
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার ধাক্কা কাটতে না কাটতেই নেপাল-চীন সীমান্তে নতুন করে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ভূমিধসের কারণে নদীর প্রবাহ আটকে নেপাল অংশে একটি নতুন হ্রদ তৈরি হয়েছে। হ্রদটিতে দ্রুত পানি বাড়তে থাকায় এর অস্থিতিশীল প্রাকৃতিক বাঁধ যেকোনো সময় ভেঙে যেতে পারে। এমনটি হলে চীনের তিব্বতের গিরং কাউন্টিসহ সীমান্তবর্তী এলাকায় আবারও ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করেছে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি।
সিসিটিভিতে প্রচারিত সর্বশেষ ড্রোনচিত্রে ভূমিধসের ফলে তৈরি বিশাল গর্তে পানি জমে নতুন হ্রদ তৈরির দৃশ্য দেখা গেছে। হ্রদটি গিরং স্থলবন্দরের কাছাকাছি হলেও এর অবস্থান নেপালের অংশে। ড্রোনচিত্র বিশ্লেষণ করে চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সময়ের সঙ্গে হ্রদটির আকার ক্রমেই বাড়ছে।
বাড়ছে পানির পরিমাণ
প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, নতুন তৈরি হ্রদটিতে এরই মধ্যে প্রায় ২০ লাখ ঘনমিটার পানি জমেছে। এরই মধ্যে পানি অস্থায়ী প্রাকৃতিক বাঁধের ওপর দিয়ে উপচে পড়তে শুরু করেছে। আগামী তিন দিনে আশপাশের এলাকা থেকে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি হ্রদটিতে প্রবেশ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ হিসাবে হ্রদটিতে মোট পানির পরিমাণ প্রায় ৫০ লাখ ঘনমিটারে পৌঁছাতে পারে। বিপুল পরিমাণ পানির চাপ বাড়তে থাকলে ভূমিধসের ফলে তৈরি মাটি ও পাথরের প্রাকৃতিক বাঁধ দুর্বল হয়ে ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাঁধটি হঠাৎ ভেঙে গেলে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পানি, কাদা ও পাথর পাহাড়ি ঢাল বেয়ে নিচের দিকে প্রবাহিত হতে পারে। এতে সীমান্তবর্তী জনবসতিগুলোতে নতুন করে প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তিন দিনের বৃষ্টির পূর্বাভাস
চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গিরং কাউন্টিতে আগামী তিন দিন বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। বৃষ্টি হলে নতুন হ্রদে পানির পরিমাণ আরও দ্রুত বাড়তে পারে। একই সঙ্গে পাহাড়ি এলাকায় নতুন ভূমিধস ও কাদাধসের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
ভূমিধসের কারণে বিভিন্ন স্থানে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে অস্থিতিশীল প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হয়েছে। এসব বাঁধের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বিশেষ করে যেসব এলাকায় পানির চাপ বাড়ছে, সেসব স্থানে সম্ভাব্য বিপর্যয় মোকাবিলায় সতর্কতা জোরদার করা হয়েছে।
উদ্ধার অভিযানেও বড় বাধা
বৈরী আবহাওয়া ও পাহাড়ের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে ইতোমধ্যে উদ্ধার তৎপরতা কঠিন হয়ে পড়েছে। সিসিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান আবহাওয়া পরবর্তী উদ্ধার কার্যক্রমের জন্য বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করছে।
চীনা সামরিক বাহিনীর স্থানীয় কমান্ডের কর্মকর্তা চেন শি জানিয়েছেন, ভূমিধসের ঝুঁকি থাকায় কয়েকটি উদ্ধারকারী ইউনিটকে নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাহাড়ি ঢাল যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া খাড়া পাহাড় ঘেঁষে যাওয়া সড়কগুলোতেও নতুন করে কাদাধসের আশঙ্কা রয়েছে। ফলে উদ্ধারকারী দলগুলোকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারাও ঝুঁকিতে
সম্ভাব্য দ্বিতীয় বিপর্যয় শুধু উদ্ধারকারীদের জন্য নয়, স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। এরই মধ্যে আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন এলাকা নতুন করে পানির স্রোত, কাদা ও পাথরের ধসের মুখে পড়তে পারে।
কর্তৃপক্ষ একদিকে আগের বন্যায় নিখোঁজ ও আটকে পড়া ব্যক্তিদের উদ্ধারে কাজ করছে, অন্যদিকে নতুন হ্রদের পানি ও প্রাকৃতিক বাঁধের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। সম্ভাব্য বাঁধধসের পরিস্থিতি তৈরি হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, পাহাড়ি এলাকায় টানা বৃষ্টি হলে হ্রদের পানির স্তর দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। এতে প্রাকৃতিক বাঁধের ওপর চাপ আরও বাড়বে। তাই দ্বিতীয় দফা বন্যার আশঙ্কা মোকাবিলায় সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর নেপাল-চীন সীমান্তে তৈরি হওয়া নতুন হ্রদ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। হ্রদের পানি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে এবং প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে পড়লে অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন করে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিতে পারে। ফলে উদ্ধার অভিযান, স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা এবং সম্ভাব্য দ্বিতীয় বিপর্যয় ঠেকানো এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।