• হোম > বাংলাদেশ | শিক্ষা > দুর্গম স্কুলের শিক্ষকদের বিশেষ ভাতা দেওয়ার উদ্যোগ

দুর্গম স্কুলের শিক্ষকদের বিশেষ ভাতা দেওয়ার উদ্যোগ

  • রবিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৬, ১৭:৫৯
  • ১৮

---

 

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

দেশের চরাঞ্চল ও দুর্গম এলাকার বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের দায়িত্ব পালনে আরও উৎসাহিত করতে বিশেষ ভাতা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। দুর্গম এলাকার বাস্তবতা, বিদ্যালয়ের দূরত্ব, যোগাযোগব্যবস্থা ও যাতায়াতের সমস্যা বিবেচনায় নিয়ে এই ভাতার কাঠামো নির্ধারণ করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের বিভিন্ন জেলার দুর্গম চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোকে এই উদ্যোগের আওতায় আনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। কোন বিদ্যালয় বা এলাকা প্রকৃত অর্থে দুর্গম, সেটিও বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করে নির্ধারণ করা হবে।

রোববার (৩০ আগস্ট) রংপুরের পিটিআই অডিটোরিয়ামে ‘বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা, মনিটরিং, জবাবদিহি ও প্রশাসনিক কাঠামোর সংস্কার’ শীর্ষক দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।

রংপুর বিভাগীয় উপপরিচালকের কার্যালয়, প্রাথমিক শিক্ষা এই কর্মশালার আয়োজন করে।

দুর্গমতা বিবেচনায় ভাতার কাঠামো

দুর্গম ভাতা চালুর পরিকল্পনা প্রসঙ্গে ববি হাজ্জাজ বলেন, দেশের সব দুর্গম এলাকার বাস্তবতা এক নয়। কোনো কোনো বিদ্যালয় নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলে, আবার কোনোটি যোগাযোগব্যবস্থার দিক থেকে অত্যন্ত পিছিয়ে থাকা এলাকায় অবস্থিত।

তাই শুধু জেলার নাম বা ভৌগোলিক অবস্থানের ভিত্তিতে নয়, প্রতিটি বিদ্যালয়ের অবস্থান, যাতায়াতের দূরত্ব, যোগাযোগব্যবস্থা এবং দুর্গমতার মাত্রা বিবেচনা করেই বিশেষ ভাতার কাঠামো নির্ধারণ করা হবে।

কোন কোন এলাকা প্রকৃত অর্থে দুর্গম হিসেবে বিবেচিত হবে এবং সেখানে দায়িত্ব পালনকারী শিক্ষক ও কর্মকর্তারা কী ধরনের বিশেষ সুবিধা পাবেন, সেটিও নতুন করে নির্ধারণের প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান তিনি।

মাঠপর্যায়ের মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত

দুর্গম এলাকা চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতা ও মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

তিনি জানান, এ বিষয়ে কর্মশালায় বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। মাঠপর্যায়ের মতামত ও সুপারিশ লিখিতভাবে সংকলন করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। এসব সুপারিশের ভিত্তিতেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এর ফলে দুর্গম এলাকায় কর্মরত শিক্ষকদের বাস্তব সমস্যাগুলো বিবেচনায় নিয়ে একটি কার্যকর ভাতা কাঠামো তৈরির সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

প্রশাসনিক সংস্কারের ওপর গুরুত্ব

প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসনের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছেন ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেন, প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে দায়িত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং জবাবদিহি স্পষ্ট করতে হবে।

তার মতে, শুধু পদসোপান থাকলেই কার্যকর প্রশাসন গড়ে ওঠে না। প্রত্যেক কর্মকর্তাকে নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের পাশাপাশি পুরো ব্যবস্থার প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে হবে।

মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বাস্তব পরিস্থিতি বুঝে দ্রুত ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

তিনি বলেন, প্রশাসনের একটি স্তরের কাজ যেন অন্য স্তরের জন্য বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। বিভাগ থেকে শুরু করে বিদ্যালয় পর্যন্ত সমন্বিত কর্মশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

‘প্রশাসনিক সংস্কারের সুফল পৌঁছাতে হবে শ্রেণিকক্ষে’

প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসনের সব কার্যক্রমের চূড়ান্ত গন্তব্য বিদ্যালয় ও শ্রেণিকক্ষ—এ কথা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রশাসনিক সংস্কারের সুফল সরাসরি শিশুর শেখার পরিবেশে দৃশ্যমান হতে হবে।

শিক্ষকদের জন্য শুধু প্রশাসনিক নির্দেশনা নয়, তাদের কাজের পরিবেশ, দায়িত্ব পালনের বাস্তবতা এবং শিক্ষার্থীদের শেখার সুযোগ—সবকিছুকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

বিশেষ করে দুর্গম এলাকায় শিক্ষক সংকট ও নিয়মিত উপস্থিতির মতো বিষয়গুলো সমাধান করা গেলে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের ধারাবাহিকতা আরও ভালো হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

আগামী বছর ‘সায়েন্স টয়’ কার্যক্রম

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানমনস্ক করে তুলতে আগামী বছর থেকে পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে ‘সায়েন্স টয়’ কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন ববি হাজ্জাজ।

তিনি বলেন, খেলাধুলা ও হাতে-কলমে শেখার মাধ্যমে শিশুদের বিজ্ঞানমনস্কতা, সৃজনশীলতা এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা বিকাশে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

শিশুদের শুধু বইভিত্তিক শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও আনন্দের মাধ্যমে শেখার সুযোগ তৈরি করাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানান তিনি।

নতুন কারিকুলামে আটটি ক্রীড়া কার্যক্রম

শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের বিষয়টিও প্রাথমিক শিক্ষার নতুন কারিকুলামে গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রতিমন্ত্রী জানান, নতুন কারিকুলামে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করতে আটটি ক্রীড়া কার্যক্রম বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলায় অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়বে। শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক বিকাশ ও সামাজিক দক্ষতা তৈরিতেও এসব কার্যক্রম সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রক্সি শিক্ষক দিয়ে পাঠদান বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রক্সি শিক্ষক দিয়ে পাঠদান পরিচালনার প্রচলিত সংস্কৃতির বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।

তিনি বলেন, বিদ্যালয়ে শিক্ষক উপস্থিতি এবং শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করতে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দায়িত্বে অবহেলা বরদাশত করা হবে না।

শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে প্রত্যেক শিক্ষককে নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।

বিশ্বমানের প্রাথমিক শিক্ষা গড়ার লক্ষ্য

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, মানসম্মত ও বিশ্বমানের করে গড়ে তুলতে মাঠ প্রশাসনের দায়িত্ব ও কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হচ্ছে বলে জানান ববি হাজ্জাজ।

তিনি বলেন, আগামী দিনের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রতিটি শিক্ষার্থী যেন নৈতিক শিক্ষা, প্রয়োজনীয় দক্ষতা এবং ক্যারিয়ারমুখী জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পায়, সে লক্ষ্যেই সরকার কাজ করছে।

এ ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সংস্কার থেকে শুরু করে শিক্ষক উপস্থিতি, দুর্গম এলাকায় শিক্ষক ধরে রাখা, শিশুদের বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা এবং খেলাধুলার সুযোগ—সব বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

কর্মশালায় কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ

রংপুর জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী, পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ কামরুল হাসান এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব ইসরাত জাহান।

এ সময় প্রাথমিক শিক্ষা রংপুর বিভাগের বিভাগীয় উপপরিচালক, বিভাগের বিভিন্ন জেলার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার, সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার, পিটিআই সুপারিনটেনডেন্ট, ইউপিটিসি ইন্সট্রাক্টরসহ প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

দুর্গম এলাকার শিক্ষকদের বিশেষ ভাতা দেওয়ার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে চরাঞ্চল ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক ধরে রাখা এবং নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে প্রশাসনিক সংস্কার, নতুন শিক্ষণ পদ্ধতি ও শিশুদের খেলাধুলার সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

 

 


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/16111 ,   Print Date & Time: Monday, 31 August 2026, 06:04:52 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh