
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
নিরীক্ষা কাজে অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তিন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টকে (সিএ) সংবিধিবদ্ধ বা স্ট্যাটিউটরি অডিট কার্যক্রম থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি)। একই সঙ্গে তিনজনের ওপর মোট ১৯ লাখ টাকা জরিমানাও আরোপ করা হয়েছে।
আইসিএবির তদন্ত ও শৃঙ্খলা কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের ১৬ জুন অনুষ্ঠিত আইসিএবির কাউন্সিল সভায় শাস্তির বিষয়টি অনুমোদন করা হয়। পরবর্তীতে গত ৬ জুলাই থেকে সিদ্ধান্তটি কার্যকর হয়েছে।
আইসিএবির এই পদক্ষেপকে নিরীক্ষা পেশায় পেশাগত শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষায় নিরীক্ষকদের দায়িত্ব ও পেশাগত সততা নিয়ে যখন গুরুত্ব বাড়ছে, তখন অনিয়মের অভিযোগে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে এমন শাস্তি তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তিন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের শাস্তি
আইসিএবির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এম আই চৌধুরী অ্যান্ড কোং-এর পার্টনার সলিম উল্লাহ বাহাদুরকে ১৮ মাসের জন্য সংবিধিবদ্ধ অডিট কাজ থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাকে ৯ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
অন্যদিকে মাহমুদ সবুজ অ্যান্ড কোং-এর পার্টনার মো. কামরুল হাসানকে ১২ মাসের জন্য সংবিধিবদ্ধ অডিট কার্যক্রম থেকে বরখাস্ত এবং ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
কে এম হাসান অ্যান্ড কোং-এর পার্টনার মো. ফরহাদ হোসাইন সুমনকেও ১২ মাসের জন্য অডিট কার্যক্রম থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তার ওপরও ৫ লাখ টাকা জরিমানা আরোপ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে তিন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের ওপর আরোপিত জরিমানার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৯ লাখ টাকা।
জরিমানা না দিলে বাড়বে বরখাস্তের মেয়াদ
আইসিএবির নির্দেশনায় জরিমানার অর্থ পরিশোধের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। তিন মাসের মধ্যে জরিমানার টাকা পরিশোধ না করলে তাদের বরখাস্তের মেয়াদ আরও তিন মাস বাড়ানো হবে।
এরপরও যদি জরিমানার অর্থ পরিশোধ করা না হয়, তাহলে সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধ না করা পর্যন্ত বরখাস্তের আদেশ বহাল থাকবে বলে আইসিএবির সিদ্ধান্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ শুধু নির্ধারিত সময়ের জন্য অডিট কার্যক্রম থেকে বিরত রাখাই নয়, জরিমানা পরিশোধের বিষয়টিকেও শাস্তির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে।
তালিকাভুক্ত কোম্পানির অডিটে প্রভাব
আইসিএবির শাস্তির কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পেশাগত কার্যক্রমেও সরাসরি প্রভাব পড়বে। এম আই চৌধুরী অ্যান্ড কোং এবং মাহমুদ সবুজ অ্যান্ড কোং তাদের সংশ্লিষ্ট পার্টনারসহ তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সংবিধিবদ্ধ নিরীক্ষা পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নিরীক্ষক প্যানেলে তালিকাভুক্ত রয়েছে।
কে এম হাসান অ্যান্ড কোং-ও বিএসইসির নিরীক্ষক প্যানেলে তালিকাভুক্ত। তবে এই প্রতিষ্ঠানের পার্টনার মো. ফরহাদ হোসাইন সুমন ব্যক্তিগতভাবে বিএসইসির প্যানেলভুক্ত নন।
বিএসইসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আইসিএবির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বরখাস্তের মেয়াদকালে সংশ্লিষ্ট পার্টনাররা কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংবিধিবদ্ধ অডিট প্রতিবেদন তৈরি করতে পারবেন না।
ফলে শাস্তিপ্রাপ্ত তিন সিএর জন্য শুধু ব্যক্তিগতভাবে অডিট কার্যক্রম পরিচালনার ওপরই নিষেধাজ্ঞা আসছে না; তালিকাভুক্ত কোম্পানির নিরীক্ষা কাজের ক্ষেত্রেও এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে।
নিরীক্ষা পেশায় জবাবদিহির গুরুত্ব
একটি কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, আয়-ব্যয়, সম্পদ ও দায় সম্পর্কে বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সংবিধিবদ্ধ অডিট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নিরীক্ষকের দেওয়া প্রতিবেদনকে ভিত্তি করে বিনিয়োগকারী, ঋণদাতা, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও অন্যান্য অংশীজন বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন।
এ কারণে নিরীক্ষা কাজে পেশাগত মান, নিরপেক্ষতা ও সততা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো নিরীক্ষকের বিরুদ্ধে অসদাচরণ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে পেশাগত শৃঙ্খলা বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়।
আইসিএবির সর্বশেষ সিদ্ধান্তেও তদন্ত ও শৃঙ্খলা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তিন সিএর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে নিরীক্ষা পেশায় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের আরও সতর্ক ও জবাবদিহিমূলক ভূমিকা পালনের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
আইসিএবির কাউন্সিলের অনুমোদনের পর গত ৬ জুলাই থেকে তিন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের ওপর আরোপিত বরখাস্তের সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জরিমানা পরিশোধ না করলে তাদের ওপর অতিরিক্ত শাস্তিও কার্যকর হবে।
তালিকাভুক্ত কোম্পানির নিরীক্ষা কার্যক্রমে শাস্তিপ্রাপ্ত পার্টনারদের অংশগ্রহণের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় সংশ্লিষ্ট অডিট প্রতিষ্ঠানগুলোকেও তাদের ভবিষ্যৎ নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।