
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
ছোট ব্যবসা ও কম টার্নওভার করা কোম্পানিগুলোর জন্য ন্যূনতম টার্নওভার করের চাপ কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। প্রস্তাবিত নতুন কাঠামো অনুযায়ী, বার্ষিক ২ কোটি টাকা পর্যন্ত টার্নওভার করা ব্যবসা ও কোম্পানিকে কোনো ন্যূনতম টার্নওভার কর দিতে হবে না।
বর্তমানে ব্যবসা লাভে থাকুক কিংবা লোকসানে, টার্নওভারের ওপর নির্দিষ্ট হারে ন্যূনতম কর দিতে হয়। নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে বিশেষ করে ছোট ও তুলনামূলক কম মুনাফার ব্যবসাগুলো কিছুটা স্বস্তি পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, বার্ষিক টার্নওভার ২ কোটি টাকা পর্যন্ত হলে কোনো ন্যূনতম টার্নওভার কর থাকবে না। ২ কোটি টাকার বেশি থেকে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত টার্নওভারের ক্ষেত্রে করের হার হবে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ। ৩ কোটি টাকার বেশি থেকে ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত টার্নওভারে শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ কর দিতে হবে।
অন্যদিকে, বার্ষিক টার্নওভার ৪ কোটি টাকার বেশি হলে বিদ্যমান ১ শতাংশ ন্যূনতম টার্নওভার কর বহাল থাকবে।
শিগগিরই জারি হতে পারে আদেশ
প্রস্তাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন কাঠামোর সারসংক্ষেপ ইতোমধ্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অনুমোদন করেছেন। বর্তমানে বিষয়টি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
তিনি জানান, আগামী বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) অথবা পরবর্তী সপ্তাহের শুরুতে এ বিষয়ে আদেশ জারি হতে পারে।
এনবিআরের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো ছোট ব্যবসা ও তুলনামূলক কম টার্নওভার করা কোম্পানির ওপর করের চাপ কমানো। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, লাভ না করেও ন্যূনতম টার্নওভার কর দেওয়ার যে চাপ এতদিন অনেক ব্যবসাকে বহন করতে হয়েছে, নতুন ব্যবস্থায় তা কিছুটা কমবে।
ব্যবসায়ীদের সন্তুষ্টি, তবে চান আরও বড় সংস্কার
প্রস্তাবিত পরিবর্তনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ী নেতারা। ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক মনে করেন, এর ফলে ছোট ব্যবসা ও কোম্পানিগুলোর করের চাপ কমবে।
তবে তার মতে, দীর্ঘমেয়াদে কর আরোপের ভিত্তি হওয়া উচিত প্রকৃত আয় বা মুনাফা। এ কারণে ন্যূনতম টার্নওভার কর ব্যবস্থা ধীরে ধীরে পুরোপুরি বাতিল করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
এফবিসিসিআই গত ২৪ আগস্ট অর্থমন্ত্রীকে পাঠানো এক চিঠিতেও ন্যূনতম টার্নওভার কর ব্যবস্থা থেকে ধীরে ধীরে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকিন আহমেদও বিদ্যমান ন্যূনতম টার্নওভার কর ব্যবস্থা সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছেন।
২০২৫ সালে বেড়েছিল ন্যূনতম কর
২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বেশির ভাগ কোম্পানিকে বার্ষিক টার্নওভারের ওপর শূন্য দশমিক ৬০ শতাংশ ন্যূনতম টার্নওভার কর দিতে হতো। কোম্পানি নয় এমন ব্যবসার ক্ষেত্রে বার্ষিক টার্নওভার ৪ কোটি টাকার বেশি হলে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ ন্যূনতম টার্নওভার কর প্রযোজ্য ছিল।
তবে ২০২৫ সালের বাজেটে উভয় শ্রেণির জন্য ন্যূনতম টার্নওভার করের হার বাড়িয়ে ১ শতাংশ করা হয়। এতে কম মুনাফার ব্যবসার কার্যকর করহার বেড়ে যায়। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে লোকসানে থাকা ব্যবসাকেও টার্নওভারের ভিত্তিতে কর পরিশোধ করতে হয়েছে।
বড় ব্যবসায়ীদের সমস্যা থেকেই যাচ্ছে
কর বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন প্রস্তাব ছোট ব্যবসা ও কম টার্নওভার করা কোম্পানির জন্য স্বস্তিদায়ক হলেও বড় ব্যবসার ক্ষেত্রে সমস্যাটি পুরোপুরি দূর হবে না।
চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও এসম্যাক অ্যাডভাইজরির ম্যানেজিং পার্টনার স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, প্রস্তাবিত হারে কর কমানো ছোট ব্যবসায়ী ও কম টার্নওভার করা কোম্পানিগুলোকে সুবিধা দেবে। তবে বড় ব্যবসাগুলোও অনেক সময় লোকসান বা কম মুনাফার মধ্য দিয়ে যেতে পারে। তাদের জন্য কোনো ছাড় না থাকলে ন্যূনতম করের কারণে কার্যকর করের বোঝা থেকেই যাবে।
বর্তমানে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির করপোরেট করহার ২৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। আর কোম্পানি নয় এমন ব্যবসার মালিকসহ ব্যক্তি করদাতাদের সর্বোচ্চ আয়কর হার ৩০ শতাংশ।
প্রকৃত আয়ের তুলনায় বেশি হতে পারে কর
ন্যূনতম টার্নওভার করের কারণে কোনো কোনো ব্যবসার প্রকৃত আয়ের তুলনায় করের বোঝা অনেক বেশি হয়ে যেতে পারে বলে জানিয়েছে এফবিসিসিআই।
সংগঠনটির দেওয়া উদাহরণ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির ব্যবসার বার্ষিক বিক্রি ৫০ লাখ টাকা এবং মুনাফার হার ৫ শতাংশ হলে তার মুনাফা দাঁড়ায় ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। নিয়মিত আয়কর ব্যবস্থায় এই আয় করমুক্ত সীমার মধ্যে থাকলেও ১ শতাংশ ন্যূনতম টার্নওভার করের কারণে তাকে ৫০ হাজার টাকা কর দিতে হয়।
আবার কোনো ব্যবসার বার্ষিক বিক্রি ১ কোটি টাকা এবং মুনাফা ৫ লাখ টাকা হলে নিয়মিত আয়কর ব্যবস্থায় করের পরিমাণ হতে পারে ১০ হাজার টাকা। কিন্তু ১ শতাংশ ন্যূনতম টার্নওভার করের হিসাবে তাকে ১ লাখ টাকা দিতে হয়।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে ব্যবসার প্রকৃত মুনাফার তুলনায় করের বোঝা বেড়ে যাওয়ায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হয়।
টার্নওভার কম দেখানোর ঝুঁকি
প্রস্তাবিত কর অব্যাহতি নিয়ে কিছু অংশীজন টার্নওভার কারসাজির আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, ২ কোটি টাকা পর্যন্ত টার্নওভারে কোনো ন্যূনতম কর না থাকায় কিছু ব্যবসা ইচ্ছাকৃতভাবে বিক্রি কম দেখিয়ে নির্ধারিত সীমার মধ্যে থাকার চেষ্টা করতে পারে।
তবে এনবিআরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এ আশঙ্কা পুরোপুরি উড়িয়ে না দিলেও মনে করছেন, প্রস্তাবিত কাঠামোয় এ ধরনের কারসাজির সুযোগ আগের তুলনায় কম থাকবে।
এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, নতুন ব্যবস্থায় কমপক্ষে এক লাখ ব্যক্তি ও কোম্পানি কর দিতে বাধ্য থাকবে। ফলে কর আদায় কমার পরিবর্তে ভবিষ্যতে তা বাড়তে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
এনবিআর আরও জানিয়েছে, ব্যবসায়িক লেনদেনের তদারকি বাড়াতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিজেদের সিস্টেম সমন্বয় করা হচ্ছে। এর ফলে ব্যবসায়ীদের টার্নওভার কম দেখানো বা তথ্য গোপন করা আগের তুলনায় কঠিন হবে।
সব মিলিয়ে, প্রস্তাবিত নতুন কাঠামো কার্যকর হলে ছোট ব্যবসা ও কম টার্নওভার করা কোম্পানিগুলো ন্যূনতম করের চাপ থেকে উল্লেখযোগ্য স্বস্তি পেতে পারে। তবে বড় ও কম মুনাফার ব্যবসাগুলোর জন্য ন্যূনতম টার্নওভার কর পুরোপুরি তুলে দেওয়ার দাবি থাকায় ভবিষ্যতে এ বিষয়ে আরও সংস্কারের সম্ভাবনাও রয়েছে।