
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
চট্টগ্রাম বন্দরের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল প্রকল্পের নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে যাচ্ছে আগামী রোববার (৩০ আগস্ট)। কর্ণফুলী নদীর তীরে এই আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ বিদেশি বিনিয়োগে কোনো কনটেইনার টার্মিনাল গড়ে ওঠার নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে।
রোববার বেলা ১১টায় চট্টগ্রামের পতেঙ্গার লালদিয়ার চরে প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করছে ডেনিশ শিপিং জায়ান্ট এপি মোলার-মায়েরস্কের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান নেদারল্যান্ডসভিত্তিক এপিএম টার্মিনালস বিভি। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (সিপিএ) সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পিপিপি চুক্তির আওতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে।
বাড়বে বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা
লালদিয়া টার্মিনাল চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরের বার্ষিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ৮ লাখ টিইইউর বেশি বাড়বে। এই অতিরিক্ত সক্ষমতা বর্তমানে বন্দরের মোট সক্ষমতার প্রায় ২৩ শতাংশের সমান।
কর্ণফুলী নদীর তীরে ৪৯ দশমিক ১৫ একর জায়গার ওপর নির্মিত হবে অত্যাধুনিক এই টার্মিনাল। এর মধ্যে মূল টার্মিনালের জন্য ৩২ একর, কনটেইনার ইয়ার্ডের জন্য ৭ দশমিক ১৫ একর এবং ট্রাক পার্কিংয়ের জন্য ১০ একর জমি নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পটি ‘ডিজাইন, বিল্ড, ফিন্যান্স, অপারেট অ্যান্ড ট্রান্সফার’ বা ডিবিএফওটি মডেলে উন্নয়ন ও পরিচালনা করবে এপিএম টার্মিনালস। নির্মাণকাজ শেষ করতে সময় ধরা হয়েছে তিন বছর। এরপর ৩০ বছর টার্মিনাল পরিচালনার সুযোগ পাবে প্রতিষ্ঠানটি। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পরবর্তীতে এই মেয়াদ আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগ থাকবে।
ভিড়তে পারবে বড় জাহাজ
লালদিয়া টার্মিনালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো বড় আকারের কনটেইনার জাহাজ সরাসরি ভেড়ানোর সক্ষমতা। পুরোপুরি চালু হওয়ার পর টার্মিনালটিতে সরাসরি ৬ হাজার টিইইউ ধারণক্ষমতার জাহাজ ভিড়তে পারবে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে যেসব জাহাজ সরাসরি ভেড়ে, সেগুলোর তুলনায় এই সক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণ। ফলে বড় জাহাজ থেকে সরাসরি পণ্য ওঠানামার সুযোগ তৈরি হবে। এতে জাহাজ পরিচালনায় সময় কমার পাশাপাশি পণ্য খালাসের প্রক্রিয়াও আরও দ্রুত ও কার্যকর হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।
নতুন টার্মিনালে থাকবে ৬১৬ মিটার দীর্ঘ জেটি। জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর জন্য স্থাপন করা হবে সাতটি শিপ-টু-শোর ক্রেন। পাশাপাশি কনটেইনার ইয়ার্ডে থাকবে ৩২টি ইলেকট্রিক রাবার-টায়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেন এবং ৪১টি ইলেকট্রিক টার্মিনাল ট্রাক্টর।
আধুনিক প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব পরিচালনা
লালদিয়া টার্মিনালে বিদ্যুৎচালিত সরঞ্জাম ও আধুনিক কার্গো হ্যান্ডলিং প্রযুক্তির ব্যবহার করা হবে। এর ফলে প্রচলিত জ্বালানিনির্ভর বন্দর পরিচালনার তুলনায় পরিবেশের ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় জাহাজ সরাসরি ভেড়ানোর সুবিধা এবং আধুনিক সরঞ্জামের ব্যবহার চট্টগ্রাম বন্দরের সামগ্রিক কার্যক্রমে গতি আনতে পারে। একই সঙ্গে জাহাজের অপেক্ষার সময় কমলে আমদানি-রপ্তানি পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায়ও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের বড় অংশই চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। তাই বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন এই টার্মিনাল চালু হলে আমদানি-রপ্তানিকারকদের জন্য দ্রুত পণ্য পরিবহন এবং জাহাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রথম তিন বছরে বিনিয়োগ ৫৫০ মিলিয়ন ডলার
প্রকল্পের প্রথম তিন বছরে নির্মাণকাজ, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি স্থাপন এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজের জন্য মোট প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে এপিএম টার্মিনালস।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, প্রকল্পের শুরুতেই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ২৫ মিলিয়ন ডলার অগ্রিম পাবে। এর বাইরে প্রতি বছর ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার কনসেশন ফি দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
এছাড়া টার্মিনালে প্রতিটি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের বিপরীতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ২১ ডলার করে পাবে। বার্ষিক কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ ৯ লাখ ইউনিট ছাড়িয়ে গেলে এই ফি বেড়ে প্রতি কনটেইনারে ২৩ ডলার হবে।
বিদেশি বিনিয়োগে নতুন সম্ভাবনা
বাংলাদেশের বন্দর অবকাঠামো উন্নয়নে লালদিয়া টার্মিনাল প্রকল্পকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সম্পূর্ণ বিদেশি বিনিয়োগে নির্মিত এই টার্মিনাল ভবিষ্যতে দেশের বন্দর খাতে আরও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের পথ তৈরি করতে পারে।
আধুনিক প্রযুক্তি, বড় জাহাজ গ্রহণের সক্ষমতা এবং বাড়তি কনটেইনার হ্যান্ডলিং সুবিধার কারণে লালদিয়া টার্মিনাল চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে দ্রুত পণ্য খালাস ও জাহাজ পরিচালনার সুযোগ তৈরি হলে দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম আরও প্রতিযোগিতামূলক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে ৫৫০ মিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্প শুধু একটি নতুন কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নয়; বরং বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর অবকাঠামো ও বৈদেশিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় আধুনিকায়নের একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে সামনে আসছে।