
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় পুলিশের তদন্ত ও দেওয়া বক্তব্য নিয়ে ১৯টি প্রশ্ন তুলেছে রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটি। এসব প্রশ্নের জবাব দিতে ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
অন্যদিকে, হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতা বিবেচনায় এ মামলায় গ্রেফতার আসামিদের পক্ষে আদালতে না দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে রংপুর আইনজীবী সমিতি। ভবিষ্যতে এ ঘটনায় নতুন করে কেউ গ্রেফতার হলেও আপাতত তার পক্ষেও আইনজীবী না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সমিতি। তবে তদন্তের গতিপথ বা ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা পরিবর্তিত হলে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে বলে জানিয়েছে তারা।
শনিবার (২৯ আগস্ট) দুপুর ১২টার দিকে রংপুর নগরের জাহাজ কোম্পানি এলাকার একটি কমিউনিটি সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করে মহানগর নাগরিক কমিটি। এতে সংগঠনের সদস্যসচিব পলাশ কান্তি নাগ পুলিশের তদন্ত ও বক্তব্য নিয়ে ১৯টি প্রশ্ন তুলে ধরেন।
পুলিশের বক্তব্য নিয়ে কেন প্রশ্ন নাগরিক কমিটির?
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার ঘটনা রংপুরসহ দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুকতার বিষয়টি সামনে এনেছে। দুই আসামিকে গ্রেফতারের পর পুলিশ হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে গণমাধ্যমে যে বক্তব্য দিয়েছে, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন, সংশয় ও আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে।
নাগরিক কমিটির দাবি, পুলিশের বর্ণনার সঙ্গে নিহতদের স্বজনদের বক্তব্য, ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা এবং পুলিশ ও ফরেনসিক কর্মকর্তাদের বক্তব্যের মধ্যে কিছু সাংঘর্ষিক তথ্য রয়েছে। এসব অসংগতি দূর না করে শুধু আসামিদের বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে তদন্ত শেষ করা হলে প্রকৃত রহস্য উদঘাটন নিয়ে প্রশ্ন থেকে যেতে পারে।
সংগঠনটি বিশেষভাবে জানতে চেয়েছে, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ার মতো একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে একটি পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করা কতটা স্বাভাবিক। একই সঙ্গে চারজনকে হত্যার পর আসামিরা দীর্ঘ সময় ওই বাড়িতে অবস্থান করে গোসল ও খাবার খেয়েছিল—পুলিশের এমন বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে নাগরিক কমিটি।
সিসিটিভি ও বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়েও প্রশ্ন
ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ যথাযথভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে কি না, তা জানতে চেয়েছে নাগরিক কমিটি। একই সঙ্গে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির বিদ্যুৎ-সংযোগের তার কে বা কারা কেটেছিল, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছে সংগঠনটি।
হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে অচেনা মোটরসাইকেলের আনাগোনা কারা করেছিল, কেউ বাড়িটিকে আগে থেকে পর্যবেক্ষণ করছিল কি না এবং ঘটনার সঙ্গে তাদের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না—এসব বিষয়ও তদন্তে গুরুত্ব পেয়েছে কি না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে।
নাগরিক কমিটির মতে, একটি পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার মতো গুরুতর ঘটনায় ঘটনাস্থলের প্রতিটি আলামত, প্রত্যক্ষ ও পারিপার্শ্বিক তথ্য এবং ডিজিটাল প্রমাণ গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
লুট হওয়া টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার নিয়েও অসংগতি
হত্যাকাণ্ডের পর বাড়ি থেকে লুট হওয়া টাকা ও স্বর্ণালঙ্কারের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে নাগরিক কমিটি। সংগঠনটির দাবি, পুলিশের বক্তব্যে লুট হওয়া টাকার পরিমাণ এবং গ্রেফতার আসামিদের ভাগে পাওয়া অর্থের হিসাবের মধ্যে অসংগতি রয়েছে।
এছাড়া ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া বা সংশ্লিষ্ট ইয়াবার সংখ্যার হিসাব কেন পরিবর্তিত হয়েছে, সেটিও স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছে তারা।
হত্যাকাণ্ডের আগে নিহত পরিবারের সদস্যরা কোনো ধরনের আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন কি না, কারও কাছে কোনো অভিযোগ করেছিলেন কি না, বাড়ি নির্মাণকে কেন্দ্র করে তারা কাউকে নিয়ে হুমকি বা চাপের মধ্যে ছিলেন কি না—এসব বিষয়ও তদন্তে যাচাই করা হয়েছে কি না, তা জানতে চেয়েছে সংগঠনটি।
সব মিলিয়ে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে পুলিশের তদন্ত ও বক্তব্য নিয়ে ১৯টি প্রশ্ন উত্থাপন করে বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছে রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটি।
‘শুধু স্বীকারোক্তির ওপর নির্ভর করা উচিত নয়’
নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব পলাশ কান্তি নাগ বলেন, শুধু আসামিদের স্বীকারোক্তির ওপর নির্ভর করে তদন্ত শেষ করা উচিত নয়। সিসিটিভি ফুটেজ, ফরেনসিক আলামত, মোবাইল ফোনের তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যসহ সব ধরনের তথ্যের সঙ্গে পুলিশের বর্ণনা মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, পুলিশের বক্তব্যের অসংগতিগুলো দূর করে একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে চার হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করতে হবে।
সংগঠনটির লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, শুধু এই হত্যাকাণ্ড নয়, দেশে সংঘটিত প্রতিটি হত্যার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সঠিক তদন্ত নিশ্চিত করা জরুরি। বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে। মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং মানুষ স্বাভাবিক ও নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা চায়।
সংবাদ সম্মেলন থেকে গণপতি চক্রবর্তীসহ চার হত্যাকাণ্ডের বিচার বিভাগীয় তদন্ত, প্রকৃত রহস্য উদঘাটন এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়।
চারজনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার দুই
গত শনিবার রাতে রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ায় নিজ বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর (১২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, চারজনকেই শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডটি ঘটে।
এ ঘটনায় গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে রংপুর মেট্রোপলিটন কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন। পরে মামলায় একই এলাকার কানু দাসের ছেলে মুগ্ধ দাস ও বিনয় দাসের ছেলে সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেফতার করা হয়।
পুলিশের দাবি, গ্রেফতার দুই ব্যক্তি আদালতে স্বেচ্ছায় হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে নাগরিক কমিটি বলছে, শুধু স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে তদন্ত সীমাবদ্ধ না রেখে অন্যান্য তথ্য-প্রমাণের সঙ্গে তা যাচাই করা প্রয়োজন।
আসামিদের পক্ষে না দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত আইনজীবীদের
এদিকে এই হত্যা মামলায় গ্রেফতার আসামিদের পক্ষে আদালতে না দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে রংপুর আইনজীবী সমিতি। শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রংপুর আইনজীবী সমিতির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
সমিতির সভাপতি শাহেদ কামাল ইবনে খতিব ও সাধারণ সম্পাদক আফতাব উদ্দিন সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন। এ সময় রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ উন নবীসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আফতাব উদ্দিন বলেন, চারজনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার দুই আসামি আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। প্রাথমিকভাবে তাদের ঘটনায় জড়িত থাকার বিষয়টি বোঝা যাচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতার বিষয়টি বিবেচনা করে আসামিদের পক্ষে আদালতে না দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, এ সিদ্ধান্ত আপাতত নেওয়া হয়েছে। তদন্তের গতিপথ বা ঘটনার পারিপার্শ্বিকতায় পরিবর্তন এলে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।
আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, আইনজীবীরা অর্থের বিনিময়ে অন্যায়কে সমর্থন করেন—এমন ধারণা সঠিক নয়। চারজনকে হত্যার মতো নৃশংস ঘটনায় আসামিদের পক্ষে আদালতে না দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তকে এরই একটি উদাহরণ হিসেবে দেখছে সমিতি।
প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের দাবি
একই ঘটনায় নাগরিক কমিটির বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি এবং আইনজীবী সমিতির আসামিদের পক্ষে না দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত রংপুরের চার হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
নিহত পরিবারের স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যে এখন মূল প্রশ্ন—চার সদস্যের এই পরিবারের ওপর হামলার প্রকৃত কারণ কী ছিল এবং হত্যাকাণ্ডে গ্রেফতার দুই ব্যক্তিই কি পুরো ঘটনার সঙ্গে জড়িত, নাকি এর পেছনে আরও কেউ রয়েছে?
নাগরিক কমিটি বলছে, এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর দিতে হলে সব ধরনের আলামত ও তথ্য-প্রমাণ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে তারা।