• হোম > বাংলাদেশ > বাংলাদেশে তৈরি গাড়ির সিট কভার যাচ্ছে জাপানে

বাংলাদেশে তৈরি গাড়ির সিট কভার যাচ্ছে জাপানে

  • রবিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৬, ১৫:০৪
  • ২৪

---

 

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

বাংলাদেশে তৈরি গাড়ির সিটের ট্রিম কভার এখন রপ্তানি হচ্ছে জাপানে। দেশটির বিভিন্ন গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের জন্য এসব কভার তৈরি করছে জাপানি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান টিএস টেক বাংলাদেশ লিমিটেড। জাপানে পাঠানোর পর এসব কভার দিয়ে সম্পূর্ণ আসন তৈরি করা হয়। পরে হোন্ডা, সুজুকি, ইয়ামাহা ও কাওয়াসাকিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গাড়ি ও মোটরসাইকেলে এসব আসন সংযোজন করা হয়।

এতে বাংলাদেশের তৈরি পণ্য যেমন আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় জায়গা করে নিচ্ছে, তেমনি দেশের রপ্তানি খাতেও যুক্ত হচ্ছে নতুন ধরনের শিল্পপণ্য।

২০১৭ সালে বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু

আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) এলাকায় অবস্থিত টিএস টেক বাংলাদেশ লিমিটেড ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম শুরু করে। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ৪৬ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে।

প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে প্রায় ৩৭৫ জন কর্মী কাজ করছেন। তাদের বড় একটি অংশ নারী। মোট কর্মীর প্রায় ৬০ শতাংশই নারী হওয়ায় কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেপজা) কাছ থেকে ভাড়া নেওয়া ছয়তলা স্ট্যান্ডার্ড ফ্যাক্টরি বিল্ডিংয়ে চলছে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন কার্যক্রম।

গত অর্থবছরে টিএস টেক বাংলাদেশ ১ কোটি ৪৭ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। মূলত জাপানের গাড়ি ও মোটরসাইকেল নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আসনের ট্রিম কভার সরবরাহ করছে প্রতিষ্ঠানটি।

কীভাবে তৈরি হচ্ছে গাড়ির সিট কভার

কারখানাটির উৎপাদন এলাকায় কর্মীদের ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো। কোথাও চামড়া ও অন্যান্য উপকরণ নির্দিষ্ট নকশা অনুযায়ী কাটা হচ্ছে। আবার কোথাও কাটা অংশগুলো সেলাই করে তৈরি করা হচ্ছে আসনের বিভিন্ন অংশ।

নির্দিষ্ট নকশা ও মাপ অনুযায়ী চামড়া এবং অন্যান্য কাঁচামাল কাটার পর সেগুলো সেলাই করে একত্র করা হয়। এভাবেই তৈরি হয় গাড়ি ও মোটরসাইকেলের সিটের ট্রিম কভার।

প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামালের বড় অংশ জাপান ও চীন থেকে আমদানি করা হয়। বাংলাদেশে প্রাথমিক উৎপাদন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর তৈরি কভারগুলো পাঠানো হয় জাপানে টিএস টেকের বিভিন্ন কারখানায়।

সেখানে এসব কভার ব্যবহার করে সম্পূর্ণ আসন তৈরি করা হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সেই আসন সরবরাহ করা হয়।

হোন্ডা-সুজুকিসহ বড় ব্র্যান্ডের জন্য পণ্য

টিএস টেক বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাতোরু ওনিশি জানিয়েছেন, জাপানে প্রতিষ্ঠানটির বড় ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে হোন্ডা, ইয়ামাহা, সুজুকি ও কাওয়াসাকি।

তিনি জানান, বাংলাদেশে মূলত গাড়ি ও মোটরসাইকেলের আসনের ট্রিম কভার তৈরি করা হয়। পাশাপাশি দরজা ও ছাদের ট্রিমসহ প্লাস্টিকের বিভিন্ন যন্ত্রাংশও উৎপাদন করা হচ্ছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, কাঁচামাল কাটা ও সেলাইয়ের কাজ প্রধানত বাংলাদেশের কারখানায় সম্পন্ন হয়। এরপর সেগুলো জাপানে পাঠানো হয়। সেখানে সম্পূর্ণ আসন তৈরি করে তা গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সরবরাহ করা হয়।

বর্তমানে বাংলাদেশের কারখানাটিতে বছরে প্রায় ২ লাখ ৬ হাজার সিটের ট্রিম কভার উৎপাদন হচ্ছে। আগামী বছরও প্রায় একই মাত্রায় উৎপাদন ধরে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।

উৎপাদনে বাড়ছে অটোমেশনের ব্যবহার

বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরুর পর ধীরে ধীরে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে টিএস টেক। উৎপাদনশীলতা বাড়াতে প্রতিষ্ঠানটি এখন অটোমেশনের ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

২০২৩ সালের আগস্টে উৎপাদন ব্যবস্থা আধুনিকায়নে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মধ্যে কনভেয়ার বেল্ট, বিভিন্ন অটোমেশন ব্যবস্থা এবং অটো-লে মেশিন স্থাপনের মতো পদক্ষেপ ছিল।

শুধু বিদেশ থেকে আধুনিক যন্ত্রপাতি এনে ব্যবহার নয়, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় বিভিন্ন জিগ ও সহায়ক সরঞ্জামও কারখানায় তৈরি করা হচ্ছে। এর কিছু সরঞ্জামের নকশা ও তৈরিতে থ্রিডি প্রিন্টিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।

টিএস টেক বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাতোরু ওনিশি বলেন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অটোমেশনের ওপর প্রতিষ্ঠানটি ক্রমেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। কারখানার নিজস্ব উৎপাদনকাজেও থ্রিডি প্রিন্টিংয়ের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।

বিশ্বজুড়ে টিএস টেকের কার্যক্রম

টিএস টেক শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বজুড়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রতিষ্ঠানটির বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ১৩টি প্রতিষ্ঠানের অধীনে মোট ৭৩টি কারখানা রয়েছে।

এসব প্রতিষ্ঠানে মোট প্রায় ১ লাখ ৪১ হাজার কর্মী কাজ করছেন। এর মধ্যে শুধু জাপানেই কর্মরত রয়েছেন প্রায় ১৬ হাজার কর্মী।

জাপানের বাজারে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি জাপানের বাইরেও আন্তর্জাতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ব্যবসা করছে টিএস টেক।

বাংলাদেশের কারখানাটি সেই বৈশ্বিক উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থারই একটি অংশ হিসেবে কাজ করছে। ফলে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি বাংলাদেশি কারখানার উৎপাদিত পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে।

নারী কর্মীদের জন্য ডে-কেয়ার সুবিধা

শুধু উৎপাদন ও রপ্তানির দিকেই নয়, কর্মীদের কল্যাণেও বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে টিএস টেক বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠানের মোট কর্মীর প্রায় ৬০ শতাংশ নারী হওয়ায় কর্মজীবী মায়েদের সহায়তায় ২০২৫ সালে কারখানার ভেতরেই চালু করা হয়েছে একটি ডে-কেয়ার সেন্টার।

বর্তমানে সেখানে পাঁচজন শিশুসেবিকার তত্ত্বাবধানে ১৯টি শিশু রয়েছে। কর্মীরা কাজ করার সময় তাদের সন্তানদের এই কেন্দ্রে নিরাপদ পরিবেশে রাখার সুযোগ পাচ্ছেন।

প্রতিষ্ঠানটির জাপানি ভাষার দোভাষী আসমার সন্তানও এই ডে-কেয়ার সেন্টারে থাকে। তিনি বলেন, এই সুবিধা তার জন্য খুবই সহায়ক। সন্তানকে ডে-কেয়ারে রেখে নিশ্চিন্তে কাজে মনোযোগ দিতে পারছেন তিনি।

গর্ভবতী কর্মীদের বিশেষ যত্ন

গর্ভবতী কর্মীদের জন্যও বিশেষ ব্যবস্থা রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি। তাদের সহজে শনাক্ত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দেওয়ার জন্য সবুজ রিবন ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

একজন গর্ভবতী কর্মী জানান, কর্মস্থলে গর্ভবতী নারীদের বিশেষ যত্ন নেওয়া হয়।

কর্মক্ষেত্রে নারী শ্রমিকদের অংশগ্রহণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সন্তান দেখাশোনা ও মাতৃত্বকালীন সময়ে কর্মীদের সহায়তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। টিএস টেক বাংলাদেশের ডে-কেয়ার সেন্টার ও গর্ভবতী কর্মীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থাগুলো সেই প্রয়োজন পূরণে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে নতুন সম্ভাবনা

বাংলাদেশের রপ্তানি খাত দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাকনির্ভর হলেও এর বাইরে নতুন নতুন শিল্পপণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করছে। জাপানি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য গাড়ি ও মোটরসাইকেলের সিটের ট্রিম কভার তৈরি ও রপ্তানি সেই বৈচিত্র্যেরই একটি উদাহরণ।

টিএস টেক বাংলাদেশের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি জাপানের বাজারে যাচ্ছে এবং সেখানে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন গাড়ি ও মোটরসাইকেলের সম্পূর্ণ আসন। একই সঙ্গে কারখানায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, অটোমেশন এবং নারী কর্মীদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরির উদ্যোগও বাংলাদেশের শিল্প খাতে নতুন সম্ভাবনার দিকটি তুলে ধরছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি উৎপাদন সক্ষমতা আরও বিস্তৃত করতে এ ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে জাপানের মতো উন্নত ও মাননির্ভর বাজারে বাংলাদেশে উৎপাদিত গাড়ির উপকরণ রপ্তানি দেশের শিল্প ও রপ্তানি খাতে ভবিষ্যতে আরও সম্ভাবনার পথ তৈরি করতে পারে।

 

 


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/16094 ,   Print Date & Time: Monday, 31 August 2026, 06:05:05 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh