
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে শক্তিশালীভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এপ্রিল-জুন সময়ে তৈরি পোশাকের নিট রপ্তানি আয় আগের প্রান্তিকের তুলনায় ১০ দশমিক ৩৮ শতাংশ বেড়ে ৬২৩ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায়ও এ আয় বেড়েছে ২০ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত তৈরি পোশাক খাতের ত্রৈমাসিক পর্যালোচনায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
পর্যালোচনা অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিক অর্থাৎ জানুয়ারি-মার্চ সময়ে তৈরি পোশাকের নিট রপ্তানি আয় ছিল ৫৬৪ কোটি ডলার। চতুর্থ প্রান্তিকে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২৩ কোটি ডলারে।
একই সময়ে মোট তৈরি পোশাক রপ্তানি আয়ও আগের প্রান্তিকের তুলনায় ৯ দশমিক ৭৯ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ১০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায় মোট রপ্তানি আয় বেড়েছে ১০ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
নিট পোশাকে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি
চতুর্থ প্রান্তিকে পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে নিট পোশাক। জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে নিট পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ৪৬১ কোটি ডলার। এপ্রিল-জুন সময়ে তা ১৯ দশমিক ২১ শতাংশ বেড়ে ৫৫০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, বোনা পোশাক রপ্তানি থেকে আয় ৪৫৮ কোটি ডলার থেকে মাত্র শূন্য দশমিক ৩১ শতাংশ বেড়ে ৪৬০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
ফলে তৃতীয় প্রান্তিকে তুলনামূলক দুর্বল অবস্থার পর চতুর্থ প্রান্তিকে নিট পোশাকের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি পুরো তৈরি পোশাক খাতকে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করেছে।
জুনে পণ্য রপ্তানিতেও বড় উল্লম্ফন
জুন মাসে বাংলাদেশের সামগ্রিক পণ্য রপ্তানিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ মাসে রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ বেড়ে ৪২০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
তবে পুরো অর্থবছরের হিসাবে শেষ দিকে এই প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও মোট রপ্তানি আয় সামান্য কমে যাওয়ার প্রবণতা ঠেকানো সম্ভব হয়নি।
রপ্তানিকারকদের মতে, জুনের প্রবৃদ্ধির পেছনে আগের বছরের তুলনামূলক কম ভিত্তিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। গত বছরের জুনে ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটির কারণে রপ্তানি কার্যক্রম কিছুটা কম ছিল। এ বছর ঈদের বেশির ভাগ ছুটি মে মাসে পড়ায় জুনে রপ্তানি কার্যক্রম তুলনামূলক বেশি হয়েছে।
সামনে জ্বালানি সংকট বড় চ্যালেঞ্জ
ত্রৈমাসিক হিসাবে পোশাক রপ্তানি ঘুরে দাঁড়ালেও আগামী মাসগুলো নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে রপ্তানিকারকদের মধ্যে। বিশেষ করে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, উচ্চ সুদের হার এবং সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা পোশাক শিল্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি উচ্চ সুদের হার ও সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশকে আরও কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
এর সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারত ও ভিয়েতনামের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিও বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির জন্য বাড়তি প্রতিযোগিতা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।
তবে দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো সমাধান করা গেলে নতুন অর্থবছরে আগের অর্থবছরের তুলনায় রপ্তানি ভালো করার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
গ্যাস সংকটে কারখানা বন্ধ
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, পোশাক শিল্পের পাশাপাশি এর সরবরাহ শৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বস্ত্র খাতও গ্যাস সংকটে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল জানিয়েছেন, সংগঠনটির ১ হাজার ৮০০টির বেশি সদস্য কারখানার মধ্যে গ্যাস সরবরাহে বিঘ্নের কারণে ৯০০টির বেশি কারখানা বন্ধ রয়েছে।
তার মতে, শুধু বস্ত্রকল নয়, গ্যাসনির্ভর ইস্পাত, কাগজ, পার্টিকেল বোর্ড ও সিরামিক শিল্পও দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদনে বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, উৎপাদন ব্যাহত হলে সময়মতো পোশাক সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখার ক্ষেত্রেও চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
পোশাক খাতে মূল্য সংযোজন বেড়েছে
২০২৫-২৬ অর্থবছরের চতুর্থ প্রান্তিকে তৈরি পোশাক খাত ৩৮৭ কোটি ডলারের কাঁচামাল আমদানি করেছে। এর মধ্যে তুলা, কৃত্রিম ও ভিসকোজ তন্তু, সুতা, কাপড় এবং পোশাক তৈরির বিভিন্ন উপকরণ রয়েছে।
এসব কাঁচামাল আমদানি মোট তৈরি পোশাক রপ্তানি আয়ের ৩৮ দশমিক ৩২ শতাংশের সমান। ফলে চতুর্থ প্রান্তিকে তৈরি পোশাক খাতে মূল্য সংযোজনের হার দাঁড়িয়েছে ৬১ দশমিক ৬৮ শতাংশ।
আগের প্রান্তিকে এ হার ছিল ৬১ দশমিক ৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ এক প্রান্তিকের ব্যবধানে পোশাক খাতে মূল্য সংযোজন সামান্য বেড়েছে।
পুরো অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল সীমিত
চতুর্থ প্রান্তিকে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি হলেও পুরো ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তৈরি পোশাক খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল তুলনামূলক মন্থর।
এই অর্থবছরে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে মোট আয় হয়েছে ৩ হাজার ৮৯৭ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় মাত্র শূন্য দশমিক ৯৬ শতাংশ বেশি।
তবে দেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক খাতের গুরুত্ব এখনো অত্যন্ত বেশি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের নামমাত্র মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) তৈরি পোশাক খাতের অবদান ছিল ৭ দশমিক ৮২ শতাংশ।
প্রধান বাজারে রপ্তানি অব্যাহত
যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, স্পেন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, ইতালি, কানাডা ও বেলজিয়াম বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান বাজার হিসেবে রয়েছে।
চতুর্থ প্রান্তিকে এসব দেশে ৭২৪ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। এটি ওই প্রান্তিকে বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানি আয়ের ৭১ দশমিক ৬৯ শতাংশ।
অর্থাৎ বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের চাহিদা এখনো শক্তিশালী রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয় এবং জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করতে না পারলে ভবিষ্যতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।
রপ্তানি বাড়াতে সরকারি সহায়তা
উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যে তৈরি পোশাক খাতকে সহায়তা দিতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে রপ্তানির আগে ঋণ পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি, ৫ হাজার কোটি টাকার ঘূর্ণায়মান গ্রিন ট্রান্সফরমেশন তহবিল, ১০ হাজার কোটি টাকার রপ্তানি সহায়তা অগ্রিম অর্থায়ন তহবিল এবং রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, নিকট ভবিষ্যতে তৈরি পোশাক রপ্তানির সম্ভাবনা মাঝারি মাত্রায় ইতিবাচক। বৈশ্বিক চাহিদা পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা এবং বিধিবিধান মেনে চলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি এ খাতের রপ্তানি বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে।
সব মিলিয়ে, অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে তৈরি পোশাকের নিট ও মোট রপ্তানি আয়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি খাতটির ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে এই প্রবৃদ্ধিকে টেকসই করতে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট সমাধান, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।