• হোম > এশিয়া | বিদেশ > প্রধান শিক্ষকের উপস্থিত বুদ্ধিতে বাঁচল ১,৬৪৩ শিক্ষার্থী

প্রধান শিক্ষকের উপস্থিত বুদ্ধিতে বাঁচল ১,৬৪৩ শিক্ষার্থী

  • রবিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৬, ১৮:০৩
  • ১৫

---

 

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

‘গ্রামটি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। আমাকে বলল, দৌড়াও।’ বন্ধুর কাছ থেকে এমন একটি সতর্কবার্তা পেয়েই মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল নেপালের ত্রিশূলী উপত্যকার ত্রিভুবন ত্রিশূলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদিকে। চোখের সামনে তখন স্কুল ও আশপাশে অবস্থান করছিল ১ হাজার ৬৪৩ জন শিক্ষার্থী। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিতে হতো—কীভাবে এই বিপুলসংখ্যক শিশুকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া যায়।

শেষ পর্যন্ত তার দ্রুত সিদ্ধান্ত ও উপস্থিত বুদ্ধির কারণে ভয়াবহ বন্যার স্রোত থেকে প্রাণে বেঁচে যায় বিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থী। কিন্তু এই দুর্যোগে প্রাণ হারিয়েছেন স্কুলের দুই কর্মী।

হঠাৎ সতর্কবার্তা, কয়েক মিনিটের সিদ্ধান্ত

নেপালের নুয়াকোটে অবস্থিত তিনতলা ত্রিভুবন ত্রিশূলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি নদী থেকে প্রায় ৬০ মিটার উঁচুতে। এ কারণে প্রথমে বিদ্যালয়টিকে নিরাপদ মনে করেছিলেন ৪৭ বছর বয়সী ইংরেজির শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদি।

কিন্তু বুধবার সকাল ৯টা ২০ মিনিটে এক বন্ধুর কাছ থেকে ভয়াবহ সতর্কবার্তা পান তিনি। তাকে জানানো হয়, একটি গ্রাম নদীর পানিতে বিলীন হয়ে গেছে। দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য তাকে সতর্ক করা হয়।

এই বার্তা পাওয়ার পর পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে সময় নেননি দাওয়াদি। তিনি দ্রুত স্কুলের ঘণ্টা বাজিয়ে দেন এবং শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষ থেকে বের করে আনার জন্য শিক্ষকদের নির্দেশ দেন।

একই সঙ্গে স্কুলবাসের চালকদের ফোন করে শিক্ষার্থীদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে বলেন।

বাস চালকের সঙ্গে যোগাযোগ না পেয়ে দুশ্চিন্তা

শিক্ষার্থীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার কাজ যখন শুরু হয়েছে, তখনও পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। একজন বাসচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি প্রধান শিক্ষক। পরে তিনি দেখতে পান, ওই বাসটি তখনো একটি সেতু পার হচ্ছে।

এতে পরিস্থিতি নিয়ে তার উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়। কারণ পাহাড়ি অঞ্চলে আকস্মিক বন্যার পানির স্রোত কতটা দ্রুত ও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে, তা তিনি বুঝতে পারছিলেন।

এদিকে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। নিরাপদ স্থানে যাওয়ার জন্য ছোটাছুটি শুরু করে তারা।

আতঙ্কের মধ্যেও শিক্ষার্থীদের সরিয়ে নেওয়া

বন্যার ভয়াবহতার খবর ছড়িয়ে পড়তেই এক ছাত্রী আতঙ্কে অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাকে মোটরসাইকেলে করে দ্রুত অপেক্ষাকৃত উঁচু এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়।

অন্য শিক্ষার্থীরা পায়ে হেঁটে নিরাপদ জায়গার দিকে ছুটতে থাকে। তাদের পেছনেই ছিলেন প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদি। তার মূল লক্ষ্য ছিল—কোনো শিক্ষার্থী যেন পিছিয়ে না পড়ে এবং সবাই নিরাপদ স্থানে পৌঁছাতে পারে।

শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা একটি বোধিবৃক্ষের নিচে আশ্রয় নেয়।

এর কিছুক্ষণের মধ্যেই ভয়াবহ পানির স্রোত বিদ্যালয় ভবনসহ আশপাশের বিভিন্ন স্থাপনা ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

১,৬৪৩ শিক্ষার্থীর সবাই বেঁচে গেল

বন্যার স্রোত যখন স্কুল ভবন ও আশপাশের স্থাপনা ধ্বংস করে দিচ্ছিল, তখন বিদ্যালয়ের ১ হাজার ৬৪৩ শিক্ষার্থী নিরাপদ স্থানে অবস্থান করছিল।

প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদির দ্রুত সিদ্ধান্তের কারণে বিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থী প্রাণে বেঁচে যায়। ভয়াবহ এই দুর্যোগের মধ্যে এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে অল্প সময়ের মধ্যে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা স্থানীয়দের কাছেও বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে।

তবে শিক্ষার্থীদের সবাইকে রক্ষা করা গেলেও স্কুলের শিক্ষক ও কর্মচারীদের সবাইকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

প্রাণ হারালেন শিক্ষক ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী

বিদ্যালয়ের ইতিহাসের শিক্ষক ৩২ বছর বয়সী সান্তোষ পারিয়ার সকালে নাশতা রান্না করতে নদীর পাশে নিজের ভাড়া করা ঘরে ফিরে গিয়েছিলেন। সেখানেই ভয়াবহ পানির স্রোতে ভেসে যান তিনি।

স্কুলের পরিচ্ছন্নতাকর্মী সুলতান লামাও দরজা বন্ধ করতে ফিরে গিয়ে পানির স্রোতে ভেসে মারা যান।

শিক্ষার্থীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার পরও এই দুই কর্মীর মৃত্যু বিদ্যালয়জুড়ে শোকের আবহ তৈরি করেছে।

স্থানীয়দের চোখে নায়ক, কিন্তু কৃতিত্ব নিতে নারাজ

১ হাজার ৬৪৩ শিক্ষার্থীর জীবন বাঁচানোর পর স্থানীয়রা প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদিকে নায়ক হিসেবে অভিহিত করছেন। তবে তিনি নিজে এই ঘটনার কোনো কৃতিত্ব নিতে চান না।

বিদ্যালয়ের ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে তিনি শুধু বলেন, ‘আমি আর কী করতে পারতাম?’

তার এই কথার মধ্যেই যেন ফুটে উঠেছে একজন শিক্ষকের দায়িত্ববোধ। নিজের নিরাপত্তার কথা না ভেবে শিক্ষার্থীদের জীবন রক্ষাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছিলেন তিনি।

কীভাবে শুরু হলো ভয়াবহ বন্যা

এই ভয়াবহ বন্যার সূত্রপাত হয় নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে লাংটাং লিরুং পর্বতশৃঙ্গ থেকে বিশাল বরফ ও পাথরের একটি অংশ ধসে পড়ার পর।

ধসে পড়া বরফ ও পাথরের বিশাল ভর প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচে লেন্দে খোলা নদীর খাড়া গিরিখাতে আছড়ে পড়ে। এরপর সেখান থেকে সৃষ্টি হয় ভয়াবহ স্রোত। নদীপথ ধরে সেই স্রোত দ্রুত বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।

ক্যালগারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-আকৃতিবিদ ড্যানিয়েল শুগারের হিসাব অনুযায়ী, ধসে পড়া বরফ ও পাথরের বিশাল অংশটি প্রায় ৫০ একর এলাকাজুড়ে ছিল। আয়তনের দিক থেকে যা লন্ডনের গ্রিন পার্কের কাছাকাছি।

নেপাল ও তিব্বতে ব্যাপক প্রাণহানি

এই আকস্মিক বন্যায় নেপাল ও তিব্বতের বিস্তীর্ণ এলাকা বিপর্যস্ত হয়েছে। সর্বশেষ হিসাবে নেপালে ৭৫০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তিব্বতে মারা গেছেন ১৬ জন।

এখনো নেপালে প্রায় ২ হাজার ৪৯৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। অন্যদিকে তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে নিখোঁজের সংখ্যা ৫৪৬।

বন্যার ভয়াবহ স্রোতে বহু ঘরবাড়ি, সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ভেসে গেছে। পাহাড়ি নদীগুলোর ওপর দিয়ে বরফ, পাথর, কাদা ও পানির বিশাল স্রোত নেমে আসায় বহু জনপদ মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

আগেও ভয়াবহ দুর্যোগ দেখেছে লাংটাং

নেপালের এই পার্বত্য অঞ্চল এর আগেও ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছে।

২০১৫ সালের এপ্রিলে নেপালে আঘাত হানে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প। ওই ভূমিকম্পে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রায় ৮ হাজার ৯৬২ জন নিহত হন।

ভূমিকম্পের পর সৃষ্ট তুষারধসেও লাংটাং এলাকায় প্রায় ৩০০ বাসিন্দা প্রাণ হারিয়েছিলেন। দীর্ঘ সময় পর আবারও একই বিস্তীর্ণ পার্বত্য অঞ্চল ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাতে বিপর্যস্ত হলো।

তবে এবারের দুর্যোগে ত্রিভুবন ত্রিশূলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদির কয়েক মিনিটের সিদ্ধান্ত ১ হাজার ৬৪৩ শিক্ষার্থীর জীবন রক্ষা করেছে। ভয়াবহ বন্যার মধ্যে তার এই উপস্থিত বুদ্ধি এখন স্থানীয়দের কাছে শুধু একজন শিক্ষকের দায়িত্ব পালনের উদাহরণ নয়, বরং সংকটের মুহূর্তে দ্রুত ও সঠিক সিদ্ধান্ত কতটা গুরুত্বপূর্ণ—তারও এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।

 

 


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/16113 ,   Print Date & Time: Monday, 31 August 2026, 06:05:59 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh