• হোম > রাজনীতি > আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে বিচার ও জবাবদিহিতার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে বিচার ও জবাবদিহিতার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

  • রবিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৬, ১২:৪১
  • ১৩

---

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে গুমের শিকার ব্যক্তি এবং তাদের পরিবারের প্রতি গভীর সহানুভূতি ও সহমর্মিতা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিচার এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বিশ্বজুড়ে ঐক্য ও সংহতি গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্র বা সরকার কর্তৃক সংঘটিত গুমের বিরুদ্ধে বিশ্ববিবেককে জাগ্রত রাখতে বিশ্বজুড়ে এ দিবস পালন করা হচ্ছে। এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য—‘ভিক্টিমস ফার্স্ট, অ্যাকশন্স নাউ’; অর্থাৎ আগে ভুক্তভোগীদের গুরুত্ব দিতে হবে এবং এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের নিকৃষ্টতম অপরাধগুলোর মধ্যে গুম বা এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স অন্যতম ভয়ংকর অপরাধ। এটি শুধু কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়; বরং একটি বৈশ্বিক সমস্যা এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। বিশেষ করে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে এ ধরনের অমানবিক ঘটনা বেশি ঘটতে দেখা যায়।

তিনি বলেন, গুমের মাধ্যমে শুধু একজন মানুষকে সমাজ ও পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয় না, বরং ভয়, অনিশ্চয়তা এবং আতঙ্কের একটি দীর্ঘস্থায়ী পরিবেশ তৈরি করা হয়। একজন ব্যক্তি হঠাৎ করে নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবার দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এবং কখনো বছরের পর বছর অপেক্ষা করে। সেই অপেক্ষার শেষ কোথায়, প্রিয়জন বেঁচে আছেন নাকি আর কখনো ফিরবেন না—এ প্রশ্নের উত্তর না পাওয়ার যন্ত্রণা একটি পরিবারের জন্য গভীরতম মানসিক নির্যাতনে পরিণত হয়।

বাংলাদেশের বিগত সরকারের বিরুদ্ধে গুম ও অপহরণের অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকার দমন করতে গুম-অপহরণের পথ বেছে নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। গুমের শিকার ব্যক্তিদের মাসের পর মাস কিংবা বছরের পর বছর আটকে রাখার জন্য গোপন বন্দিশালা তৈরি করা হয়েছিল, যা জনপরিসরে ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিতি পায়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ব্যবহার করে বিভিন্ন সময়ে কমপক্ষে সাত শতাধিক মানুষকে গুম করা হয়েছে। এসব অভিযোগ ও ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে বর্তমান সরকার প্রতিটি গুমের ঘটনা তদন্ত করে বিচার কার্যক্রম শুরু করেছে বলেও তিনি জানান।

তিনি বলেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শুধু অতীতের ঘটনার তদন্ত করলেই যথেষ্ট নয়; ভবিষ্যতে যাতে রাষ্ট্রীয় বা অন্য কোনো শক্তি গুমকে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে, সে জন্য শক্তিশালী আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

এ লক্ষ্যে ভবিষ্যতে গুম বা এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স বন্ধে পৃথক আইনি কাঠামো প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ এবং ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করা হয়েছে।

গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সীমাহীন দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, গুম কিংবা অপহরণ শুধু একজন ব্যক্তির হারিয়ে যাওয়া নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের স্বপ্ন, সাধ, আশা এবং আকাঙ্ক্ষা। পরিবারের সদস্যদের প্রতিটি দিন কাটে অনিশ্চয়তার মধ্যে। প্রিয়জনের জন্য অপেক্ষা করতে করতে তারা এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হন, যেখানে স্বাভাবিকভাবে শোক প্রকাশ বা শোক পালনের সুযোগও থাকে না।

এই অনিশ্চয়তার যন্ত্রণাকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গুমের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কষ্ট শুধু আইনি নথি বা পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। একজন সন্তান তার বাবার অপেক্ষায় থাকে, একজন মা তার সন্তানের ফিরে আসার আশায় দিন গোনেন, একজন স্ত্রী কিংবা স্বামী প্রিয়জনের কোনো খবর পাওয়ার প্রত্যাশায় বছরের পর বছর কাটিয়ে দেন। এই দীর্ঘ অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটাতে সত্য উদঘাটন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট চক্রের পতনের পর সৌভাগ্যবান কিছু মানুষ ফিরে এসেছেন। তবে এখনও অসংখ্য মানুষের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

তিনি বিশেষভাবে ইলিয়াস আলী ও চৌধুরী আলমের মতো নিখোঁজ ব্যক্তিদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, তাদের মতো বহু মানুষের পরিবারের কাছে এখনও কোনো নিশ্চিত উত্তর পৌঁছায়নি। প্রিয়জনের সন্ধানের অপেক্ষা আজও শেষ হয়নি। এসব পরিবারের বেদনা এবং দীর্ঘদিনের প্রশ্নের জবাব খুঁজে বের করা রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক ও নৈতিক দায়িত্ব।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, গুমের ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্যও গুরুতর হুমকি। যখন কোনো নাগরিককে আইনের বাইরে নিয়ে গিয়ে গোপনে আটক রাখা হয় এবং তার অবস্থান বা পরিণতি সম্পর্কে পরিবারকে অন্ধকারে রাখা হয়, তখন তা সমাজে ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।

তিনি আন্তর্জাতিক আইনের কথাও উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আইসিসির রোম সনদের ৭(২) অনুচ্ছেদে গুমকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা এবং দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আহ্বান, গুমের মতো ভয়াবহ অপরাধের বিরুদ্ধে বিশ্ববাসীকে আরও সোচ্চার হতে হবে। ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারকে কেন্দ্র করে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং অপরাধীদের রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক বা অন্য কোনো ধরনের প্রভাবের ঊর্ধ্বে রেখে আইনের আওতায় আনতে হবে।

তার মতে, গুমের সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হলে শুধু শাস্তি নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সত্য উদঘাটন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি সহমর্মিতা, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং এমন শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, যাতে ভবিষ্যতে কোনো নাগরিককে আর জোরপূর্বক গুমের শিকার হতে না হয়।

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের এই বার্তায় প্রধানমন্ত্রী তাই একদিকে অতীতের গুমের ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, মানবিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/16088 ,   Print Date & Time: Sunday, 30 August 2026, 09:22:08 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh