
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা শেষে বিলটি সংসদে প্রেরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রোববার (৩০ আগস্ট) জাতীয় সংসদ ভবনে কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীনের সভাপতিত্বে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের লক্ষ্যে প্রণীত বিলটি পরীক্ষাপূর্বক রিপোর্ট দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। বিস্তারিত পর্যালোচনার পর বিলটি সংসদে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় কমিটি।
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিল প্রণয়ন ও উত্থাপনের উদ্যোগ নেওয়ায় কমিটির পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে আন্তরিক ধন্যবাদ জানানো হয়।
বৈঠক থেকে দুই সদস্যের ওয়াকআউট
বৈঠকের একপর্যায়ে কমিটির সদস্য মো. নূরুল ইসলাম ও মো. আব্দুল বাতেন ওয়াকআউট করেন।
এ বিষয়ে কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন বলেন, কমিটির সদস্যদের কোনো সংশোধনী বা মতামত থাকলে তা সভায় উপস্থাপন করার সুযোগ রয়েছে। প্রয়োজন হলে পরামর্শ দেওয়া এবং কোনো বিষয়ে বিরোধিতা করার সুযোগও রয়েছে। এটিই কমিটির সদস্যদের দায়িত্ব।
তবে সভা থেকে ওয়াকআউট করা সংসদীয় রীতিনীতির মধ্যে পড়ে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, সংসদীয় কমিটির বৈঠকে মতপার্থক্য থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে তুলে ধরাই নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতি। সংশ্লিষ্ট সদস্যরা তাদের মতামত, সংশোধনী বা আপত্তি সভায় উপস্থাপন করতে পারেন।
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে কমিটির বক্তব্য
বৈঠকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়। সভায় উল্লেখ করা হয়, গত ছয় মাসে দেশে কোনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেনি।
একই সময়ে মব তৈরির চেষ্টা চললেও কোনো রাজনৈতিক নিপীড়নের ঘটনা ঘটেনি বলেও বৈঠকে উল্লেখ করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেনি বলেও সভায় জানানো হয়।
বৈঠকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রম, দেশে বিদ্যমান পরিস্থিতি এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
মিরাজ শেখের অপহরণ নিয়ে ‘ব্লেম গেম’ পরিহারের আহ্বান
বৈঠকে মিরাজ শেখের অপহরণের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। এ ঘটনায় সরকারের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে সভায় আলোচনা হয়।
এ ধরনের দোষারোপের রাজনীতি বা ‘ব্লেম গেম’ পরিহার করা উচিত বলে মত প্রকাশ করেন কমিটির সদস্যরা।
বৈঠকে এ ধরনের সংবেদনশীল ঘটনায় তদন্ত ও তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকৃত ঘটনা সামনে আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। কোনো ঘটনার দায় নির্ধারণের আগে সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন বলেও আলোচনায় গুরুত্ব পায়।
গুম প্রতিরোধে নতুন আইনি কাঠামো
‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ নিয়ে আলোচনা ছিল বৈঠকের অন্যতম প্রধান বিষয়। গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য প্রস্তাবিত এই বিলটি পরীক্ষাপূর্বক সংসদে পাঠানোর সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে কমিটি।
গুমের মতো গুরুতর অপরাধ প্রতিরোধের পাশাপাশি ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের অধিকার সুরক্ষা, অভিযোগের প্রতিকার এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষেত্রে একটি কার্যকর আইনি কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ।
বিলটি সংসদে প্রেরণের সিদ্ধান্তের ফলে পরবর্তী ধাপে জাতীয় সংসদে এটি নিয়ে আরও আলোচনা ও আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হলো।
বৈঠকে যারা উপস্থিত ছিলেন
বৈঠকে কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, জাতীয় সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলাম, জাতীয় সংসদের হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, শিরীন সুলতানা, মো. নূরুল ইসলাম এবং মো. আব্দুল বাতেন অংশগ্রহণ করেন।
এ ছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের সচিব, পুলিশ মহাপরিদর্শক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন অধিদপ্তরগুলোর মহাপরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রধান এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও বৈঠকে অংশ নেন।
সংসদে যাবে গুম প্রতিরোধ বিল
বৈঠকে আলোচনা ও সিদ্ধান্তের পর এখন ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ সংসদে প্রেরণের প্রক্রিয়া এগিয়ে যাবে। গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের লক্ষ্যে প্রস্তাবিত এই বিলটি সংসদীয় প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপে গেলে এর বিভিন্ন ধারা নিয়ে আরও আলোচনা ও পর্যালোচনার সুযোগ থাকবে।
একই সঙ্গে বৈঠকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং মিরাজ শেখের অপহরণ নিয়ে যে আলোচনা হয়েছে, তাতেও সরকারের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে কমিটির অবস্থান উঠে এসেছে।
সব মিলিয়ে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য নতুন আইনি কাঠামো তৈরির প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। বিলটি সংসদে পাঠানোর সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এর আইন প্রণয়নের পরবর্তী ধাপ শুরু হওয়ার পথ তৈরি হয়েছে।