
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ঠাকুরগাঁও-১ সংসদীয় আসনটি ছেড়েছেন বিএনপির সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাষ্ট্রপতি ও সংসদ সদস্য হিসেবে একই সঙ্গে দায়িত্ব পালনের সাংবিধানিক সুযোগ না থাকায় তার সংসদীয় আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই আসনে এখন উপনির্বাচনকে ঘিরে শুরু হয়েছে নতুন রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ।
শনিবার (২২ আগস্ট) জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের গণসংযোগ বিভাগ থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। একই সময়ে তার সংসদ সদস্য পদ শূন্য হয়েছে। বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠিও পাঠানো হয়েছে।
মির্জা ফখরুলের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ঠাকুরগাঁও-১ আসনে এবার কে বিএনপির প্রার্থী হবেন, তা নিয়ে এরই মধ্যে শুরু হয়েছে আলোচনা। দলীয়ভাবে এখনো কোনো প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা না হলেও স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপির একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থীকে ঘিরে চলছে জল্পনা।
আলোচনায় মির্জা পরিবারের দুই সদস্য
উপনির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন মির্জা ফখরুলের ছোট ভাই মির্জা ফয়সল আমীন এবং তার বড় মেয়ে অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী বিজ্ঞানী ড. শামারুহ মির্জা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিএনপির নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের বিভিন্ন পোস্ট ও আলোচনায় তাদের নাম উঠে আসছে। তবে এখন পর্যন্ত বিএনপির হাইকমান্ড আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকেই প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেনি।
মির্জা ফয়সল আমীন দীর্ঘদিন ধরে ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনীতিতে সক্রিয়। তিনি বর্তমানে জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
নিজের প্রার্থিতা নিয়ে জানতে চাইলে মির্জা ফয়সল আমীন বলেন, আসনটি মাত্র শূন্য হয়েছে। তাই এখনকার আলোচনা বা গুঞ্জনকে প্রার্থিতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কে প্রার্থী হবেন, সে সিদ্ধান্ত দলের চেয়ারম্যান ও নীতিনির্ধারকরাই নেবেন।
তিনি বলেন, তার বড় বোন শামারুহ মির্জা একজন স্বনামধন্য বিজ্ঞানী এবং বর্তমানে বিদেশে বসবাস করেন। বাবার নির্বাচনের সময় তিনি দেশে এসে মানুষের সঙ্গে মিশেছেন এবং প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন। সে কারণে স্থানীয় মানুষ তাকে প্রার্থী হিসেবে চাইতে পারেন।
নিজের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরে ফয়সল আমীন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি দলের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত এবং জেলা বিএনপির নেতৃত্বে রয়েছেন। ফলে স্থানীয় মানুষের একটি অংশ তাকে প্রার্থী হিসেবে দেখতে চাইতে পারে।
তবে মনোনয়নকে কেন্দ্র করে দলীয় শৃঙ্খলা নষ্ট হওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলেও তিনি জানান। তার ভাষায়, দলের নিয়ম অনুযায়ী যে কেউ মনোনয়ন চাইতে পারেন। তবে মনোনয়ন প্রত্যাশাকে কেন্দ্র করে এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি করা উচিত নয়, যাতে দলের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।
মির্জা পরিবারের বাইরে প্রার্থী নিয়েও আলোচনা
ঠাকুরগাঁও-১ আসনে শুধু মির্জা পরিবারের সদস্যদের নিয়েই আলোচনা হচ্ছে না। বিএনপির অন্য নেতারাও মনোনয়ন চাইতে পারেন বলে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে।
জেলা বিএনপির নেতা-কর্মীদের একাংশের মতে, মির্জা ফয়সল আমীন দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকায় তৃণমূলের সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে। দল তাকে মনোনয়ন দিলে নেতা-কর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে তার পক্ষে কাজ করবেন বলে তারা মনে করছেন।
তবে বিএনপির হাইকমান্ড শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর মির্জা ফখরুলের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আসনে তার উত্তরসূরি নির্বাচন দলের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হতে যাচ্ছে।
জামায়াতেও প্রস্তুতি, সম্ভাব্য প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন
অন্যদিকে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীর পাশাপাশি জামায়াতও উপনির্বাচন সামনে রেখে প্রস্তুতি নিচ্ছে।
দলটির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আগের সংসদ নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বী মো. দেলাওয়ার হোসেনের নামই সামনে রয়েছে। তিনি জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
দলীয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, আগের নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য ভোট পাওয়ায় দেলাওয়ার হোসেনকেই এবারও প্রার্থী করার বিষয়ে জামায়াতের প্রস্তুতি রয়েছে।
ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক বেলাল উদ্দিন প্রধান জানিয়েছেন, দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং দেলাওয়ার হোসেনই তাদের সম্ভাব্য প্রার্থী। কেন্দ্র থেকে নির্দেশনা পাওয়া গেলে তারা নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করবেন।
বিএনপি-জামায়াতের লড়াইয়ে নতুন সমীকরণ
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে বিএনপি শেষ পর্যন্ত কাকে মনোনয়ন দেয়, তার ওপর অনেকটাই নির্ভর করবে নির্বাচনের রাজনৈতিক সমীকরণ। মির্জা ফখরুলের দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও ভোটব্যাংক নতুন প্রার্থী কতটা ধরে রাখতে পারবেন, সেটিও বড় প্রশ্ন।
অন্যদিকে গত সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেনের উল্লেখযোগ্য ভোট পাওয়ার বিষয়টি বিএনপির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এবার নতুন বিএনপি প্রার্থী বনাম পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত প্রার্থীর লড়াই হলে নির্বাচনটি বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মির্জা ফখরুলের ব্যক্তিগত প্রভাব এবং বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি একদিকে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নতুন প্রার্থীর নিজস্ব গ্রহণযোগ্যতা ও তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগও ফলাফলে বড় ভূমিকা রাখবে।
বড় ভোটারসংখ্যার আসন ঠাকুরগাঁও-১
নবগঠিত ভুল্লী ও রুহিয়া উপজেলা এবং ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত ঠাকুরগাঁও-১ সংসদীয় আসন। এ আসনে রয়েছে ২২টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা।
আসনটিতে মোট ভোটার ৫ লাখ ১১ হাজার ৬২৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫০ হাজার ৫৩ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৫৬ হাজার ৫৭২ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৪ জন।
এত বড় ভোটারসংখ্যার আসনে উপনির্বাচনের ফলাফল শুধু স্থানীয় রাজনীতিতেই নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও তাৎপর্য বহন করতে পারে। বিশেষ করে রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুলের দায়িত্ব গ্রহণের পর তার ছেড়ে যাওয়া আসনে বিএনপি কাকে প্রার্থী করে এবং সেই প্রার্থীর বিপরীতে জামায়াত কতটা শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারে—এখন সেটিই রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়।
সব মিলিয়ে মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়ার মধ্য দিয়ে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে তৈরি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা। এখন অপেক্ষা বিএনপির মনোনয়ন ঘোষণার। প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ার পরই স্পষ্ট হবে, এই উপনির্বাচনে মির্জা পরিবারের প্রভাব কতটা থাকবে এবং বিএনপি-জামায়াতের সম্ভাব্য লড়াই কোন দিকে মোড় নেয়।