
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
জাতীয় সংসদে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাবদিহিতা দাবি করে দেওয়া বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ।
শনিবার (২৯ আগস্ট) দুপুর ১টা ৪০ মিনিটের দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ দুঃখ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে সংসদে দেওয়া বক্তব্যের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে নিজের অবস্থানও তুলে ধরেন তিনি।
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাবদিহিতা দাবি করে সংসদে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, সেটিকে কেন্দ্র করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হওয়ায় তিনি দুঃখিত।
নৌকাবাইচের তথ্য নিয়ে ভুল স্বীকার
নিজের বক্তব্যের একটি অংশে তথ্যগত ভুল হয়েছিল বলেও স্বীকার করেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি জানান, নৌকাবাইচের স্থান উল্লেখ করতে গিয়ে সিলেটের পরিবর্তে ভুল করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাম বলে ফেলেছিলেন।
এ ধরনের ভুলের কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় বিব্রত এবং দুঃখিত বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, মূল ঘটনা কী ছিল এবং গণমাধ্যমে ঘটনাটি কীভাবে উপস্থাপিত হয়েছে—সে বিষয়টি সংসদে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা তার উচিত ছিল। কিন্তু সম্পূরক প্রশ্নের জন্য নির্ধারিত সময় সীমিত থাকায় তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ পাননি।
কনসার্ট বন্ধের ঘটনা নিয়ে ব্যাখ্যা
হাসনাত আবদুল্লাহ তার পোস্টে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কের বিষয়টিও ব্যাখ্যা করেন।
তার দাবি, গণমাধ্যমে ঘটনাটি এমনভাবে উপস্থাপিত হয়েছে যেন মাদ্রাসাশিক্ষার্থীরা পুলিশের কনসার্ট বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু তার বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনাপ্রবাহ ছিল ভিন্ন।
তিনি জানান, গভীর রাতে উচ্চ শব্দের কারণে মাদ্রাসার পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছিল। এ কারণে শিক্ষার্থীরা শব্দ কমানোর অনুরোধ করেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি থেকে পরবর্তী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং কয়েকজন শিক্ষার্থী পুলিশের লাঠিপেটায় আহত হন বলে তিনি দাবি করেন।
হাসনাতের বক্তব্য, এই ঘটনাকে কনসার্ট বন্ধ করে দেওয়া হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়। একইভাবে এর ভিত্তিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ—এমন ধারণা তৈরি হওয়াও সঠিক নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
‘বাংলাদেশ সবার’
নিজের পোস্টে বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য নিয়ে নিজের রাজনৈতিক অবস্থানও স্পষ্ট করেন হাসনাত আবদুল্লাহ।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ এমন একটি দেশ হওয়া উচিত, যেখানে ধর্ম, মত ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্য সহাবস্থান করবে। তার ভাষায়, দেশে মসজিদ, মন্দির, সংগীত, ওয়াজ, মাজার, কনসার্ট, মাহফিল, রথযাত্রা ও সিনেমা উৎসব—সবই থাকবে।
তিনি মনে করেন, একজনের যে বিষয়টি পছন্দ, তিনি সেখানে অংশ নেবেন; আবার কারও পছন্দ না হলে তিনি সেখানে না গেলেও অন্যের অধিকারকে সম্মান করতে হবে।
হাসনাত বলেন, সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে কেউ অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ণ করতে না পারে।
জুলাইয়ের আদর্শের কথা পুনর্ব্যক্ত
পোস্টে জুলাইয়ের আদর্শের প্রতি নিজের অঙ্গীকারের কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, তিনি ও তার দল জুলাইয়ের আদর্শকে ধারণ করেন এবং নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সেই আদর্শকে ভিত্তি হিসেবে রাখতে চান।
তার মতে, জুলাই একটি সর্বজনীন সমাজের স্বপ্ন দেখায়, যেখানে সব মানুষের অধিকার নিশ্চিত হবে এবং কেউ নিজের মতামত বা দৃষ্টিভঙ্গি অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে পারবে না।
তিনি বলেন, মতের পার্থক্য ও বিতর্ক থাকবে, কিন্তু কাউকে জোর করে কোনো মত গ্রহণে বাধ্য করা যাবে না। তার ভাষায়, জুলাই একটি ‘কমন মিনিমাম গ্রাউন্ড’-এর ঐক্যের প্রতীক।
হাসনাত আরও বলেন, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অন্যায়ভাবে অন্য কারও ওপর জোর খাটালে বা নিজের মতামত চাপিয়ে দিতে চাইলে সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে তা প্রতিহত করা এবং সব মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করা।
আইনশৃঙ্খলা নিয়ে সরকারের সমালোচনা
হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্যে সরকারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সমালোচনা উঠে এসেছে। তিনি মনে করেন, সরকার যদি মানুষের সমান অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দুর্বল হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলন ছিল ধর্ম, বর্ণ ও শ্রেণিনির্বিশেষে মানুষের আন্দোলন। এর লক্ষ্য ছিল মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং এমন একটি সর্বজনীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে বাংলাদেশের বৈচিত্র্যকে সম্মান করা হবে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিয়ে নিজের বক্তব্যের কারণে যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে, সেটির জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেও নিজের মূল রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে আসেননি হাসনাত আবদুল্লাহ। বরং তিনি স্পষ্ট করেছেন, সব মানুষের সমান অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং পারস্পরিক সহাবস্থান নিশ্চিত করাই তার প্রত্যাশিত বাংলাদেশের অন্যতম ভিত্তি।