
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
দ্বিতীয় দফায় কৌশলগত তেল ছাড়ার পরিকল্পনা নেই: আইইএ
আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও কৌশলগত জরুরি মজুদ থেকে দ্বিতীয় দফায় জ্বালানি তেল ছাড়ার আপাতত কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)। বিষয়টি নিয়ে সংস্থাটির মধ্যে বর্তমানে কোনো আলোচনাও চলছে না।
সম্প্রতি রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ তথ্য জানিয়েছেন আইইএর নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরোল। নরওয়ের একটি জ্বালানি সম্মেলনের ফাঁকে তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারের পরিস্থিতি সংস্থাটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে কৌশলগত মজুদ থেকে নতুন করে তেল ছাড়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়নি।
ফাতিহ বিরোল বলেন, ‘কৌশলগত মজুদের প্রায় ৮০ শতাংশ সুরক্ষিত রয়েছে।’ অর্থাৎ এর আগে বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের সময় বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ছাড়ার পরও আইইএর হাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কৌশলগত মজুদ রয়েছে।
মার্চে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়া হয়েছিল
এর আগে গত মার্চে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলে আইইএ তাদের কৌশলগত মজুদ থেকে প্রায় ৪০ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ছাড়ে। বাজারে সরবরাহের ঘাটতি ও মূল্যবৃদ্ধির চাপ সামাল দিতে ওই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
তবে সেই উদ্যোগের পরও সংস্থাটির কৌশলগত মজুদের বড় একটি অংশ সংরক্ষিত রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিরোল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে মজুদের প্রায় ৮০ শতাংশ নিরাপদ অবস্থায় রয়েছে। ফলে এখনই দ্বিতীয় দফায় মজুদ থেকে জ্বালানি তেল বাজারে ছাড়ার প্রয়োজন দেখছে না আইইএ।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের ওপর বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব পড়লেও আইইএ পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। বিশেষ করে উৎপাদন, সরবরাহব্যবস্থা এবং বিভিন্ন অঞ্চলের চাহিদার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির প্রধান।
ইউরোপের এলএনজি মজুদ নিয়ে উদ্বেগ
তবে জ্বালানি তেলের কৌশলগত মজুদের বিষয়ে স্বস্তি প্রকাশ করলেও ইউরোপের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি মজুদ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন ফাতিহ বিরোল।
জ্বালানি তথ্যভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম এজিএসআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ইউরোপে এলএনজির মোট মজুদ প্রায় ৬২ শতাংশ। তবে শীত মৌসুম শুরু হওয়ার আগে এই মজুদ আরও বাড়াতে চায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। আগামী ১ ডিসেম্বরের মধ্যে মজুদের পরিমাণ ৮০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে তাদের।
আইইএর প্রধান মনে করেন, শীতের আগে ইউরোপের গ্যাসের মজুদ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কম থাকায় বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বিশেষ করে শীত মৌসুমে গ্যাসের চাহিদা বেড়ে গেলে বর্তমান মজুদ পরিস্থিতি ইউরোপের জন্য চাপ তৈরি করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের গ্যাস সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ
ফাতিহ বিরোলের মতে, ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে গ্যাস পাওয়ার বিষয়ে ইউরোপ আশাবাদী হলেও একই সময়ে অঞ্চলটির সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে অনিশ্চয়তাও রয়েছে।
এর পাশাপাশি রাশিয়া থেকে এলএনজি আমদানি বন্ধ করার পরিকল্পনা রয়েছে ইউরোপের। ফলে বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস সংগ্রহের প্রয়োজন আরও বাড়বে। এতে আন্তর্জাতিক এলএনজি বাজারে চাহিদার চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রাশিয়ার ওপর জ্বালানি নির্ভরতা কমানোর অংশ হিসেবে ইউরোপ দীর্ঘদিন ধরেই বিকল্প জ্বালানি উৎস খুঁজছে। কিন্তু রাশিয়া থেকে এলএনজি আমদানি কমিয়ে দিলে অন্য সরবরাহকারীদের ওপর ইউরোপের নির্ভরতা আরও বাড়বে। এর ফলে বৈশ্বিক এলএনজি বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে এবং সরবরাহের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।
অতিরিক্ত ঠান্ডা হলে সংকট বাড়ার আশঙ্কা
ইউরোপের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকির একটি হতে পারে আসন্ন শীতের আবহাওয়া। ফাতিহ বিরোল সতর্ক করে বলেছেন, শীতকালে যদি ইউরোপে স্বাভাবিকের তুলনায় অতিরিক্ত ঠান্ডা পড়ে, তাহলে গ্যাসের চাহিদা দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। সেই পরিস্থিতিতে বর্তমান মজুদ দিয়ে সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
কারণ শীতের সময় ঘরবাড়ি গরম রাখা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানায় গ্যাসের ব্যবহার বেড়ে যায়। ফলে মজুদ থেকে দ্রুত গ্যাস উত্তোলন করতে হয়। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পর্যাপ্ত এলএনজি সংগ্রহ করা না গেলে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
আইইএর প্রধান বলেন, ইউরোপের গ্যাসের মজুদ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কম থাকলেও পরিস্থিতি এখনই সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছেনি। তবে শীতের আবহাওয়া, আন্তর্জাতিক সরবরাহ পরিস্থিতি এবং রাশিয়া থেকে এলএনজি আমদানি বন্ধের মতো সিদ্ধান্তগুলো আগামী দিনে ইউরোপের জ্বালানি বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বর্তমানে একদিকে কৌশলগত তেলের মজুদ নিয়ে তুলনামূলক স্বস্তি থাকলেও অন্যদিকে ইউরোপের গ্যাস সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শীত মৌসুমে চাহিদা বেড়ে গেলে এবং একই সময়ে সরবরাহে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে ইউরোপের পাশাপাশি বিশ্ববাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে। তাই পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা।