• হোম > বাংলাদেশ > জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর আগে ৩ মাস বিশ্ববাজার পর্যবেক্ষণ করবে সরকার

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর আগে ৩ মাস বিশ্ববাজার পর্যবেক্ষণ করবে সরকার

  • শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১৪:১৮
  • ১৫

---

 

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে সরকারের ওপর ভর্তুকির চাপ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের আগে বিশ্ববাজারের পরিস্থিতি তিন মাস পর্যবেক্ষণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তিন মাসের বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগকে মূল্য সমন্বয়ের প্রস্তাব তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গত ৯ জুলাই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ভর্তুকি-সংক্রান্ত এক উচ্চপর্যায়ের সভায় অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার এ নির্দেশনা দেন। সরকারের পক্ষ থেকে জ্বালানি বাজারের আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, আমদানি ব্যয় এবং দেশের অভ্যন্তরীণ ভর্তুকির চাপ বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এই প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে অতিরিক্ত সচিব (বাজেট ও আইন) মো. হাসানুল মতিনকে প্রধান করে ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। কমিটির অন্যতম দায়িত্ব হবে জ্বালানি খাতে ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তা যৌক্তিকীকরণ এবং ভবিষ্যৎ ব্যয়ের পূর্বাভাস তৈরি করা।

কমিটি আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের গতিপ্রকৃতি পর্যালোচনা করবে। একই সঙ্গে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র বা আইপিপিগুলোর প্রকৃত বকেয়া পাওনার পরিমাণ নিরূপণ করা হবে। নতুন চালু হওয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কারণে ভবিষ্যতে সরকারের ওপর কী পরিমাণ আর্থিক দায় তৈরি হতে পারে, সেটিও বিশ্লেষণ করবে কমিটি।

এলএনজিতে বাড়ছে ভর্তুকির চাপ

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ায় সরকারের ওপর সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি হয়েছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানিতে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে এলএনজি খাতে ৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। তবে জুন মাসের বকেয়া ভর্তুকি এবং চলতি অর্থবছরের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, এ খাতে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে।

এর আগে গত অর্থবছরের মূল বাজেটে এলএনজি খাতে ৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ থাকলেও শেষ পর্যন্ত সরকারকে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়। ফলে বাজেটে বরাদ্দের তুলনায় বাস্তব ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ১১৫ কার্গো এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। ইরান যুদ্ধের কারণে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় স্পট মার্কেট থেকে তুলনামূলক বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। এতে আগামী দিনগুলোতে এলএনজি খাতে ভর্তুকির চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব

ভর্তুকির চাপ কমাতে সিএনজি ফিলিং স্টেশন এবং গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করা গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে জ্বালানি বিভাগ।

জ্বালানি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, সিএনজির দাম বাড়ানো হলে পেট্রোবাংলার প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি থেকে ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে। পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করা গ্যাসের দাম বাড়ানোর মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছে জ্বালানি বিভাগ।

জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে জ্বালানি খাতে ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে আসতে পারে। তবে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয়েছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যানের মতে, বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয়ও বেড়ে যাবে। এর ফলে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকির প্রয়োজন আরও বাড়তে পারে।

তিনি আরও জানান, বর্তমানে সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে কোনো ভর্তুকি দেওয়া হয় না। কিন্তু গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে উৎপাদন ব্যয় সামাল দিতে এসব কেন্দ্রকেও ভর্তুকির আওতায় আনার প্রয়োজন হতে পারে।

জ্বালানি তেলে লোকসান বিপিসির

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রায় এক যুগ ধরে জ্বালানি তেলে সরকার সরাসরি কোনো ভর্তুকি দিচ্ছে না। চলতি অর্থবছরেও এ খাতে ভর্তুকির জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়নি।

তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসিকে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হয়েছে। ইরান যুদ্ধের প্রভাবে এপ্রিল ও মে মাসে বিপিসির প্রায় ৭ হাজার ৬১০ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।

যদিও দীর্ঘ সময় ধরে বিপিসি জ্বালানি তেল বিক্রি করে ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি মুনাফা করেছে। ফলে বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির কারণে সাময়িক লোকসান হলেও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখছে সরকার।

বিদ্যুৎ খাতেও বাড়ছে বকেয়া

জ্বালানি তেলের পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতেও সরকারের ভর্তুকির চাপ বেড়েছে। গত অর্থবছরের মূল বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির জন্য ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। পরে সংশোধিত বাজেটে এ বরাদ্দ বাড়িয়ে ৬২ হাজার কোটি টাকা করা হয়।

এর মধ্যেও গত দুই মাসে ১০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি পরিশোধ করা হয়েছে। তবে এরপরও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা পাওনা রয়েছে।

ইরান যুদ্ধের আগে প্রতি মাসে বিদ্যুৎ ভর্তুকি বাবদ প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করতে হতো। যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার কারণে সেই ভর্তুকির পরিমাণ বাড়ছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় কমানোর পরামর্শ

ভর্তুকির চাপ কমাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ক্রয় ব্যবস্থাপনায় মেরিট অর্ডার ডিসপ্যাচ অনুযায়ী ‘লিস্ট কস্ট’ পদ্ধতি কার্যকরভাবে অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা।

এ ছাড়া বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি অনুযায়ী ক্যাপাসিটি ও এনার্জি প্রাইস পুনর্মূল্যায়ন, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর এভেইলেবিলিটি ফ্যাক্টরকে প্ল্যান্ট ফ্যাক্টরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে পুনর্নির্ধারণ এবং ডিপেন্ডেবল ক্যাপাসিটি নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় আরও বেশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ক্রয়ের ক্ষেত্রে ব্যয় ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করা গেলে সরকারের ভর্তুকির চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।

গ্যাসের দাম বাড়ানো নিয়ে দ্বিমত

বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি খাতে সরকার এক ধরনের দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয় এবং ভর্তুকির চাপ বাড়ছে। অন্যদিকে গ্যাস বা জ্বালানির দাম বাড়ালে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদও সরকারের এই সংকটের কথা তুলে ধরেছেন। তার মতে, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম না বাড়ালে বিপুল ভর্তুকির চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হবে। আবার উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে দাম বাড়ানোর সম্ভাব্য প্রভাবও সরকারকে ভাবতে হবে।

ভর্তুকির সঠিক হিসাবের ওপর গুরুত্ব

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের প্রকৃত আর্থিক দায় নির্ধারণে নিয়মিত ও হালনাগাদ হিসাব রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার।

তিনি ভর্তুকির আওতাধীন আইপিপি ও যৌথ মালিকানাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া পাওনা এবং চলতি অর্থবছরে সম্ভাব্য ভর্তুকির পরিমাণ নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং সরবরাহকারীদের নগদ প্রবাহ নিশ্চিত করতে প্রতি মাসের জ্বালানি ভর্তুকির চাহিদা দ্রুত দাখিলের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের গতিপ্রকৃতি এখন সরকারের নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই তাৎক্ষণিকভাবে দেশের বাজারে জ্বালানির দাম সমন্বয় না করে প্রথমে তিন মাস আন্তর্জাতিক বাজার পর্যবেক্ষণ করা হবে। এরপর পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/16004 ,   Print Date & Time: Sunday, 30 August 2026, 06:27:18 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh