• হোম > অর্থনীতি > রেমিট্যান্স প্রণোদনায় ব্যাংকের বকেয়া ৮,৫৬৫ কোটি

রেমিট্যান্স প্রণোদনায় ব্যাংকের বকেয়া ৮,৫৬৫ কোটি

  • রবিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৬, ১১:৫৮
  • ২২

---

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের ওপর সরকারি নগদ প্রণোদনার অর্থ সময়মতো ফেরত না পাওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। বর্তমানে ব্যাংকগুলোর কাছে সরকারের বকেয়া প্রণোদনার পরিমাণ ৮ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকারও বেশি। নিজেদের আমানত থেকে এই অর্থ পরিশোধ করতে গিয়ে ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট আরও তীব্র হচ্ছে এবং মুনাফায়ও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

সরকারি নীতি অনুযায়ী, দেশে আসা রেমিট্যান্সের বিপরীতে প্রবাসীদের ২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে নগদ প্রণোদনা দেয় সংশ্লিষ্ট ব্যাংক। অর্থ মন্ত্রণালয়ের হয়ে ব্যাংকগুলো এই অর্থ পরিশোধ করে থাকে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে সরকারের কাছ থেকে সেই অর্থ ব্যাংকগুলোর ফেরত পাওয়ার কথা।

কিন্তু রেমিট্যান্সের প্রবাহ দ্রুত বেড়ে যাওয়া, টাকার অবমূল্যায়ন এবং সরকারের অর্থ ছাড়ে দীর্ঘসূত্রতার কারণে ব্যাংকগুলোর এই অর্থ ফেরত পাওয়ার সময় ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। ফলে প্রবাসীদের প্রণোদনা দিতে ব্যাংকগুলোকে নিজেদের আমানতের অর্থ ব্যবহার করতে হচ্ছে।

বকেয়া ছাড়িয়েছে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা

প্রাপ্ত নথি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনের শেষে ব্যাংকগুলোর প্রণোদনা বাবদ বকেয়া দাবির পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা। পরে গত ২ আগস্ট ৫০০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়।

এর পরও জুলাই মাসের নতুন ৮৭৯ কোটি টাকার দাবি যুক্ত হওয়ায় বর্তমানে ব্যাংকগুলোর মোট বকেয়া দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা।

অর্থাৎ ব্যাংকগুলো নিজেদের অর্থে রেমিট্যান্স প্রণোদনা দেওয়ার পরও দীর্ঘ সময় ধরে সরকারের কাছ থেকে সেই অর্থ ফেরত পাচ্ছে না।

সবচেয়ে বেশি বকেয়া ইসলামী ব্যাংকের

ব্যাংকভেদে বকেয়ার পরিমাণেও বড় পার্থক্য রয়েছে। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি বকেয়া দাবি রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের, যার পরিমাণ ১ হাজার ৫১৩ কোটি টাকা।

এরপর রয়েছে—

  • ব্র্যাক ব্যাংক: ৮৫০ কোটি টাকা
  • সিটি ব্যাংক: ৩৩৫ কোটি টাকা
  • ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি: ২৫০ কোটি টাকা
  • পুবালী ব্যাংক: ২৫০ কোটি টাকা
  • সাউথইস্ট ব্যাংক: ১৭০ কোটি টাকা

ব্যাংকাররা বলছেন, প্রায় দুই বছর ধরে এ ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদের। নিজেদের আমানত থেকে প্রণোদনার অর্থ পরিশোধ করায় ব্যাংকগুলোর অর্থ ব্যবহারের সুযোগ কমে যাচ্ছে।

আমানতের অর্থ আটকে থাকায় সুযোগ হারাচ্ছে ব্যাংক

ব্যাংকারদের মতে, প্রণোদনা বাবদ অর্থ সরকারের কাছ থেকে সময়মতো ফেরত না আসায় ব্যাংকগুলো বড় ধরনের ‘অপোরচুনিটি কস্ট’-এর মুখে পড়ছে।

ব্যাংকগুলো যদি এই অর্থ নিজেদের কাছে ধরে রাখতে পারত, তাহলে তা ট্রেজারি বিল ও সরকারি বন্ডের মতো তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগে ব্যবহার করে প্রায় ৯ শতাংশ বা তার বেশি হারে আয় করতে পারত।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, সরকারের কাছ থেকে অর্থ ফেরত পেতে দেরি হওয়ায় ব্যাংকগুলোকে বড় ধরনের সুযোগ ব্যয় বহন করতে হচ্ছে।

তার মতে, ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের আমানত থেকে প্রণোদনার অর্থ পরিশোধ করছে। এসব আমানতের পেছনে ব্যাংকগুলোর বছরে প্রায় ৭ থেকে ৮ শতাংশ খরচ রয়েছে। কিন্তু ওই অর্থ বিনিয়োগ করতে না পারায় সম্ভাব্য ৯ শতাংশ বা তার বেশি আয় থেকেও ব্যাংকগুলো বঞ্চিত হচ্ছে।

তারল্যের ওপর ত্রিমুখী চাপ

সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মাসরুর আরেফিনের মতে, রেমিট্যান্স প্রণোদনার বকেয়া ব্যাংকগুলোর ওপর একসঙ্গে কয়েক ধরনের চাপ তৈরি করছে।

প্রথমত, ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার মতো ব্যবহারযোগ্য তারল্য কমে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, আটকে থাকা অর্থ থেকে কোনো আয় না এলেও আমানতকারীদের অর্থের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে সুদ দিতে হচ্ছে। তৃতীয়ত, আয় বাড়াতে পারে এমন বিভিন্ন সম্পদে বিনিয়োগের সুযোগও হারাচ্ছে ব্যাংকগুলো।

তিনি বলেন, সরকারের বাজেট ও নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনায় চাপ রয়েছে। প্রত্যাশার তুলনায় রেমিট্যান্স দ্রুত বাড়ায় প্রণোদনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণও বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুযায়ী বাজেট বরাদ্দ ও অর্থ ছাড় বাড়েনি।

রেমিট্যান্স বাড়লেও বাড়ছে প্রণোদনার দায়

২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছে। রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রবাসীদের দেওয়া সরকারি প্রণোদনার মোট অর্থের পরিমাণও বেড়েছে।

এর পাশাপাশি টাকার অবমূল্যায়নের কারণে প্রতি ডলারে প্রণোদনা দেওয়ার টাকার অঙ্কও বেড়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টের আগে রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ১১৭ টাকা এবং ব্যাংকগুলো প্রতি ডলারে প্রায় ২ দশমিক ৯৫ টাকা অতিরিক্ত প্রণোদনা দিত।

বর্তমানে রেমিট্যান্সের বিনিময় হার বেড়ে প্রায় ১২৩ টাকা হওয়ায় ব্যাংকগুলোকে প্রতি ডলারে প্রায় ৩ টাকা করে প্রণোদনা দিতে হচ্ছে।

ফলে রেমিট্যান্সের পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি টাকার হিসাবে প্রণোদনার দায়ও বেড়েছে।

সরকারের অর্থ ছাড়ের ওপর নির্ভর করছে সমাধান

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ পাওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা দ্রুত ব্যাংকগুলোর মধ্যে বিতরণ করে। ফলে প্রণোদনার অর্থ ছাড়ের সময়সূচি মূলত সরকারের অর্থ ছাড়ের ওপরই নির্ভর করছে।

ব্যাংকারদের বক্তব্য, আগে ব্যাংকগুলোকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অগ্রিম প্রণোদনার অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। সেটি পুনরায় চালু করা গেলে ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ অনেকটাই কমতে পারে।

সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন ব্যাংকগুলোকে অন্তত তিন মাসের অগ্রিম প্রণোদনা তহবিল দেওয়ার ব্যবস্থা পুনরায় চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন। পাশাপাশি প্রতি মাসে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যাংকগুলোর দাবি নিষ্পত্তি, রেমিট্যান্স প্রবাহের ভিত্তিতে বাজেটে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ এবং নির্ধারিত সময়ের বেশি বিলম্ব হলে ব্যাংকগুলোকে তাদের তহবিল ব্যবহারের খরচ অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

হুন্ডির ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা

রেমিট্যান্স প্রণোদনার অর্থ পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা শুধু ব্যাংকের মুনাফা ও তারল্যের জন্যই সমস্যা নয়; এর প্রভাব দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যাংকাররা।

তাদের মতে, ব্যাংকগুলো যদি রেমিট্যান্স সংগ্রহে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, তাহলে বিদেশি এক্সচেঞ্জ হাউস ও মানি ট্রান্সফার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক বজায় রাখা এবং নতুন গ্রাহক আকর্ষণে বিনিয়োগ কমে যেতে পারে।

বিশেষ করে ছোট ও তারল্য সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোর ওপর এই চাপ তুলনামূলক বেশি পড়বে।

দীর্ঘদিন সরকারি পাওনা আটকে থাকলে ব্যাংকগুলোর সম্পদ-দায় ব্যবস্থাপনাতেও চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রবাসীদের আগ্রহ কমে গিয়ে অনানুষ্ঠানিক বা অবৈধ ‘হুন্ডি’ ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকে পড়ার আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে।

দ্রুত সমাধান চান ব্যাংকাররা

ব্যাংকারদের মতে, রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজার, চলতি হিসাবের ভারসাম্য এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই রেমিট্যান্স সংগ্রহে ব্যাংকগুলোর আগ্রহ ধরে রাখা জরুরি।

মাসরুর আরেফিন জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ব্যাংকগুলোর উদ্বেগের বিষয়টি স্বীকার করেছেন এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে বকেয়া অর্থ পরিশোধে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

ব্যাংকারদের প্রত্যাশা, দ্রুত বকেয়া পরিশোধের পাশাপাশি ভবিষ্যতে প্রণোদনার অর্থ ছাড়ের জন্য একটি নির্দিষ্ট ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু করা হবে। এতে ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থাপনা সহজ হবে এবং রেমিট্যান্স সংগ্রহে ব্যাংকগুলোর আগ্রহও বজায় থাকবে।

অন্যথায় সরকারি প্রণোদনার অর্থ পরিশোধে দীর্ঘ বিলম্ব ব্যাংকিং খাতে চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা ও রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/16068 ,   Print Date & Time: Sunday, 30 August 2026, 08:34:29 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh