
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি এবার অর্থনৈতিক লড়াইও আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইরানের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক অংশীদারদের লক্ষ্য করে নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে এ যাবৎকালের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্যোগের জবাবে পাল্টা কঠোর অবস্থান নিয়েছে তেহরান। ইরান সতর্ক করে বলেছে, অর্থনৈতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তাদের সব ধরনের তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট রোববার ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস-এ প্রকাশিত এক মতামতধর্মী লেখায় ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অর্থনৈতিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, ইরানের অর্থনীতি ও আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্ক রাখা দেশগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
বেসেন্টের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা এবং দেশটির আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকার ক্ষেত্রে যেসব দেশকে ওয়াশিংটন ‘তোষণ নীতি’ হিসেবে দেখছে, তাদেরও নতুন নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার পরিকল্পনা থাকতে পারে।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই ইরানের ওপর বিভিন্ন মাত্রায় মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। তবে চলমান যুদ্ধ ও আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে ওয়াশিংটন এবার আরও কঠোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার দিকে এগোচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার হুমকির পর ইরানও পাল্টা অর্থনৈতিক চাপ তৈরির ইঙ্গিত দিয়েছে। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি মোহসেন রেজাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, অর্থনৈতিক যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে হরমুজ প্রণালি কিংবা পারস্য উপসাগরের কোনো পথ দিয়েই তেল রপ্তানি হতে দেওয়া হবে না।
তার এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য এই জলপথ ব্যবহার করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যায়।
ইরান যদি সত্যিই তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেয় এবং একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আরও বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব শুধু তেলের দামেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; পরিবহন, শিল্প উৎপাদন ও নিত্যপণ্যের বাজারেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চলমান সংঘাতের কারণে এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
ইরানের অর্থনীতিতে বাড়ছে চাপ
নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা এমন এক সময়ে তৈরি হয়েছে, যখন যুদ্ধের আগেই ইরানের অর্থনীতি নানা সমস্যার মধ্যে ছিল। দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, জ্বালানি সংকট এবং কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে দেশটির অর্থনীতিতে চাপ ছিল।
এর সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে সামরিক সংঘাতের কারণে অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, বাণিজ্যিক কার্যক্রমে বিঘ্ন এবং যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনের সম্ভাব্য বড় ব্যয়।
ইরান প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান বজায় রাখলেও নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে বলে দেশটির কর্মকর্তাদের কেউ কেউ সতর্ক করেছেন। মূল্যস্ফীতি আরও বাড়লে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে এবং অর্থনৈতিক সংকট নতুন করে সামাজিক অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতে, তেল রপ্তানি ইরানের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ফলে তেল বিক্রি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আরও বড় ধরনের বাধা তৈরি হলে তেহরানের অর্থনৈতিক চাপ সামলানোর সক্ষমতা কমে যেতে পারে।
চীনের প্রতিও যুক্তরাষ্ট্রের চাপ
ইরানের অর্থনৈতিক অংশীদারদের ওপর চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র চীনকেও ইরানের বিষয়ে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী বেসেন্টের বক্তব্যে উঠে এসেছে, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে চীনের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল আমদানি হয়ে থাকে। ফলে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন অর্থনৈতিক পদক্ষেপ কার্যকর করতে চীনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে ওয়াশিংটন।
তবে চীন যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থানের সঙ্গে একমত হয়নি। ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাসের এক মুখপাত্র বলেছেন, নিষেধাজ্ঞা ও চাপ প্রয়োগ কোনো সমস্যার সমাধান করতে পারে না। বরং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
চীনের এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি কূটনৈতিক বিরোধও আরও গভীর হতে পারে।
সরাসরি আলোচনা বন্ধ, মধ্যস্থতায় কয়েকটি দেশ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক সংঘাত চললেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের লক্ষ্যে সরাসরি আলোচনা এখনো কার্যকরভাবে এগোয়নি। গত জুনে সুইজারল্যান্ডে সর্বশেষ বৈঠকের পর দুই দেশের মধ্যে আর কোনো আনুষ্ঠানিক সরাসরি আলোচনা হয়নি।
এই অচলাবস্থা কাটাতে কাতার, পাকিস্তান ও তুরস্কসহ কয়েকটি দেশ কূটনৈতিক উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের লক্ষ্য হলো সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক উত্তেজনা কমিয়ে আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা।
এ পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের তেহরান সফরও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তিনি সোমবার তেহরান সফর করবেন।
পাকিস্তান এরই মধ্যে সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। দেশটির সরকারি একটি সূত্র জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার হুমকি এবং সামগ্রিক আঞ্চলিক পরিস্থিতিও গুরুত্ব পেতে পারে।
যুদ্ধের মানবিক ও অর্থনৈতিক মূল্য
চলমান সংঘাতে শুধু অর্থনীতি নয়, মানবিক পরিস্থিতিও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর ইরান ও লেবাননে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত হয়েছেন। বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রও তাদের সেনাবাহিনীর সদস্যদের হতাহত হওয়ার তথ্য জানিয়েছে। ওয়াশিংটনের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতে ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ৭৫০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
এ অবস্থায় যুদ্ধের সামরিক দিকের পাশাপাশি অর্থনৈতিক লড়াইও যদি আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে সংঘাতের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি পরিবহন বাধাগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তেলের দাম বাড়লে জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, যার প্রভাব পড়তে পারে শিল্প উৎপাদন, পরিবহন ব্যয়, খাদ্যপণ্য ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার হুমকি এবং ইরানের পাল্টা তেল রপ্তানি বন্ধের সতর্কবার্তা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে নতুন অর্থনৈতিক ঝুঁকির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এখন পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা অনেকটাই নির্ভর করছে কূটনৈতিক উদ্যোগ কতটা সফল হয় এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়।