
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
পাঁচ বছরে সরকারের অগ্রাধিকার
# পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়ন
#বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ
# নদী পুনরুদ্ধার ও পানি ব্যবস্থাপনা
# প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ
# জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ মোকাবিলা
# নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ
# সবুজ কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ
#কার্বন ক্রেডিট থেকে নতুন আয়ের সুযোগ সৃষ্টি
ই- বাংলাদেশ প্রতিবেদক
জলবায়ু পরিবর্তনের বাড়তে থাকা চাপের মধ্যেই নতুন আয়ের উৎস খুঁজছে সরকার। কার্বন ক্রেডিট থেকে বছরে ১ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ পাঁচ বছরের কৌশলগত কাঠামোটি তৈরি করেছে। এতে জলবায়ু অভিযোজনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ফ্রেমওয়ার্কে দরিদ্রবান্ধব ও স্থিতিশীল উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষার উদ্যোগকে কর্মসংস্থান ও সামাজিক স্থিতিশীলতার উৎস হিসেবে দেখা হচ্ছে। ধান চাষে পর্যায় ক্রমিক ভেজানো ও শুকানোর পদ্ধতির কথাও উল্লেখ রয়েছে। বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।এসব উদ্যোগ কার্বন বাজারে দেশের অংশগ্রহণ বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
জিইডির সদস্য সচিব ড. মঞ্জুর গণমাধ্যমকে, বাংলাদেশ নিচু বদ্বীপে অবস্থিত। তাই জলবায়ুজনিত হুমকিগুলো দেশের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন কার্যক্রমে রূপান্তরমূলক প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এর মধ্যে আঞ্চলিক সুপার ডাইক নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও রয়েছে।নদী পুনরুদ্ধার এবং সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও কৌশলের অংশ।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জ্বালানি ও জৈব সার উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।এসব বিনিয়োগ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় বলে মনে করছে জিইডি।সরকারের পানি খাতের পরিকল্পনার সঙ্গেও এসব উদ্যোগ যুক্ত থাকবে।জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে প্রায় ১ কোটি ৯৯ লাখ অভ্যন্তরীণ অভিবাসীর ওপর। লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও প্রাকৃতিক সম্পদ হারানোর চাপ তাদের জীবন বদলাচ্ছে।
সামগ্রিক পরিবেশ ও জলবায়ু কর্মকৌশল বাস্তবায়নে আগামী পাঁচ বছর গুরুত্ব দেওয়া হবে। ফ্রেমওয়ার্কটি ভূমি ব্যবস্থাপনাকে ২০৪১ সালের উচ্চ আয়ের লক্ষ্যেও যুক্ত করেছে।বদ্বীপ অঞ্চলকে নিরাপদ ও সমৃদ্ধ আবাসভূমিতে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।একই সঙ্গে অর্থনীতিতে সবুজ কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরির প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
তবে পরিবেশগত সংকট মোকাবিলাই এই পরিকল্পনার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার চারপাশের প্রধান নদীগুলো রেড জোনে। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগের পানি নিরাপদ সীমার নিচে রয়েছে।খুলনার ময়ুর এবং বগুড়ার করতোয়া নদীতেও একই চিত্র পাওয়া গেছে।
দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়ায় জলজ প্রাণীর জীবনও ঝুঁকিতে। এই পানি মানুষের ব্যবহার কিংবা সেচসহ অন্যান্য কাজেও নিরাপদ নয়।
জিইডি মনে করছে, ভবিষ্যৎ নীতিতে নদীর পানির মান উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।একই সময়ে বায়ুদূষণও রাজধানীর জনজীবন ও অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।ঢাকা বিশ্বের অন্যতম দূষিত শহর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ফ্রেমওয়ার্কে। যানবাহনের ধোঁয়া, ইটভাটা ও কারখানা দূষণের প্রধান উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে। নির্মাণকাজের ধুলো ও আবর্জনা পোড়ানোও শহরের বায়ুমান নষ্ট করছে।
ঘনবসতি ও সীমিত বায়ু চলাচলের কারণে দূষিত কণা বাতাসে আটকে থাকে। এর ফলে হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস ও হৃদরোগের প্রকোপ বাড়ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।শিশুদের ফুসফুসের স্বাভাবিক বিকাশও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। দরিদ্র মানুষ, শিশু, বয়স্ক, শ্রমিক ও রাস্তার হকাররা বেশি ক্ষতির মুখে। চিকিৎসা ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি কর্মঘণ্টা ও উৎপাদনশীলতাও কমে যাচ্ছে।
বায়ুদূষণ কমাতে পরিষ্কার যানবাহন ও জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। শক্তিশালী ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব গণপরিবহনেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।হাঁটা ও সাইকেল চালানোর জন্য নিরাপদ বিকল্প তৈরির কথাও বলা হয়েছে।ইটভাটা ও শিল্পকারখানায় পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি ব্যবহারে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ধুলো, খোলা স্থানে আগুন এবং অন্যান্য দূষণ উৎস নিয়ন্ত্রণেও উদ্যোগ থাকবে।
রিয়েল-টাইম বায়ু পর্যবেক্ষণ ও আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থার পরিকল্পনা রয়েছে।খারাপ বায়ুর দিনে স্বাস্থ্য সচেতনতা ও জননির্দেশনা জোরদার করা হবে। উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষায় বিশেষ পরিকল্পনাও রাখা হয়েছে।
জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন কাঠামো কনভেনশনে দেওয়া অঙ্গীকারকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে গণপরিবহনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে।
তাপমাত্রা বৃদ্ধিও দেশের পরিবর্তিত পরিবেশগত বাস্তবতাকে আরও জটিল করছে।২০১১ থেকে ২০১৯ সময়ে গড় তাপমাত্রা প্রায় ১ দশমিক ০৬ ডিগ্রি বেড়েছে।গত ৩০ বছরের তুলনায় বৃষ্টিপাতের ধরনও এখন বেশি অনিয়মিত।
বৃষ্টির দিন কমলেও ভারী বর্ষণ ও মেঘভাঙা বৃষ্টির ঘটনা বাড়ছে। ফলে আকস্মিক ও ধ্বংসাত্মক বন্যার ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বছরে প্রায় ৩ দশমিক ২ মিলিমিটার হারে বাড়ছে। এতে গড় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে দুই মিটারের নিচের ভূমি ঝুঁকিতে পড়ছে।এ ধরনের ভূমির পরিমাণ দেশের প্রায় ১৩ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
জলবায়ু বাস্তবতায় অর্থনীতি পুনর্গঠনে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির কথা বলছে সরকার। পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়নকে কৌশলের মূল অংশ করা হয়েছে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণেও গুরুত্ব থাকবে।জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার উদ্যোগও পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। প্রতি বছর ১০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে।বিগত দশকগুলোতে কিছু খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার ছিল ধীর। পরিবর্তিত অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সেসব খাতে নতুন গতি আনার লক্ষ্য রয়েছে।
২০৩০ সালের লক্ষ্য বাস্তবায়নে মিশ্র অর্থায়ন কৌশল গ্রহণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। মোট তহবিলের প্রায় ৪০ শতাংশ সরকারি উৎস থেকে আসতে পারে। বেসরকারি বাজার থেকে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ অর্থায়নের সম্ভাবনা ধরা হয়েছে।
তবে এই হিসাবগুলোকে প্রাথমিক ও আনুমানিক হিসেবে বর্ণনা করেছে জিইডি।অর্থের প্রাপ্যতার ভিত্তিতে বছরভিত্তিক আর্থিক নীতি প্রণয়ন করা হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বর্জ্য পুনর্ব্যবহারে বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা হবে।
এ জন্য গ্রিন বন্ড এবং কর ছাড়ের মতো উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। বহুপাক্ষিক অর্থায়নের ক্ষেত্রে গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডও ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।এই তহবিল প্রশমন ও অভিযোজন—দুই ধরনের কার্যক্রমেই ব্যবহার করা যাবে।