
বিশেষ প্রতিনিধি
দায়িত্বশীল পদে থাকা কিছু ব্যক্তির ভুল সিদ্ধান্ত ও দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অনেক সময় অর্থনীতি বড় ক্ষতির মুখে পড়ে। ঠিক এমনই এক অনভিপ্রেত পরিস্থিতির শিকার হয়ে উৎপাদনে যাওয়ার আগেই বিশাল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে একটি মেগা শিল্পপ্রতিষ্ঠান। হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের পরেও কেবল প্রশাসনিক ও ব্যাংকিং জটিলতার কারণে কারখানাটি এখনো আলোর মুখ দেখেনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রোষানলে পড়ে একটি স্টিল মিলস উৎপাদনে যাওয়ার আগেই প্রায় দুই হাজার ৯৫৮ কোটি টাকা লোকসানের মুখোমুখি হয়েছে। ওই শিল্পপ্রতিষ্ঠানটি দাঁড় করাতে দেশের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে হাজার হাজার কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ করা হয়েছে। দেশের বন্দরে এসে পৌঁছেছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার মূল্যবান আমদানি করা ক্যাপিটাল মেশিনারি বা যন্ত্রপাতি। ২৭৫টি কনটেইনারে থাকা সেই ভারী যন্ত্রপাতিগুলো কারখানায় পৌঁছানোর আগেই দীর্ঘ সময়ের জন্য আটকে যায়।
এই প্রকল্পটি হলো মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে নির্মাণাধীন বসুন্ধরা মাল্টি স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের একটি বৃহৎ উদ্যোগ। কারখানাটি চালু হলে প্রতি বছর প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টন স্টিল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হতো। প্রকল্পটির সুবাদে দেশের বাজারে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হতো এবং হাজার হাজার মানুষ লাভবান হতো। একই সঙ্গে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো রিবার কয়েল উৎপাদনের মাধ্যমে আমদানিনির্ভরতা কমানোর বড় পরিকল্পনাও ছিল।
তবে নির্ধারিত সময় ২০২৪ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ২০শে আগস্টের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন যে সমস্ত জটিলতা কেটে গেলে আগামী ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ কারখানাটি উৎপাদনে যেতে পারবে। দীর্ঘদিন ধরে কাজ বন্ধ থাকায় প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বড় ধরনের হোঁচট খেয়েছে। বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে এমন অবস্থা চলতে থাকলে শিল্প খাতের সামগ্রিক অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায় যে ২০২২ সালে মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ৭০ একর জমির ওপর এই কারখানা নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কম পরিচালন ব্যয়ে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কারখানাটির সুনির্দিষ্ট নকশা করা হয়েছিল। উন্নত মানের ইস্পাত উৎপাদনের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব উপায়ে কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু নানা ধরনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সেই সুন্দর পরিকল্পনাকে আজ এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
প্রয়োজনীয় ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানির জন্য সেই সময় দেশের আটটি ব্যাংকের একটি কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে প্রায় ৫৫০ কোটি টাকার ঋণপত্র বা এলসি খোলা হয়। পরবর্তী সময়ে বৈদেশিক সরবরাহকারীদের কাছ থেকে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ২৭৫টি কনটেইনারে করে সমুদ্রবন্দর হয়ে দেশে এসে পৌঁছায়। যন্ত্রপাতিগুলো বন্দরে আসার পর থেকেই মূলত নতুন করে নানা ধরনের প্রশাসনিক জটিলতার সূত্রপাত ঘটে। ফলে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র না পাওয়ায় কনটেইনারগুলো নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়।
প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বশীল সূত্রে দাবি করা হয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি বিশেষ নির্দেশনার কারণে একই গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ঋণগ্রহীতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই মূল্যায়নের জটিলতার কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের মাধ্যমে এলসির ডকুমেন্টগুলো আটকে দেওয়া হয়। যার ফলশ্রুতিতে দেশের বিভিন্ন বন্দরে একের পর এক কনটেইনার মাসের পর মাস অলসভাবে পড়ে থাকে। বন্দর কর্তৃপক্ষের কড়াকড়ি ও খালাসের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে ব্যবসার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে।
কনটেইনারগুলো দীর্ঘদিন বন্দরে আটকে থাকার কারণে শুধু বন্দর ও শিপিং খাতের ড্যামারেজ বা জরিমানা বেড়েই চলে। হিসাব অনুযায়ী এই জরিমার পরিমাণ বাড়তে বাড়তে একসময় প্রায় ৯৫০ কোটি টাকার বিশাল অঙ্কে গিয়ে ঠেকে। অর্থাৎ যন্ত্রপাতির প্রকৃত আমদানি মূল্য যেখানে ছিল মাত্র ৫০০ কোটি টাকা, সেখানে কেবল ড্যামারেজ ও আনুষঙ্গিক ব্যয় তার দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়ায়। এই অযাচিত আর্থিক চাপ মেগা প্রকল্পটির জন্য এক বড় ধরনের বোঝা হিসেবে আবির্ভূত হয়।
প্রকল্পটির প্রাথমিক আর্থিক সংকটের সূচনা অবশ্য হয়েছিল আরও কিছুটা আগে। ২০২২ সালে যখন ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এলসিগুলো খোলা হয়েছিল, তখন ডলারের বিনিময় হার তুলনামূলকভাবে বেশ কম ছিল। ইউক্রেন ও রাশিয়ার চলমান যুদ্ধের বৈশ্বিক প্রভাবে পরবর্তী সময়ে ডলারের মূল্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। এর ফলে দেশের মুদ্রার মানের প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত অবমূল্যায়ন ঘটে, যা আমদানি ব্যবসার ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো ২০২২ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যেই বিদেশি সরবরাহকারীদের সকল পাওনা তাদের নিজ দায়িত্বে পরিশোধ করে দেয়। তবে চুক্তিতে ৩৬০ দিনের পেমেন্ট সুবিধা থাকায় সেই সময় বিএমএসআইএলের কাছ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে অর্থ আদায় করা হয়নি। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের শুরুর দিকে এসে ব্যাংকগুলো এককালীন প্রায় ৮৫০ কোটি টাকার বিশাল অর্থ পরিশোধের জন্য চাপ সৃষ্টি করে। মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় এই বাড়তি দায় পরিশোধ করা উদ্যোক্তাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের সুনির্দিষ্ট হিসাবে দেখা যায়, ৫০০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতির বিপরীতে কেবল মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও মূল্যস্ফীতির কারণে অতিরিক্ত ৮৫০ কোটি টাকার দায় তৈরি হয়েছে। বিএমএসআইএল এই অর্থ পরিশোধের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও ডকুমেন্ট হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে নতুন করে আপত্তি জানানো হয়। প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, সেই মুহূর্তে ব্যাংকগুলো ডকুমেন্ট হস্তান্তর করলে কাস্টমস থেকে দ্রুত যন্ত্রপাতি ছাড়িয়ে নেওয়া সম্ভব হতো।
কর্তৃপক্ষের মতে, সময়মতো যন্ত্রপাতিগুলো কারখানায় নিয়ে যাওয়া গেলে প্রকল্পের কাজ এত দীর্ঘ সময় ধরে পিছিয়ে যেত না। কিন্তু ব্যাংক ও কাস্টমসের মধ্যকার সমন্বয়হীনতার কারণে প্রকল্পটি গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে যায়। বিএমএসআইএলের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংবাদ মাধ্যমকে জানান, এই এলসিগুলো কাঁচামাল আমদানির জন্য ছিল না। এগুলো মূলত সম্পূর্ণরুপে ভারী শিল্প স্থাপনের ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানির উদ্দেশ্যে খোলা হয়েছিল।
তাঁর মতে, কাঁচামাল আমদানি করা হলে স্বল্প সময়ের মধ্যে তা প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রি করে দায় শোধ করা তুলনামূলকভাবে সহজ হতো। কিন্তু একটি রোলিং মিল বা ভারী শিল্প কারখানার ক্ষেত্রে বিনিয়োগের প্রকৃতি সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে থাকে। এটি মূলত একটি প্রি-রেভিনিউ বা উৎপাদনপূর্ব প্রকল্প হওয়ায় প্রচলিত স্বল্পমেয়াদি ঋণের নিয়ম এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। তাঁর দাবি, ১৩ মাস ধরে যে বিশাল অঙ্কের ড্যামারেজ জমেছে তা কোম্পানির কোনো ভুলের কারণে ঘটেনি।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, ব্যাংকের দাবি করা অর্থের সংস্থান করার পরও ডকুমেন্ট না পাওয়ায় কনটেইনারগুলো খালাস করা যায়নি। ঠিক এই সময়ের মধ্যেই বন্দর ও শিপিং খাতের ড্যামেজ বাড়তে বাড়তে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ঘরে পৌঁছে যায়। একই সঙ্গে ঋণের ওপর ব্যাংকগুলোর নির্ধারিত সুদও নিয়মিতভাবে বাড়তে থাকে, যা প্রকল্পের খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বাড়তি এই আর্থিক খরচের কারণে বিনিয়োগকারীদের মূল পুঁজি মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়ে।
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুনির্দিষ্ট নির্দেশে অগ্রণী ব্যাংককে বিএমএসআইএলের বিষয়টি পৃথকভাবে বিবেচনার পরামর্শ দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই নির্দেশনা আসার অনেক আগেই প্রকল্পটি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়ে পড়েছিল। মূলত দীর্ঘ সময় ধরে চলা প্রশাসনিক জটিলতা ও দাপ্তরিক দীর্ঘসূত্রিতা এই পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল করে তোলে। যার ফলে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানটি এক প্রকার বাধ্য হয়ে আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে পথ চলতে থাকে।
প্রকল্পটির অর্থায়নের জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের নেতৃত্বে মোট আটটি ব্যাংকের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী কনসোর্টিয়াম গঠন করা হয়েছিল। এই কনসোর্টিয়ামে অগ্রণী ব্যাংকের পাশাপাশি সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক ও কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই ব্যাংকিংসমূহ যৌথভাবে মোট ২ হাজার ৩৫০ কোটি টাকার সিন্ডিকেটেড টার্ম লোন অনুমোদন করেছিল। তবে দীর্ঘসূত্রিতার কারণে সেই অনুমোদিত ঋণের মাত্র ৫৭৬ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে।
ছাড়কৃত এই অর্থের পরিমাণ মোট অনুমোদিত ঋণের মাত্র ২৪ দশমিক ৫১ শতাংশের কাছাকাছি। বাকি প্রায় ১ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকার বিশাল তহবিল এখনো ব্যাংকগুলোর কাছেই অবিন্যস্ত অবস্থায় রয়ে গেছে। প্রয়োজনীয় অর্থ সময়মতো ছাড় না হওয়ায় কারখানার নির্মাণকাজ কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে প্রকল্পের প্রাথমিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে এক বিরাট ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
চলতি বছরের ৩০শে জুন পর্যন্ত প্রাপ্ত হিসাব অনুযায়ী এই প্রকল্পের সুদ ও আবগারি শুল্ক বাবদ মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৮৫৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে সিন্ডিকেটেড ঋণের বিতরণকৃত অংশের ওপর ২৪৬ কোটি এবং ফোর্সড লোনের ওপর ৬১১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এই ব্যয় পরিশোধের চাপ দিন দিন আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা কোম্পানির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। কোনো ধরনের উৎপাদন শুরু হওয়ার আগেই ব্যাংকঋণের এই পাহাড়সম সুদ পরিশোধ করা উদ্যোক্তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বসুন্ধরা মাল্টি স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এ পর্যন্ত নিজস্ব উৎস ও স্পন্সর ইকুইটি থেকে ৪এল১ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি তাদের সর্বোচ্চ আর্থিক সক্ষমতা ব্যবহার করে সংকট উত্তরণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে সার্বিক পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ ছাড়া সংকট কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
প্রাথমিকভাবে যখন এই মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল, তখন মোট বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল প্রায় ৪ হাজার ১৬০ কোটি টাকা। কিন্তু ডলারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ সুদের হার, কাজের বিলম্ব এবং অন্যান্য আর্থিক চাপের কারণে সেই ব্যয় এখন অনেক বেড়ে গেছে। বর্তমানে প্রকল্পটির মোট সম্ভাব্য ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৭ হাজার ১১৮ কোটি টাকার ঘরে গিয়ে ঠেকেছে। অর্থাৎ কোনো ধরনের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হওয়ার আগেই প্রকল্পের ব্যয় প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিএমএসআইএল কর্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট হিসাব অনুযায়ী প্রকল্পটির ওপর তৈরি হওয়া প্রায় ২ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকার আর্থিক চাপের পেছনে কয়েকটি প্রধান খাত জড়িত। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হওয়া এলসির বিপরীতে মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও মূল্যস্ফীতিজনিত ব্যয় প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা। বন্দর ড্যামেজ ও কনটেইনার ডিটেনশনসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় প্রায় ৯৫০ কোটি টাকা। এছাড়াও ৩০শে জুন পর্যন্ত ব্যাংকের সুদ ও আবগারি শুল্ক বাবদ ৮৫৮ কোটি টাকা এবং ইউটিলিটি অবকাঠামো দ্রুত বাস্তবায়নে অতিরিক্ত ৩০০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে।
প্রকল্পটির বাস্তবায়নে আরেকটি বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির মতো অতি জরুরি ইউটিলিটি সংযোগের দীর্ঘসূত্রিতা। অর্থনৈতিক অঞ্চলের অভ্যন্তরে এসব অবকাঠামো স্থাপনের প্রাথমিক দায়িত্ব সরকার ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) ওপর ছিল। অথচ শেষ পর্যন্ত বিএমএসআইএলকে নিজেদের পক্ষ থেকেই এই খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেবা না পাওয়ায় উদ্যোক্তাদের নিজ দায়িত্বে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে কাজ সম্পন্ন করতে হয়।
কারখানার প্রথম পর্যায়ের কাজের জন্য ৫০ বছরের মেয়াদে গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগের উদ্দেশ্যে বসুন্ধরা কর্তৃপক্ষ প্রায় ২৯০ কোটি টাকা অগ্রিম পরিশোধ করে। পরবর্তীতে ইউটিলিটি সংযোগ দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য বেজা পর্যাপ্ত অর্থ ও নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে ব্যর্থ হয়। বাধ্য হয়ে বিএমএসআইএল নিজস্ব অর্থায়নে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নেয় এবং এতে আরও প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় করে।
নিজেদের অর্থে নির্মিত এই অবকাঠামোর মধ্যে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনে প্রায় ২৫০ কোটি, গ্যাস সংযোগে ৪০ কোটি এবং পানির লাইনে ১০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি দৈনিক তিন মিলিয়ন স্ট্যান্ডার্ড কিউবিক ফুট গ্যাস সরবরাহের অনুমোদন প্রদান করেছিল। একইভাবে বেজা এবং পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডও পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগের অনুমোদন দেয়। তবে সরবরাহ বাস্তবায়নের মূল ভৌত অবকাঠামো সম্পূর্ণ নিজেদের অর্থে করতে হওয়ায় কোম্পানির ওপর আর্থিক চাপ আরও বেড়ে যায়।
প্রতিষ্ঠানের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা আক্ষেপ করে বলেন যে তাঁদের একই কাজের জন্য দুবার অর্থ প্রদান করতে হয়েছে। তিনি জানান যে একবার নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য এবং পরবর্তীতে দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য তাঁদের অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়েছে। তারপরেও এমন সব কারণে প্রকল্পের কাজ পিছিয়ে গেছে যা সম্পূর্ণভাবে তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। প্রশাসনিক সহযোগিতা সময়মতো পাওয়া গেলে এই অতিরিক্ত আর্থিক লোকসান এড়ানো সম্ভব হতো বলে তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট শওকত আজিজ রাসেল এই বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন যে কোনো একজন ব্যবসায়ীকে এককভাবে দায়ী করা ঠিক হবে না। তাঁর মতে, ডলারের বাজারমূল্যের অস্থিতিশীলতার কারণে দেশের পুরো শিল্প খাতজুড়েই বড় ধরনের লোকসান হয়েছে। এছাড়া ব্যাংকঋণ পরিশোধের সময়ও ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত চড়া দামে ডলার কিনতে বাধ্য হতে হচ্ছে, যা তাদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে।
তিনি আরও মন্তব্য করেন যে বিগত সরকারের নীতি প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের ঘাটতি ও দূরদর্শিতার অভাব ছিল। তাঁর অভিযোগ, সেই সময় অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের জন্য কোনো কার্যকর ও সময়োপযোগী নীতি গ্রহণ করা হয়নি। উল্টো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তির নেতিবাচক প্রভাবে দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবসায়ীরা সবসময় চাপের মধ্যে ছিলেন। এই ধরনের নীতিগত অনিশ্চয়তা দেশের বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে।
শওকত আজিজ রাসেলের ভাষায়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে নগদ অর্থের প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা এখন অত্যন্ত কঠিন সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। তিনি মনে করেন যে একটি প্রাণবন্ত ও গতিশীল অর্থনীতির জন্য বাজারে অর্থের স্বাভাবিক সঞ্চালন বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। ব্যবসায়িক খাতে এই স্থবিরতা দূর না করা গেলে নতুন বড় বিনিয়োগ আকর্ষণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। সরকারের উচিত দ্রুত সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করে বাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, বিএমএসআইএল কারখানাটি পুরোপুরি চালু হলে দেশের স্টিল খাতে একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে রিবার কয়েল ও ওয়্যার রড দেশে উৎপাদিত হলে এসব কাঁচামালের জন্য আমদানিনির্ভরতা অনেক কমে যাবে। এর ফলে দেশের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং দেশীয় শিল্পের সামগ্রিক সরবরাহব্যবস্থা আরও বেশি শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। দেশের নির্মাণ খাতের উন্নয়নে এই কারখানার ভূমিকা অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্পটির প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশে প্রতি টন রড উৎপাদনে প্রায় তিন হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ সাশ্রয় করা সম্ভব হতে পারে। আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে তুলনামূলক কম পরিচালন ব্যয়ে মানসম্মত উৎপাদন করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করছেন। দীর্ঘমেয়াদে এই সাশ্রয়ী উৎপাদন দেশের সাধারণ মানুষের নাগালে ইস্পাত পণ্যের দাম রাখতে সহায়তা করবে। ফলে দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন কাজ আরও গতিশীল ও ব্যয়সাশ্রয়ী হবে।
শিল্পসংশ্লিষ্ট বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা যে সরবরাহ শৃঙ্খলার বর্তমান সীমাবদ্ধতা, বন্দর জট এবং কাঁচামালের দামের অস্থিরতা সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলে বাংলাদেশের ইস্পাত শিল্প বড় প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে। তাঁরা মনে করেন যে আগামী দশকের দ্বিতীয়ার্ধে দেশের স্টিল শিল্প প্রতি বছর ১১ থেকে ১৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে। তবে এজন্য নীতিনির্ধারক মহলে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা ও ব্যবসায়ীবান্ধব সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় সম্ভাবনাময় এই খাত কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে ব্যর্থ হবে।
তাঁদের মতে, বড় শিল্প প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দেশের উদ্যোক্তারা যদি নীতিগত জটিলতা বা অনিশ্চয়তার কারণে বড় লোকসানের মুখে পড়েন, তবে তা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্যও নেতিবাচক বার্তা বয়ে আনবে। এই ধরনের ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে পারে এবং ভবিষ্যৎ বিদেশি বিনিয়োগকে মারাত্মকভাবে নিরুৎসাহিত করতে পারে। দেশের অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্বের স্বার্থে এই ধরনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতার অবসান ঘটানো এখন সময়ের দাবি।
বসুন্ধরা গ্লোবাল-এসবিজির চিফ অপারেটিং অফিসার শাহেদ জাহিদ এই প্রসঙ্গে জানান যে অত্যন্ত আধুনিক ও কম কার্বন নিঃসরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশে মানসম্মত পণ্য উৎপাদনের লক্ষ্যেই এই বড় বিনিয়োগ করা হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী উৎপাদন পদ্ধতির তুলনায় অনেক কম খরচে উন্নতমানের স্টিল উৎপাদনের পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টিও এতে গুরুত্ব পেয়েছে। দেশের ক্রমবর্ধমান অবকাঠামোগত চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের হাজার হাজার প্রকৌশল গ্র্যাজুয়েট ও দক্ষ পেশাজীবীর জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে বহুমুখী সংকটের কারণে প্রকল্পের ব্যয় ৪ হাজার ১৬০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৭ হাজার ১১৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। একই সঙ্গে কারখানা চালুর সময়সীমাও ২০২৪ সালের শেষ প্রান্তিক থেকে পিছিয়ে ২০২৭ সালের শেষের দিকে নিতে বাধ্য হতে হয়েছে।
শাহেদ জাহিদের ভাষায়, হাজার হাজার কোটি টাকার বিশাল বিনিয়োগ করার পরেও পুরো গ্রুপটি এখন এক অত্যন্ত অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। প্রকল্পের কাজে ঘটা প্রতিটি অতিরিক্ত বিলম্ব সামগ্রিক ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতাকে দুর্বল করে তুলছে। এই পরিস্থিতি একই সঙ্গে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এবং ঋণদাতা ব্যাংক উভয় পক্ষের ওপরই মারাত্মক মানসিক ও আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে। দ্রুত এই অচলাবস্থা কাটানো না গেলে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ মহলের মতে, বিনিয়োগের পরিমাণ, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং উৎপাদন সক্ষমতার দিক থেকে বিএমএসআইএল শুধু একটি সাধারণ কারখানা নয়। এটি মূলত বাংলাদেশের উদীয়মান শিল্পায়নের অগ্রযাত্রার অন্যতম একটি বড় ও দূরদর্শী উদ্যোগ। কিন্তু নীতিগত সিদ্ধান্তহীনতা, ব্যাংকিং জটিলতা, এলসি খোলা ও নিষ্পত্তির সমস্যা, বন্দর ড্যামেজ এবং ইউটিলিটি সংযোগের বিলম্বের কারণে প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অন্তত তিন বছর পিছিয়ে গেছে। দেশের শিল্প খাতের ইতিহাসে এই ধরনের বিলম্ব অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
অন্যদিকে বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির কথা বলা হচ্ছে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শিল্পসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো চলমান প্রকল্পগুলোর সকল জটিলতা দ্রুত নিরসন করা। ব্যাংকিং ও এলসি ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও গতিশীল করা এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি স্থিতিশীল নীতিপরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। একটি বড় শিল্প প্রকল্পের বিলম্ব কেবল একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দেশের কর্মসংস্থান, রাজস্ব আহরণ এবং সামগ্রিক অর্থনীতির উজ্জ্বল সম্ভাবনা।