
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপ করা সর্বশেষ দফার শুল্কের জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে কানাডা। দেশটির সরকারের এ সিদ্ধান্তের ফলে দীর্ঘদিনের যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বাণিজ্য বিরোধ নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
কানাডা জানিয়েছে, নতুন এই পাল্টা শুল্ক প্রায় ২৮ বিলিয়ন কানাডীয় ডলার বা ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের মার্কিন পণ্যের ওপর কার্যকর হবে। শুল্কের আওতায় থাকা পণ্যের তালিকায় ইস্পাত, আসবাবপত্র, তাজা টুনা মাছ ও তুলার টি-শার্টসহ বিভিন্ন পণ্য রয়েছে।
কানাডার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যেসব কানাডীয় পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করেছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই পাল্টা শুল্কের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে।
বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর উত্তেজনা
গত সপ্তাহের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে চলমান বাণিজ্য আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে আলোচনার একেবারে শেষ পর্যায়ে অযৌক্তিক দাবি উত্থাপনের অভিযোগ করেছে।
কানাডার অর্থমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া-ফিলিপ শ্যাম্পেন জানিয়েছেন, শুক্রবার বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন কানাডার বিভিন্ন পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করে। এরই জবাবে কানাডা পাল্টা শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তিনি বলেন, নতুন মার্কিন শুল্কের প্রভাব কানাডার শ্রমিক, ব্যবসা ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের ওপর সরাসরি পড়বে। কানাডার পাল্টা পদক্ষেপকে তিনি ‘সমানুপাতিক’ ও ‘কৌশলগত’ বলে উল্লেখ করেছেন।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা ও শ্রমিকদের সহায়তায় অতিরিক্ত সাড়ে ৭ বিলিয়ন কানাডীয় ডলার বরাদ্দের কথাও জানিয়েছেন তিনি। এই অর্থ কর্মী ছাঁটাই কমানো এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংকট মোকাবিলা করে টিকে থাকতে সহায়তার জন্য ব্যবহার করা হবে।
সরবরাহ চেইন নিয়ে উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা বিশ্বের অন্যতম ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক অংশীদার। দুই দেশের মধ্যে কয়েক দশক ধরে গড়ে ওঠা আন্তঃনির্ভরশীল সরবরাহব্যবস্থা রয়েছে। ফলে নতুন করে শুল্ক আরোপের কারণে সীমান্তের উভয় পাশের ব্যবসা-বাণিজ্যে অতিরিক্ত ব্যয় তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষ করে শিল্প উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশের ব্যয় বাড়তে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে সাধারণ ভোক্তাদের ওপরও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কানাডার ব্যবসায়ী মহলও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্যযুদ্ধের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। দেশটির সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদারের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে শুল্কযুদ্ধ চললে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কানাডায় সরকারের কঠোর অবস্থানের সমর্থন
বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে কানাডা সরকারের কঠোর অবস্থান বজায় রাখার পক্ষে দেশটির অধিকাংশ নাগরিক। তবে বাণিজ্য আলোচনা ঠিক কী কারণে ভেস্তে গেছে, তা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে।
কানাডার বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার খসড়া চুক্তির সম্পূর্ণ লিখিত নথি প্রকাশের দাবি জানিয়েছে।
অন্যদিকে, কানাডা পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়ার পর হোয়াইট হাউস এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, সাম্প্রতিক আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র কানাডাকে বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় সবচেয়ে অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা দিতে প্রস্তুত ছিল।
হোয়াইট হাউসের বক্তব্য, অংশীদারত্বের পরিবর্তে কানাডা অযৌক্তিক দাবি, আগের অবস্থান থেকে সরে যাওয়া এবং সরাসরি প্রত্যাখ্যানের পথ বেছে নিয়েছে।
ট্রাম্পের কড়া বক্তব্য
মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া একাধিক পোস্টে কানাডার বিরুদ্ধে কঠোর অভিযোগ তোলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি দাবি করেন, কানাডা কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্যায্য বাণিজ্য করে আসছে এবং মার্কিন কৃষকদের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করছে।
ট্রাম্প কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ‘কঠিন ও অযৌক্তিক’ অংশীদার হিসেবেও উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অঙ্গরাজ্য নয়—এমন মন্তব্য করে দেশটির জন্য আর কোনো বিশেষ সুবিধা থাকবে না বলেও ইঙ্গিত দেন।
এমনকি সীমান্তবর্তী গ্রেট লেকস অঞ্চলের লেক অন্টারিওর নাম পরিবর্তন করে ‘লেক আমেরিকা’ রাখার সম্ভাবনার কথাও ইঙ্গিতপূর্ণভাবে তুলে ধরেন তিনি।
এর আগে ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন, আগামী ১ জানুয়ারি থেকে কানাডীয় গাড়ির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে।
আলোচনায় ফেরার সম্ভাবনা
ট্রাম্পের এসব বক্তব্যের জবাবে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের নীতির লক্ষ্য কানাডার গাড়ি উৎপাদন, ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করা।
সোমবার দুই দেশের নেতাদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে উত্তেজনা তীব্র হলেও মঙ্গলবার কয়েকজন কর্মকর্তা তুলনামূলক কূটনৈতিক ভাষায় কথা বলেছেন। ফলে বাণিজ্য বিরোধ নিরসনে দুই দেশ আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরতে পারে—এমন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এরই মধ্যে মঙ্গলবার কানাডা প্রায় ৯০০টি মার্কিন পণ্যের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। এসব পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হবে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে দুই দেশের বাণিজ্য বিরোধ শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেই নয়, উত্তর আমেরিকার সরবরাহব্যবস্থা ও বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিবেশেও প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে আগামী দিনে দুই দেশ আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ কমাতে পারে কি না, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মহলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।