
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এর অংশ হিসেবে নেট মিটারিং সংযোগের মাধ্যমে নতুন করে ২০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন অগ্রগতি সংক্রান্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ, নেট মিটারিং, জ্বালানি সংরক্ষণ, জাতীয় গ্রিডের স্থিতিশীলতা এবং জ্বালানি দক্ষতাকে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মপরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধি, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, এলএনজি অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সাশ্রয়ী ও স্বচ্ছ ট্যারিফ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগে শতভাগ বাস্তবায়ন
অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় বিদ্যুৎ বিভাগের উদ্যোগগুলোর বাস্তবায়ন অগ্রগতি ১০০ শতাংশ। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের অগ্রগতি হয়েছে ৯০ দশমিক ৫৫ শতাংশ। দুই বিভাগ মিলিয়ে সামগ্রিক বাস্তবায়ন অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৯৫ দশমিক ২৮ শতাংশে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০২৬-২০৩০)’ প্রণয়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি রোডম্যাপ ২০২৬’ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্টের আওতায় চারটি প্রকল্পের মধ্যে একটি ১০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আরও একটি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
এ ছাড়া সৌর, বায়ু, জলবিদ্যুৎ, বায়োমাস ও বায়োগ্যাস, জ্বালানি সংরক্ষণ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে বিনিয়োগের বিভিন্ন ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সমন্বয়ে ব্যবসায়িক মডেল তৈরির কাজও এগিয়েছে।
ব্যাটারি স্টোরেজ ও জ্বালানি দক্ষতায় উদ্যোগ
জাতীয় গ্রিডের ফ্রিকোয়েন্সি নিয়ন্ত্রণ ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ঈশ্বরদী ও ভুলতা গ্রিড উপকেন্দ্রে যথাক্রমে ১২০ ও ৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (বিইএসএস) স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি জ্বালানি দক্ষতা ও সংরক্ষণের জন্য ২০২৬-২০৩০ মেয়াদের পাঁচ বছরের কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। ৩০টি নির্ধারিত প্রতিষ্ঠানে জ্বালানি নিরীক্ষাও সম্পন্ন হয়েছে।
গ্যাস উৎপাদনেও অগ্রগতি
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিকল্পনা অনুযায়ী সাতটি গ্যাসকূপ খনন ও চারটি কূপের ওয়ার্কওভার কার্যক্রমের প্রায় ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।
এর মধ্যে ছয়টি কূপের খনন সম্পন্ন হয়েছে। এসব কূপ থেকে প্রতিদিন মোট ২১ দশমিক ৪২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ হচ্ছে। অন্যদিকে ওয়ার্কওভার শেষে চারটি কূপ থেকে প্রতিদিন আরও ১০ দশমিক ৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হচ্ছে। সব মিলিয়ে নতুন করে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ৩২ দশমিক ০২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়াতে সারা দেশে ৫০টি কূপ খননের বৃহৎ কর্মসূচির আওতায় ২৮টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ডিপিপি তৈরির কাজও এগিয়ে চলছে।
তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও এলএনজি অবকাঠামো
সমুদ্রাঞ্চলে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য বাংলাদেশ অফশোর মডেল পিএসসি-২০২৬-এর আওতায় বিডিং রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে। স্থলভাগে অনুসন্ধানের জন্য বাংলাদেশ অনশোর মডেল পিএসসি-২০২৬-এর খসড়াও অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
এ ছাড়া তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে ৫০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি সাইসমিক সার্ভে শেষ হয়েছে। তবে বর্ষার কারণে ৩ডি সাইসমিক সার্ভের কাজ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এলএনজি অবকাঠামো উন্নয়নে মহেশখালীর কুতুবজোম এলাকায় নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের বাস্তবায়ন মডেল নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ল্যান্ডবেজড এলএনজি টার্মিনাল ও ক্রুড অয়েল রিফাইনারি আধুনিকায়নের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কমেছে সিস্টেম লস
জ্বালানি খাতে সিস্টেম লসও কমেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে সিস্টেম লস ৮ দশমিক ০৩ শতাংশ থাকলেও ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত পাঁচ মাসে তা কমে ৭ দশমিক ১৮ শতাংশে নেমেছে। অর্থাৎ এ সময়ে সিস্টেম লস কমেছে ১ দশমিক ৩৫ শতাংশ।
এ ছাড়া প্রাকৃতিক গ্যাস, এলপিজি, ফার্নেস অয়েল ও জেট ফুয়েলের ট্যারিফ নির্ধারণে গণশুনানির মাধ্যমে কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। শিল্প খাতে গ্যাস বরাদ্দ সংক্রান্ত খসড়া নীতিমালা প্রণয়ন এবং ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের কাজও এগিয়ে চলছে।
সব মিলিয়ে, সরকারের প্রথম ছয় মাসের কর্মপরিকল্পনায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন, গ্যাস সরবরাহ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি সাশ্রয় ও অবকাঠামো উন্নয়নে একাধিক উদ্যোগ বাস্তবায়নের চিত্র উঠে এসেছে। বিশেষ করে নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে ২০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়াকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।