
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
চিত্রনায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় গ্রেফতার অভিনেতা আশরাফুল হক ডনের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেছেন আদালত।
মঙ্গলবার ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ-১১-এর বিচারক মো. নুরুল ইসলামের আদালতে ডনের পক্ষে জামিনের আবেদন করেন তার আইনজীবী তারিকুল ইসলাম জুয়েল। শুনানি শেষে আদালত তার জামিন আবেদন নাকচ করে দেন। সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী ফারুক দেওয়ান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার, পরে কারাগারে
গত ৯ আগস্ট হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আশরাফুল হক ডনকে গ্রেফতার করে ইমিগ্রেশন পুলিশ। পরে তাকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ—সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওইদিনই তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত।
এরপর গত ১২ আগস্ট ঢাকার সিএমএম আদালতে ডনের জামিনের আবেদন করা হলে সেটিও নামঞ্জুর করা হয়।
এদিকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি পুলিশের ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের ইন্সপেক্টর মজিবুর রহমান ডনের সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেছেন। ডনের উপস্থিতিতে ওই রিমান্ড আবেদনের শুনানির জন্য আগামী বৃহস্পতিবার দিন ধার্য রয়েছে।
সালমান শাহর মৃত্যু নিয়ে দীর্ঘদিনের রহস্য
চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন ওরফে সালমান শাহ ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মারা যান। তার মৃত্যুর ঘটনায় প্রথমে অপমৃত্যুর মামলা করেন বাবা প্রয়াত কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী।
তবে ছেলের মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে দাবি করে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন জানান তিনি। এরপর অপমৃত্যুর মামলা ও হত্যার অভিযোগ একসঙ্গে তদন্ত করতে সিআইডিকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয় সিআইডি। ওই প্রতিবেদনে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পরে ২৫ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালত সিআইডির ওই প্রতিবেদন গ্রহণ করেন।
তবে সিআইডির প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট না হয়ে সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী রিভিশন মামলা করেন।
হত্যা মামলা হিসেবে তদন্তের নির্দেশ
পরবর্তী সময়ে বাদীপক্ষের করা রিভিশন মঞ্জুর করে মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত।
এর পরিপ্রেক্ষিতে রাজধানীর রমনা থানায় মামলাটি দায়ের করেন সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর। মামলায় সালমান শাহর স্ত্রী সামীরা হকসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন শিল্পপতি ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, লতিফা হক লুছি, অভিনেতা আশরাফুল হক ডন, ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের রুবি, আব্দুস ছাত্তার, সাজু ও রেজভি আহমেদ ফরহাদ। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ কী
মামলার অভিযোগে সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর উল্লেখ করেন, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহর বাসায় তার মা নিলুফার জামান চৌধুরী (নীলা চৌধুরী), বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী এবং ছোট ভাই শাহরান শাহ গিয়েছিলেন।
সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারেন, সালমান ঘুমাচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর প্রডাকশন ম্যানেজার সেলিম ফোন করে জানান, সালমানের কিছু হয়েছে। পরে পরিবারের সদস্যরা দ্রুত বাসায় ফিরে তাকে শয়নকক্ষে নিথর অবস্থায় দেখতে পান।
অভিযোগে আরও বলা হয়, সালমানের হাত-পায়ে কয়েকজন নারী তেল মালিশ করছিলেন এবং পাশের কক্ষে সামীরার আত্মীয় রুবি অবস্থান করছিলেন।
পরিবারের সদস্যরা তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেন। এ সময় তার গলায় দড়ির দাগ এবং মুখমণ্ডল ও পায়ে নীলচে দাগ দেখতে পাওয়ার কথা মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল হয়ে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
দেহাবশেষ উত্তোলনের উদ্যোগ
সালমান শাহর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনের জন্য তদন্তের অংশ হিসেবে তার মরদেহের দেহাবশেষ উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে মরদেহ কবর থেকে উত্তোলনের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন। পরে আদালত লাশ উত্তোলন, সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি ও ময়নাতদন্তের অনুমতি দেন।
বাদীপক্ষ অবশ্য লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিলের আবেদন করে। পরে আদালত ওই আবেদন নথিভুক্ত করেন।
পরবর্তী সময়ে দেহাবশেষ উত্তোলনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকি সাহাকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ-সংক্রান্ত আদেশের অনুলিপিও আদালতে দাখিল করা হয়েছে।
সামনে তদন্ত প্রতিবেদন
সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় তদন্ত কার্যক্রম এখনো চলমান। মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ৩০ আগস্ট দিন ধার্য রয়েছে।
অন্যদিকে অভিনেতা আশরাফুল হক ডনের জামিন আবেদন আদালত নামঞ্জুর করায় তাকে কারাগারেই থাকতে হচ্ছে। একই সঙ্গে তার রিমান্ড আবেদনের শুনানিও সামনে রয়েছে। ফলে সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে শুরু হওয়া তদন্তে ডনের জিজ্ঞাসাবাদ এবং মামলার পরবর্তী কার্যক্রম নিয়ে এখন নজর রয়েছে সংশ্লিষ্টদের।