• হোম > বাংলাদেশ > এলএনজি আমদানিতে বিশ্বব্যাংকের আরও ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের গ্যারান্টি

এলএনজি আমদানিতে বিশ্বব্যাংকের আরও ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের গ্যারান্টি

  • মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১৫:৪৯
  • ১০

---

 

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

দেশে গ্যাসের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। একই সঙ্গে এলএনজি আমদানির কারণে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ। এই পরিস্থিতিতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির অর্থ পরিশোধ সহজ করতে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে আরও ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ গ্যারান্টি পাওয়ার আশা করছে বাংলাদেশ।

নতুন এ সুবিধা কার্যকর হলে পেট্রোবাংলার জন্য বিশ্বব্যাংকের মোট গ্যারান্টি সুবিধার পরিমাণ বেড়ে ৭০০ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়াবে। পেট্রোবাংলা আশা করছে, প্রয়োজনীয় সব প্রক্রিয়া শেষ করে আগামী নভেম্বরের মধ্যেই নতুন সুবিধাটি কার্যকর করা সম্ভব হবে।

পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন অর্থায়ন কার্যকর করতে বর্তমানে বিদ্যমান চুক্তিগুলোর সংশোধন ও পুনর্বিন্যাসের কাজ চলছে। আগস্টের মধ্যেই আলোচনা ও সংশোধনের প্রাথমিক প্রক্রিয়া শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। এরপর পেট্রোবাংলার বোর্ড অনুমোদন, জ্বালানি বিভাগের সম্মতি এবং আইন মন্ত্রণালয়ের যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করা হবে।

অন্যদিকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) আগামী অক্টোবরে প্রস্তাবটি বিশ্বব্যাংকের বোর্ড সভায় উপস্থাপন করতে পারে। সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে নভেম্বরে অর্থায়ন সুবিধাটি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

৭০০ মিলিয়ন ডলারে বাড়ছে গ্যারান্টি সুবিধা

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) এ কে এম মিজানুর রহমান জানান, বর্তমানে সংস্থাটির জন্য বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন কাঠামো ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের। নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে এই সুবিধা দ্বিগুণ করে ৭০০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার চেষ্টা চলছে।

তিনি জানান, এ জন্য বিদ্যমান চারটি চুক্তি সংশোধন অথবা পুনর্বিন্যাস করতে হবে।

এ লক্ষ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও পেট্রোবাংলার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের নেগোসিয়েশন কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিটি বিশ্বব্যাংক এবং সিঙ্গাপুরভিত্তিক তিনটি ব্যাংকের সমন্বয়ে গঠিত একটি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

সরাসরি ঋণ নয়, পেমেন্ট গ্যারান্টি

বিশ্বব্যাংকের এই ৭০০ মিলিয়ন ডলারের সুবিধাটি সরাসরি ঋণ নয়। এটি একটি নন-ফান্ডেড বা কন্টিনজেন্ট ফাইন্যান্সিং ফ্যাসিলিটি। মূলত এলএনজি আমদানির অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে পেমেন্ট গ্যারান্টি হিসেবে এ অর্থায়ন কাঠামো ব্যবহার করা হবে।

প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, ৬৫০ মিলিয়ন ডলার স্ট্যান্ডবাই লেটার অব ক্রেডিট (এসবিএলসি) হিসেবে রাখা হবে। এলএনজি আমদানির সময় এই এসবিএলসি পেমেন্ট গ্যারান্টি হিসেবে কাজ করবে।

অন্যদিকে আরও ৬০ মিলিয়ন ডলার ক্রেডিট সাপোর্ট লাইন হিসেবে রাখার কথা রয়েছে, যা প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করতে পারবে পেট্রোবাংলা।

এই সুবিধার আওতায় আসতে হলে নভেম্বরের মধ্যে পেট্রোবাংলাকে এসবিএলসি ইস্যু করতে হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

আগের সুবিধার বড় অংশ ইতোমধ্যে ব্যবহার

এর আগে বিশ্বব্যাংকের আওতায় পেট্রোবাংলার জন্য একই ধরনের ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন সুবিধা অনুমোদিত হয়। এনার্জি সেক্টর সিকিউরিটি এনহ্যান্সমেন্ট প্রজেক্টের আওতায় ২০২৫ সালের ১৮ জুন এই সুবিধা অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পটি ২০২৬ সালের শুরুতে কার্যকর হয় এবং এর মেয়াদ ২০৩১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত রয়েছে।

বিদ্যমান ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের সুবিধার মধ্যে ৫০ মিলিয়ন ডলার ছিল ক্রেডিট লাইন, যা এখনো ব্যবহার করা হয়নি। বাকি ৩০০ মিলিয়ন ডলার এলএনজি আমদানির জন্য নির্ধারিত ছিল।

এর মধ্যে ২৫০ মিলিয়ন ডলার দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির বিপরীতে এবং ৫০ মিলিয়ন ডলার স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার জন্য নির্ধারিত ছিল।

দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির জন্য নির্ধারিত ২৫০ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে পেট্রোবাংলা ইতোমধ্যে প্রায় ২৩৫ মিলিয়ন ডলার ব্যবহার করেছে। আর স্পট মার্কেটের জন্য নির্ধারিত ৫০ মিলিয়ন ডলারের সুবিধা দুইবার ব্যবহার করা হয়েছে এবং তৃতীয়বার ব্যবহারের প্রক্রিয়া চলছে।

এ অর্থায়ন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, কোনো পেমেন্ট সম্পন্ন হলে ব্যবহৃত অর্থের বিপরীতে সুবিধাটি আবার ব্যবহার করা যায়।

বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমানোর আশা

পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা মনে করছেন, নতুন গ্যারান্টি সুবিধা চালু হলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর তাৎক্ষণিক চাপ না বাড়িয়েই এলএনজি আমদানির অর্থ পরিশোধের সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে।

দেশে গ্যাসের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প-কারখানা ও অন্যান্য খাতে চাহিদা পূরণে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। ফলে এলএনজি আমদানির পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর অর্থ পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদাও বাড়ছে।

পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, ২০১৮ সাল থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশ ৫৯৭টি কার্গোর মাধ্যমে প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ টন বা ৩৭ দশমিক ০১৪ মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানি করেছে।

বাংলাদেশে মূলত তিনটি পদ্ধতিতে এলএনজি কেনা হয়—দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি, স্বল্পমেয়াদি চুক্তি এবং স্পট মার্কেট থেকে সরাসরি ক্রয়।

দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ক্ষেত্রে কাতারএনার্জি ও ওমানের ওকিউ ট্রেডিং গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী। পাশাপাশি বাজার পরিস্থিতি ও দেশের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে স্পট মার্কেট থেকেও এলএনজি কেনে পেট্রোবাংলা।

ভবিষ্যতে এলএনজি আমদানির চাপ আরও বাড়তে পারে

দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া এবং শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে ভবিষ্যতে এলএনজি আমদানির প্রয়োজন আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, ২০৪১ সালে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৩০ মিলিয়ন টন এলএনজির প্রয়োজন হতে পারে। সে সময় দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৮ বিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

এ অবস্থায় শুধু গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করাই নয়, এলএনজি আমদানির অর্থায়ন ব্যবস্থাও শক্তিশালী করা জরুরি হয়ে পড়ছে। বিশ্বব্যাংকের গ্যারান্টি সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগকে সেই বৃহত্তর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও বাড়ছে ঝুঁকি

আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ও ওঠানামা করে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এলএনজি সরবরাহে নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে।

দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় সরবরাহে কোনো ধরনের বিঘ্ন দেখা দিলে পেট্রোবাংলাকে স্পট মার্কেট থেকে অতিরিক্ত এলএনজি কিনতে হতে পারে। সাধারণত স্পট মার্কেটের দাম তুলনামূলক বেশি ওঠানামা করায় এমন পরিস্থিতিতে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

ফলে একদিকে দেশের গ্যাসের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা—দুই দিক থেকেই পেট্রোবাংলার জন্য অর্থায়ন সুবিধা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাবিত অতিরিক্ত ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের গ্যারান্টি সুবিধা কার্যকর হলে এলএনজি আমদানির অর্থ পরিশোধে পেট্রোবাংলার আর্থিক সক্ষমতা বাড়বে। পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও এটি সহায়ক হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/15828 ,   Print Date & Time: Tuesday, 25 August 2026, 11:21:55 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh