
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
অভিনেত্রী তানজিন নাহার তিশার বিরুদ্ধে শাড়ি ফেরত না দেওয়া, প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ ও হুমকির অভিযোগে দায়ের করা মামলায় চাঞ্চল্যকর মোড় এসেছে। মামলাটির তদন্ত শেষে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) জানিয়েছে, তদন্তে তিশার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর সত্যতা পাওয়া যায়নি।
সম্প্রতি ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পিবিআই। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাদী ও আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে তানজিন তিশা যে শাড়িটি নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত হয়েছিল, সেটিও পরবর্তীতে ফেরত দিয়েছেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
তবে তদন্ত সংস্থার এই প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট নন মামলার বাদী ফ্যাশন ডিজাইনার আয়েশাহ আনুম ফায়যাহ সানায়া। তার অভিযোগ, মামলার তদন্তের সময় হুমকির অডিও রেকর্ডিং, সাক্ষীসহ বিভিন্ন প্রমাণ তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেওয়া হলেও সেগুলো যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। এ কারণে তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আদালতে নারাজি আবেদন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
যেভাবে শুরু হয় বিরোধ
মামলার নথি ও তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালতে তানজিন তিশার বিরুদ্ধে প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ ও হুমকির অভিযোগে মামলা করেন আয়েশাহ আনুম ফায়যাহ সানায়া। আদালতের নির্দেশে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই।
বাদীর দাবি, ২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর একটি অনুষ্ঠানে পরার জন্য তানজিন তিশা তার সাবেক ড্রাইভারের মাধ্যমে তার কাছ থেকে একটি শাড়ি নেন। শাড়িটির মূল্য প্রায় ৭৫ হাজার টাকা বলে দাবি করেন বাদী। অনুষ্ঠান শেষে পরদিন শাড়িটি ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও তা আর ফেরত দেওয়া হয়নি বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়।
শাড়িটি ফেরত পাওয়ার জন্য ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর তিশাকে ফেসবুক মেসেঞ্জারে বার্তা পাঠান বাদী। তবে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উভয়ের মেসেঞ্জারের স্ক্রিনশট পর্যালোচনা করে তদন্ত কর্মকর্তা দেখতে পান, তিশা ওই বার্তাগুলো দেখেননি। তিশা নিয়মিত মেসেঞ্জার ব্যবহার করতেন না এবং ব্যস্ততার কারণে বার্তাগুলো তার নজরে আসেনি বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপরও দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ ছিল না। ২০২৫ সালের ১৪ এপ্রিল বাদী তিশাকে পহেলা বৈশাখের শুভেচ্ছা জানান। একই বছরের ১৮ মে একটি অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানেও তাদের দেখা ও কুশল বিনিময় হয়।
পরবর্তীতে ফ্যাশন হাউজের ট্রায়াল রুম ও ব্যক্তিগত বিষয়সহ বিভিন্ন প্রসঙ্গে তাদের মধ্যে আলোচনা ও মনোমালিন্য তৈরি হয় বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এক বছর পর শাড়ি ফেরতের দাবি
২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর বাদী আবার তানজিন তিশাকে মেসেঞ্জারে বার্তা পাঠিয়ে শাড়িটি ফেরত দেওয়ার অনুরোধ করেন। সেখানে তিনি প্রায় এক বছর ধরে শাড়িটি ফেরত না পাওয়ার কথা উল্লেখ করেন এবং লোক পাঠিয়ে শাড়িটি ফেরত দেওয়ার অনুরোধ জানান।
জবাবে তিশা শাড়িটির বিষয়ে জানতে চান। পরে বাদী শাড়িটির ছবি পাঠান। তিশা তাকে মেসেঞ্জারে কল করলেও বাদী সেই কল গ্রহণ করতে পারেননি। পরবর্তী কথোপকথনে তিশা জানান, তিনি শাড়িটির বিষয়টি মনে করতে পারছেন না এবং খুঁজে দেখে বিষয়টি জানাবেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিশা জানান, তার সাবেক ড্রাইভারের শাড়িটি ফেরত দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ওই ড্রাইভার শাড়িটি ফেরত না দিয়ে চাকরি ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। এ বিষয়টি নিয়ে তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটিও হয়।
এরপর ৭ নভেম্বর বাদী তিশাকে আবার মেসেঞ্জারে বার্তা পাঠিয়ে আগের কথোপকথন দেখতে এবং শাড়িটি ফেরত দিতে বলেন। একই সঙ্গে তাকে হুমকি দেওয়ার প্রয়োজন নেই বলেও উল্লেখ করেন।
১০ নভেম্বর তিশা জবাব দিয়ে ব্যক্তিগত সমস্যা ও পেশাগত বিষয় আলাদা রাখার অনুরোধ করেন। তাদের একসময় ভালো সম্পর্ক ছিল উল্লেখ করে তিনি জানান, শাড়ি ফেরত দেওয়ার বিষয়ে তার লোকজন ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নিয়েছে এবং বাদীপক্ষ যেন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে।
থানায় জিডি, পরে মামলা
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১২ নভেম্বর বাদী গুলশান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। পরে বিষয়টি জানতে পেরে তানজিন তিশা পুলিশের মাধ্যমে শাড়িটি ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেন। তবে বাদী সেটি গ্রহণ না করে পরবর্তীতে মামলা করেন।
পিবিআইয়ের তদন্তে তানজিন তিশাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তার কাছে তিশা জানান, বাদীর সঙ্গে একসময় তার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। এর আগে বাদীর কাছ থেকে আরও শাড়ি নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পরেছেন এবং সেগুলো ফেরতও দিয়েছেন বলে জানান তিনি। এসব শাড়ির জন্য তিনি কোনো অর্থ নেননি বলেও তদন্ত কর্মকর্তাকে জানান।
তিশার ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন বিষয়টি নিয়ে কোনো কথা না হওয়ায় তিনি শাড়িটির কথা ভুলে গিয়েছিলেন। তার সাবেক ড্রাইভার শাড়িটি ফেরত না দিয়ে চাকরি ছেড়ে চলে যাওয়ায় বিষয়টি জটিল হয়। পরে বিভিন্ন মাধ্যমে বাদীর ঠিকানা জানার চেষ্টা করেও তা পাওয়া যায়নি বলে তদন্তে তার বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে।
ডাকযোগে শাড়ি ফেরত
মামলার বিষয়টি জানার পর তানজিন তিশা ডাকযোগে শাড়িটি ফেরত পাঠান। নথি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ তিনি শাড়িটি ডাকযোগে ফেরত পাঠান।
পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাদীকে নোটিশ দিয়ে এবং তদন্তের সময় সরাসরি ও মোবাইল ফোনে মামলার অভিযোগের পক্ষে দালিলিক সাক্ষ্য-প্রমাণ দিতে বলা হয়েছিল। তবে তদন্ত কর্মকর্তার মতে, বাদীপক্ষ অভিযোগের সমর্থনে প্রয়োজনীয় দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি।
অন্যদিকে তিশা শাড়িটি ফেরত পাঠিয়েছেন। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে শাড়ি নিয়ে প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে মত দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা।
হুমকির অভিযোগও প্রমাণিত হয়নি
মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ ছিল তানজিন তিশার বিরুদ্ধে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ। এ বিষয়েও পিবিআই তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পায়নি।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর তিশার পাঠানো মেসেজের শেষাংশে শাড়িটি ফেরত দেওয়ার ঠিকানা জানতে চাওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে বাদীর সুন্দর জীবন কামনা করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তার মতে, ওই বার্তার মাধ্যমে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।
সবশেষে পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাদী ও বিবাদীকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং তদন্তে পাওয়া সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে মামলায় আনা অভিযোগের বিষয়ে কোনো অপরাধ প্রমাণিত হয়নি।
নারাজি দেবে বাদীপক্ষ
তবে পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে একমত নন মামলার বাদী আয়েশাহ আনুম ফায়যাহ সানায়া। তার দাবি, তদন্তের সময় হুমকির অডিও রেকর্ডিংসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন প্রমাণ তদন্ত কর্মকর্তাকে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেগুলো যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি।
বাদী বলেন, তিনি তদন্ত কর্মকর্তার কাছে সাক্ষী ও অডিও রেকর্ডিংসহ বিভিন্ন প্রমাণ দিয়েছেন। অথচ কোনো কারণ উল্লেখ না করেই অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। এতে তিনি ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে দাবি করেন।
বাদীপক্ষের আইনজীবী শুভ্র সিনহা রায় জানিয়েছেন, আগামী ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেফাতউল্লাহর আদালতে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন শুনানির জন্য দিন ধার্য রয়েছে। ওই দিনই তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন করা হবে।
আইনজীবীর দাবি, তানজিন তিশার কথিত হুমকির অডিও রেকর্ডিং তদন্ত কর্মকর্তাকে শোনানো হলেও সেটি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। আদালতের কাছে তারা মামলার সার্বিক বিষয় পুনর্বিবেচনার আবেদন করবেন এবং প্রয়োজন হলে পুনঃতদন্তের নির্দেশ দেওয়ার দাবি জানাবেন।
ফলে পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে বাদীপক্ষের আপত্তি এবং আদালতে নারাজি আবেদনের পর মামলাটির পরবর্তী গতিপথ কী হয়, এখন সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের।