদের পারফরম্যান্স মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও এসব তথ্য ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে।
উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ইনসেন্টিভ
ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থার পাশাপাশি শ্রমিকদের জন্য নির্দিষ্ট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা এবং প্রণোদনা বা ইনসেন্টিভ স্কিমও চালু করছে কিছু কারখানা।
মেশিন অপারেটরদের জন্য প্রতি ঘণ্টায় নির্দিষ্ট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ কিংবা অতিরিক্ত উৎপাদন করতে পারলে দেওয়া হচ্ছে বোনাস। উৎপাদনের পরিমাণ এবং ত্রুটির হার বিশ্লেষণ করে নির্ধারণ করা হচ্ছে প্রণোদনার পরিমাণ।
স্নোটেক্সের শ্রমিক আফিজুল জানান, প্রোডাকশন ইনসেন্টিভ বোনাস বা পিআইবি চালু হওয়ায় মূল বেতনের বাইরে গড়ে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কারখানার আরেক অপারেটর শারমিন আক্তার জানান, নতুন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের পর মাসে প্রায় ২ হাজার টাকা অতিরিক্ত বোনাস পাচ্ছেন তিনি। ওভারটাইম ও অন্যান্য সুবিধা মিলিয়ে মাসে সর্বোচ্চ ২৮ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হয়েছে বলেও জানান তিনি।
কারখানা কর্মকর্তারা জানান, যেসব শ্রমিকের উৎপাদিত পণ্যে ত্রুটির হার বেশি, তারা তুলনামূলক কম ইনসেন্টিভ বোনাস পান।
শ্রমিকদের কাজের চাপ নিয়ে উদ্বেগ
তবে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে কিছু উদ্বেগও রয়েছে। শ্রমিক নেতাদের মতে, উচ্চ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের কারণে অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের ওপর বাড়তি কাজের চাপ তৈরি হতে পারে।
আওয়াজ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক নাজমা আক্তার বলেন, শিল্প প্রকৌশল ও উচ্চ উৎপাদনশীলতার যুক্তিতে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে শ্রমিকদের কাছ থেকে তাদের শারীরিক সক্ষমতার তুলনায় বেশি কাজ নেওয়া হচ্ছে।
তার দাবি, বাড়তি কাজের চাপের তুলনায় শ্রমিকদের দেওয়া প্রণোদনা অনেক ক্ষেত্রেই অপর্যাপ্ত।
এ বিষয়ে শ্রমিকদের মধ্যে অবশ্য মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। ঢাকার একটি পোশাক কারখানার এক নারী শ্রমিক জানান, ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর পর তার প্রতি ঘণ্টার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ২৮-৩০ পিস থেকে বাড়িয়ে ৩৫ পিস করা হয়েছে।
অন্য এক শ্রমিক জানান, কাজের চাপ কিছুটা বাড়লেও মাস শেষে বাড়তি অর্থ আয় করা সম্ভব হচ্ছে। তাই তিনি এই ব্যবস্থায় সন্তুষ্ট।
তবে প্রযুক্তির কারণে শ্রমিকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে—এমন অভিযোগ নাকচ করেছেন স্নোটেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম খালেদ।
তার মতে, কোনো সমস্যা মেশিনের ত্রুটি, গাইড বা অন্য কোনো কারণে হয়েছে কি না, তা দ্রুত শনাক্ত করে সমাধান করা যাচ্ছে। এতে উৎপাদন বাড়লেও শ্রমিকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে না।
টিম গ্রুপের একজন জ্যেষ্ঠ আইটি কর্মকর্তাও একই মত প্রকাশ করে বলেন, শ্রমিকদের ওপর চাপ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে নয়, বরং অকার্যকর সময় বা অপচয় কমানো এবং দ্রুত সমস্যা সমাধানের জন্যই এই সিস্টেম তৈরি করা হয়েছে।
বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় ডিজিটালাইজেশন গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, উৎপাদনশীলতার দিক থেকে বাংলাদেশ এখনো চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া এমনকি কম্বোডিয়ার চেয়েও পিছিয়ে রয়েছে। বৈশ্বিক বাজারে এসব দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।
তার হিসাবে, বাংলাদেশে শ্রমিকদের কর্মদক্ষতা আনুমানিক ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ। বিপরীতে চীন ও ভিয়েতনামে এ হার প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ।
তিনি বলেন, ‘আমাদের ব্যবসাগুলোকে প্রতিযোগিতামূলক রাখতে হলে শিল্প খাতে ডিজিটালাইজেশন বা প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার বিকল্প নেই।’
বিশেষজ্ঞ ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, বৈশ্বিক পোশাক বাজারে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা, উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোতে প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়বে। তবে একই সঙ্গে শ্রমিকদের নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি, কর্মপরিবেশ এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ভারসাম্য রাখাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।