
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
নেপালে ভয়াবহ বন্যায় ৫২৬ মৃত্যু, মর্গে লাশ রাখার জায়গা নেই
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে নেপালে মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৫২৬ জনে দাঁড়িয়েছে। এ ঘটনায় আরও ১ হাজার ৪৭৩ জন আহত হয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছেন ২ হাজার ৪৭৮ জন। নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৭৭৭ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন বলে জানা গেছে।
বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়া মরদেহগুলো অনেক দূরের ভাটি অঞ্চলে গিয়ে উঠছে। একের পর এক মরদেহ উদ্ধার হওয়ায় স্থানীয় হাসপাতাল ও মর্গগুলোতে তৈরি হয়েছে তীব্র সংকট। অনেক জায়গায় মরদেহ রাখার মতো জায়গা না থাকায় পাশের জেলা ও শহরগুলোতে লাশ স্থানান্তর করতে হচ্ছে।
উদ্ধারকারী দল ও প্রশাসনের সদস্যরা একই সঙ্গে মরদেহ উদ্ধার, সংরক্ষণ এবং পরিচয় শনাক্ত করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে বিপুলসংখ্যক মরদেহ উদ্ধারের কারণে পুরো প্রক্রিয়াটি ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
ভাটি অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ছে মরদেহ
রাসুওয়া ও নুওয়াকোট এলাকা থেকে বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়া মরদেহ নুওয়াকোটের পাশাপাশি ভাটির দিকের চিতওয়ান, তানাহুন, নাওয়ালপরাসি এবং অন্যান্য এলাকাতেও উদ্ধার করা হয়েছে।
নুওয়াকোট, ধাদিং ও নাওয়ালপরাসির মর্গগুলোতে জায়গা ফুরিয়ে যাওয়ায় কিছু মরদেহ পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে পাঠানো হয়েছে। চিতওয়ানেও উদ্ধার হওয়া মরদেহের সংখ্যা হাসপাতালের ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে গেছে। ফলে সেখানে অস্থায়ীভাবে মরদেহ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
পোখরা শহরের হাসপাতালগুলোর মর্গেও বিভিন্ন জেলা থেকে মরদেহ আসতে শুরু করায় জায়গার সংকট দেখা দিয়েছে।
চিতওয়ানের ভরতপুরে বিপুলসংখ্যক মরদেহ সংরক্ষণের জন্য একটি অব্যবহৃত ভবনকে অস্থায়ী মরদেহ সংরক্ষণ কেন্দ্রে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেখানে প্রায় ২৫০টি মরদেহ রাখার ব্যবস্থা করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত ত্রিশূলী ও নারায়ণী নদীর চিতওয়ান অংশে ফিশলিং থেকে গোলাঘাট পর্যন্ত ১৩৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মরদেহ সংরক্ষণেও তৈরি হয়েছে সংকট
চিতওয়ানের বিভিন্ন হাসপাতালের মর্গে একসঙ্গে সাধারণত ৩০ থেকে ৫০টি মরদেহ রাখার সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু বন্যার পর বিপুলসংখ্যক মরদেহ উদ্ধারের কারণে সেই সক্ষমতা ইতোমধ্যে ছাড়িয়ে গেছে।
এ পরিস্থিতিতে অস্থায়ী সংরক্ষণ কেন্দ্রে প্রায় ২৫০টি মরদেহ রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে অতিরিক্ত ব্যবস্থা হিসেবে দেবঘাটের বৈদ্যুতিক শ্মশান ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন।
চিতওয়ানের চিফ ডিস্ট্রিক্ট অফিসার গণেশ আরিয়াল জানিয়েছেন, ভরতপুর মহানগর কর্তৃপক্ষ অস্থায়ী কেন্দ্রটি মেরামত ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দিয়ে প্রস্তুত করছে। মরদেহগুলো যাতে দ্রুত পচে না যায়, সে জন্য কক্ষের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র স্থাপন করা হচ্ছে। পাশাপাশি ড্রাই আইস ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে।
স্থানীয় শিল্প ও বণিক সমিতিগুলো জরুরি ভিত্তিতে ড্রাই আইস সরবরাহের ব্যয় ও দায়িত্ব নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
স্বজনদের ভিড়, বাড়ছে উদ্বেগ
বন্যার পর থেকে নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনরা রাসুওয়া, নুওয়াকোট, গোর্খাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে চিতওয়ানে আসতে শুরু করেছেন। উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে তাদের স্বজন কেউ রয়েছেন কি না, তা জানতে হাসপাতাল ও অস্থায়ী সংরক্ষণকেন্দ্রগুলোতে ভিড় করছেন তারা।
বৃহস্পতিবার অস্থায়ী কেন্দ্র প্রস্তুতের কাজ চলার সময়ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের সেখানে তথ্যের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা যায়।
একদিকে মরদেহের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে পরিচয় শনাক্ত করতে স্বজনদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ ও অন্যান্য প্রক্রিয়া চালাতে হচ্ছে। ফলে প্রশাসনের ওপর চাপও ক্রমশ বাড়ছে।
পোখরার মর্গেও জায়গা নেই
ভোটেশকোশী নদীর বন্যায় ভেসে আসা মরদেহের কারণে নেপালের পোখরা শহরের মর্গগুলোতেও জায়গার সংকট তৈরি হয়েছে।
বন্যাদুর্গত বিভিন্ন জেলার মর্গে জায়গা না থাকায় তানাহুন, গোর্খা, পূর্ব নাওয়ালপরাসি ও ধাদিং থেকে ৯৩টি মরদেহ পোখরায় পাঠানো হয়েছে।
কাস্কির প্রধান জেলা কর্মকর্তা কুমান সিং গুরুং বলেন, মরদেহের সংখ্যা ইতোমধ্যে হাসপাতালের ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে গেছে। আপাতত কোনোভাবে এগুলো রাখার ব্যবস্থা করা হলেও নতুন করে আরও মরদেহ এলে পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
পোখরা একাডেমি অব হেলথ সায়েন্সেসের তথ্য কর্মকর্তা সুশীল আরিয়াল জানান, বর্তমানে মর্গে ২ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় মরদেহ রাখা হচ্ছে। এই তাপমাত্রায় সাধারণত ১০ দিন থেকে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত মরদেহ সংরক্ষণ করা সম্ভব।
তবে এর চেয়ে বেশি সময় মরদেহ সংরক্ষণ করতে হলে হিমাঙ্কের নিচে তাপমাত্রা বজায় রাখার মতো বিশেষ অবকাঠামো প্রয়োজন। পোখরায় বর্তমানে সেই সুবিধা নেই।
পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতেও একই পরিস্থিতি
গোর্খার প্রাদেশিক হাসপাতালের মর্গে জায়গা না থাকায় বন্যায় ভেসে আসা ১১টি মরদেহ পোখরার গণ্ডকী প্রাদেশিক হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
একই সংকটে পড়েছে পূর্ব নাওয়ালপরাসিও। সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মর্গে জায়গা ফুরিয়ে যাওয়ায় কিছু মরদেহ পোখরা, বুটওয়াল, ভৈরহাওয়া ও পালপায় পাঠানো হয়েছে।
পূর্ব নাওয়ালপরাসির প্রধান জেলা কর্মকর্তা জগদীশ্বর উপাধ্যায় বলেন, নদী থেকে এখনও মরদেহ উদ্ধার হচ্ছে। এত বিপুলসংখ্যক মরদেহ ব্যবস্থাপনার মতো অবকাঠামো জেলায় নেই। পরিস্থিতি সামাল দিতে পার্শ্ববর্তী জেলা ও পোখরার সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।
হঠাৎ পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসে ভয়াবহ বিপর্যয়
বুধবার সকালে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের রাসুয়া এলাকায় আচমকাই ভয়াবহ আকস্মিক ঢল নেমে আসে। পাহাড় থেকে নেমে আসা প্রবল পানির সঙ্গে যুক্ত হয় ভূমিধসের কাদামাটি ও পাথর। এতে মুহূর্তের মধ্যে বিস্তীর্ণ এলাকায় ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
দুর্যোগকবলিত এলাকার কাছেই চীনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল তিব্বতে রয়েছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান কৈলাস মানস সরোবর। ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক পর্যটক ও তীর্থযাত্রী সেখানে যান। ফলে এবারের দুর্যোগে বিদেশি নাগরিক নিখোঁজের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, নেপালে ৬২৬ জনের পাশাপাশি তিব্বতে অন্তত পাঁচজন নিহত এবং ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
৯৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা
এই ভয়াবহ দুর্যোগে নেপাল ও আশপাশের এলাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৯৩ হাজার মানুষ এ দুর্যোগের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারেন।
দুর্যোগ মোকাবিলা, উদ্ধার কার্যক্রম এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য জরুরি সহায়তা নিশ্চিত করতে সংস্থাটি প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলারের সহায়তার আবেদন জানিয়েছে।
এদিকে নদীর ভাটি অঞ্চলে এখনও মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা অব্যাহত থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান, মরদেহের পরিচয় শনাক্তকরণ এবং সংরক্ষণ—সব মিলিয়ে নেপালের প্রশাসন ও হাসপাতালগুলোর ওপর তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন চাপ।